× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চিকিৎসা সংকটে অবহেলিত জনপদ

ইসমাইল হোসেন লিটন, শরণখোলা (বাগেরহাট)

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:১৮ পিএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

উপজেলা সদর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে সুন্দরবনঘেঁষা সোনাতলা গ্রামে থাকেন জেলে রহিম শরিফ। জীবিকার তাগিদে বন আর নদীই যার ভরসা। কিন্তু সেই জীবনযুদ্ধে এক দুর্ঘটনায় আজ তিনি প্রায় কর্মঅক্ষম। সুন্দরবনে খননাস্ত্র দিয়ে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাম পায়ের গোড়ালির রগ কেটে যায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে জানিয়ে দেওয়া হয়- এখানে চিকিৎসা সম্ভব নয়। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। আর্থিক সংকটে হতবিহ্বল পরিবারের পাশে দাঁড়ান এলাকাবাসী। চাঁদা তুলে হাসপাতালে পাঠানো হয় রহিমকে। একবারের চিকিৎসাতেই ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। পরে আরেকটি অপারেশনের প্রয়োজন থাকলেও অর্থাভাবে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ক্রাচে ভর দিয়েই চলতে হয় তাকে। মাছ ধরা বন্ধ, তাই সংসার চালাতে স্ত্রীকে ভিক্ষার পথ বেছে নিতে হয়েছে। এই চিত্র শুধু রহিম শরিফের নয়, শরণখোলার অসংখ্য মানুষের প্রতিচ্ছবি এটি।

একই গ্রামের ৬৫ বছর বয়সি আম্বিয়া খাতুন দীর্ঘদিন ধরে জ্বর ও ব্যথায় ভুগছেন। তার স্বামী ফুলচান খাঁ বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কিছুই হয় না। ওষুধ মেলে না। টাকাও নেই, খুলনা বা অন্য কোথাও নিয়ে যাব কীভাবে? দিনমজুর হারুন মুন্সির স্ত্রী জরায়ুর সমস্যায় ভুগতে ভুগতে এখন লাঞ্চেও পানি জমেছে। ধার-দেনা করে কয়েকবার খুলনায় চিকিৎসা করালেও আবারও যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন খাবো, না ঋণ শোধ করব; সেই চিন্তায় রাত কাটে।

স্থানায়ীরা জানান, শরণখোলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স যেন এক অনাথ প্রতিষ্ঠান- চিকিৎসক নেই, ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, ওষুধ নেই, ব্যবস্থাপনা নেই। অথচ প্রতিদিন শত শত গরিব মানুষ জীবনের আশায় ছুটে আসেন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।

স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সাবেরা ঝর্ণা বলেন, শরণখোলার মতো দুর্গম অঞ্চলে যদি স্বাস্থ্যসেবা না থাকে, তাহলে জনগণ যাবে কোথায়? বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন বাদশা ক্ষোভ ঝাড়েন, এত কষ্ট করে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, অথচ নিজের উপজেলায়ই চিকিৎসা নেই! শরণখোলাবাসী উন্নত চিকিৎসার আশা করে না, চায় শুধু ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা।

উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বশেষ সভা হয়েছিল ২০১৬ সালে। এর পর আর কোনো সভা হয়নি, হয়নি নতুন কমিটি গঠনও। বর্তমান সংসদ সদস্য না থাকায় কমিটি গঠনে বিলম্ব হচ্ছে বলে দাবি করছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। অথচ স্থানীয় মানুষ বলছে, 'উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়েই শেষ হয়েছে সব।'

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রিয় গোপাল বিশ্বাস জানান, ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে প্রায় ১৫০ ও জরুরি বিভাগে ৭০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক আছেন মাত্র ছয়জন। কাগজে-কলমে আটজন দেখানো হলেও দুজন বহু দিন ধরেই সংযুক্তি আদেশে অন্যত্র কর্মরত। নিয়ম অনুযায়ী এখানে অন্তত ২০ জন বিশেষজ্ঞ ও মেডিকেল অফিসার থাকার কথা, কিন্তু প্রায় সব পদই শূন্য। বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কেউ কখনও যোগদানই করেননি। আগত অনেকেই দুদিন থেকে শহরে বদলির চেষ্টা করেন। ভৌগোলিক দূরত্ব ও সুযোগ-সুবিধার অভাবই মূল কারণ।

এ ছাড়া ১৯৭৬ সালে নির্মিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনটি আজ সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, বৈদ্যুতিক ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অচল। নার্স ওয়ার্ড, ডায়রিয়া ওয়ার্ডসহ সবখানে নোংরা পানি ও দুর্গন্ধ। আবাসিক ভবনগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। জরাজীর্ণ ডক্টরস কোয়ার্টারে থাকা সম্ভব নয়। কয়েকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনও পর্যন্ত সংস্কার বা নতুন ভবনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মাহাবুবুল আলম চিকিৎসক সংকট স্বীকার করে বলেন, বিশেষ বিসিএস নিয়োগ হলে সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে। তবে সংযুক্তি আদেশে অন্যত্র চিকিৎসকদের থাকা প্রসঙ্গে বলেন, যাদের ক্ষমতা আছে, তারাই প্রভাব খাটিয়ে চলে যান।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী এনামুল হক জানান, ভবনগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণার পরও কার্যক্রম চালানো হলে দায় স্বাস্থ্য বিভাগের। তবে ভয়ংকর দুর্দশার মাঝেও ব্যতিক্রম ছিলেন দুই চিকিৎসক- ডা. আশফাক হোসাইন ও ডা. ফয়সাল আহমেদ। একজন তিন বছর তিন মাস এবং অন্যজন চার বছরের বেশি সময় ধরে চিকিৎসা দিয়ে গেছেন আন্তরিকতার সঙ্গে। তারা বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো সমস্যা নয়, যদি সেবার মনোভাব থাকে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা