আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৫০ এএম
প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রামের ৪৫ বছর বয়সি সূচী রানী কর্মকার ২০২৩ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বিধবা সূচী দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে সংকটের জীবন পার করছিলেন। এর মধ্যেই ক্যানসারের দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে। প্রথমেই তার আক্রান্ত বাম স্তনটি কেটে বাদ দিতে হয়। এরপর ৮টি কেমো, ২৫টি রেডিওথেরাপি এবং হাড়ে ১২টি ইনজেকশন নিতে হয় তাকে। আগামী মাসেই তার শেষ ইনজেকশন। স্বজনদের সহযোগিতায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মায়ের চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া ছেলে অনিক কর্মকার বলেন, ‘এখন বলা চলে তিনি কোনোমতে বেঁচে আছেন। তিনি বেঁচে আছেন হাঁটাচলা করছেন, এটাই সান্ত্বনা।’
চট্টগ্রামে ধারাবাহিকভাবে ক্যানসার বাড়ছে। আক্রান্তদের ৬০ শতাংশই নারী। আবার তারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন স্তন ক্যানসারে। আগে যেখানে জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ছিল, সাম্প্রতিককালে সেটিকে ছাড়িয়েছে স্তন ক্যানসার।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি সংশ্লিষ্টদের হিসাবমতে, চট্টগ্রামে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। যদিও এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই বলে জানান চমেক হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ। তার হিসাবে, গত বছর চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ৬০ হাজারেরও বেশি ক্যানসার আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৯ হাজার ৯৬৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন চমেক হাসপাতালে। যেখানে ক্যানসারে নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ৪৪৭ জন, যাদের ৬০ শতাংশই নারী।
আক্রান্ত নারীদের মধ্যে ২৪ শতাংশ নারী স্তন ক্যানসারে, ১৮ শতাংশ জরায়ুমুখ ক্যানসারে, ১৩ শতাংশ নারী মুখগহ্বর, ৬ শতাংশ নারী খাদ্যনালি ক্যানসারে, ৫ শতাংশ ফুসফুসের এবং ৩৬ শতাংশ নারী অন্যান্য ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।
ক্যানসার চিকিৎসকদের মতে, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে মেদাধিক্য, ধূমপান, পরিবেশ দূষণের মতো একাধিক ফ্যাক্টর এই প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি জেনেটিক ফ্যাক্টর তো আছেই। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে এই ভোগান্তি কমানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তনের আকারের পরিবর্তন, স্তন বা বগলে ব্যথাহীন পিণ্ড, স্তনের ত্বকের পরিবর্তন, স্তনবৃন্ত থেকে নিঃসরণ ইত্যাদি ক্যানসারের উপসর্গ হতে পারে।
চট্টগ্রামে স্তন ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় নড়েচড়ে বসেছেন সংশ্লিষ্টরাও। এমনিতে প্রতি অক্টোবর মাসকে সারা বিশ্বে ব্রেস্ট ক্যানসার সচেতনতা মাস হিসেবে পালন করা হয়। এবারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও বেসরকারি হাসপাতাল সিএসসিআরের যৌথ উদ্যোগে মাসজুড়ে শনি, সোম, বুধবার বেলা ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত বিনামূল্যে ব্রেস্ট ক্যানসার স্ক্রিনিং ও কনসালটেশন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই স্ক্রিনিংয়ে নিবন্ধিত রোগীদের অর্ধেক ছাড়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও করার সুযোগ দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরম্যাটিকস (ডিপিএইচআই) বিভাগের নতুন জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যানসার রেজিস্ট্রির তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতি লাখে পুরুষদের ক্ষেত্রে ১১৮ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৯৬ জনের ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব ছিল। গড়ে যেটি প্রতি লাখে ১০৬ জন। চট্টগ্রামের মতো সারা দেশেও নারীদের বেশিরভাগ আক্রান্ত হন স্তন ক্যানসারে।
গবেষণায় নারীদের যে পাঁচটি ক্যানসার বেশি দেখা গেছে- তার মধ্যে ছিল স্তন ক্যানসার (১৬.৮%), ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যানসার (৮.৪%), পাকস্থলীর ক্যানসার (৭%), কণ্ঠনালির ক্যানসার (৭%) এবং সার্ভিক্স ক্যানসার (৫.১%)। বাংলাদেশের প্রতি ১০০ জন নারীর ৯ জনই স্তন ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকেন।