বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস এবং বাংলাদেশ
মো: মামুন হাসান
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৯:৩৮ পিএম
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ২০:০৭ পিএম
মো: মামুন হাসান ,সিনিয়র তথ্য অফিসার ,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রাণিজগতের অন্যতম প্রাচীন ও ভয়ঙ্কর সংক্রামক রোগ হলো জলাতঙ্ক। এটি একটি ভাইরাসজনিত জুনোটিক রোগ, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। সাধারণভাবে মানুষ কেবল কুকুরের কামড়কেই জলাতঙ্কের কারণ হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু বাস্তবে বিড়াল, বানর, বাদুড়, বেজি, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লালার সংস্পর্শেও এ রোগ ছড়াতে পারে। বিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক সংক্রমণ ঘটে কুকুরের মাধ্যমে। ভাইরাসটি একবার শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে পৌঁছালে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এর তথ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ৫৯,০০০ মানুষ জলাতঙ্কে মারা যায়, যার মধ্যে অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র অঞ্চলে। গড়ে প্রতি ৯ মিনিটে একজন মানুষ এ রোগে প্রাণ হারান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই শিশু। এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষতিও ব্যাপক- বছরে প্রায় ৮.৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয় বিশ্বব্যাপী। বর্তমানে বিশ্বের ১৫০টি দেশে জলাতঙ্ক বিদ্যমান এবং ৫৬টিতে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০০৭ সাল থেকে প্রতি বছর ২৮ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এ দিনটি ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের মৃত্যুবার্ষিকীতে পালিত হয়, যিনি প্রথম জলাতঙ্ক প্রতিরোধের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছিলেন। দিবসটির উদ্দেশ্য হলো জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুর-সৃষ্ট মানব জলাতঙ্ক মৃত্যু সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনা।
বাংলাদেশে একসময় জলাতঙ্ক ছিল গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জলাতঙ্ক রোগে মানুষের মৃত্যু সংখ্যা ২০১৫ সালে ছিল ৮৩ জন, ২০১৬ তে ৬৬ জন, ২০১৭ তে ৮০ জন, ২০১৮ তে ৫৭ জন, ২০১৯ তে ৫৭ জন, ২০২০ তে ২৬ জন, ২০২১ তে ৪০ জন, ২০২২ তে ৪৪ জন, ২০২৩ তে ৪৭ জন, এবং ২০২৪ তে ৫৬ জন। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, দেশে ২০২০ সালে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ও মৃত গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ১৪৩ টি, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৬৫টি, ২০২২ সালে ১ হাজার ৬২৩টি এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ১৩০টি গবাদিপশু ।
অর্থাৎ গত ৫ বছরে জলাতঙ্ক আক্রান্ত গবাদিপ্রাণির সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ১৩টি। ২০২০ সালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাঠানো ৮৩টি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত প্রাণীর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে ৭৩টি জলাতঙ্গ রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়। এছাড়া, ২০২১ সালে ৩২৪টি নমুনা পরীক্ষায় ২০৩টি জলাতঙ্ক পজিটিভ শনাক্ত হয়, ২০২২ সালে ৪৭০টি নমুনায় ধরা পড়ে ২৭৮টি, ২০২৩ সালে ১৭৫টি নমুনায় ১২৫টি, ২০২৪ সালে ২০টির মধ্যে ৫টি এবং চলতি ২০২৫ সালে ২৫টি নমুনা পরীক্ষায় ৩টি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।
এই সাফল্য এসেছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, গণটিকাদান কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতার কারণে।
বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি চালু করে। এর আওতায় সরকার নানান ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে- এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক বিনামূল্যে এন্টি-রেবিস ভ্যাকসিন প্রদান। ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ প্রাণীর কামড়ের কারণে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন নিয়েছেন। এছাড়াও, দেশে পথ কুকুরের সংখ্যাধিক্য বিবেচনায় ২০১১ সাল থেকে সমগ্র দেশে মাস ডগ ভ্যাকসিনেশন অর্থাৎ কুকুরের গণটিকাদান কর্মসূচি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার বিভাগ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের প্রায় ১৬ লক্ষ কুকরেকে তিন রাউন্ডে প্রায় ২৯ লাখ ডোজ জলাতঙ্ক রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। এ বছর শুধু বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবসটিকে কেন্দ্র করে আরও ৭০ হাজার পোষা প্রাণীকে (কুকুর/বিড়াল) টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বহুখাতভিত্তিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। WHO, FAO, OIE (WOAH) ও US-CDC - কারিগরি সহায়তা, নীতি নির্ধারণ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মানব ও প্রাণী উভয় খাতে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। স্থানীয় সরকার ও সিভিল সোসাইটি মাঠপর্যায়ে টিকাদান, সচেতনতা ও প্রাণী নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এনজিও ও বেসরকারি সংগঠন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম গণটিকাদান ও সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই সমন্বিত উদ্যোগকেই বলা হয় “One Health Approach”, যেখানে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে একসাথে বিবেচনা করে রোগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল নির্ধারণ করা হয়।
নানাবিধ অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-রাস্তার কুকুর নিয়ন্ত্রণ ও টিকাদানে জটিলতা, গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও টেকসই কর্মসূচির ঘাটতি, উন্নত ল্যাবরেটরি ও দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুর-সৃষ্ট মানব জলাতঙ্ক মৃত্যু সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। এর আওতায়-সারাদেশে নিয়মিত কুকুর টিকাদান, Integrated Bite Case Management (IBCM) বাস্তবায়ন, গ্রামীণ পর্যায়ে ভ্যাকসিন মানুষের জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন সহজলভ্য করা, বাংলাদেশ জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে এক দশকে ৯০% মৃত্যুহার হ্রাস করে বিশ্বে একটি সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে চূড়ান্ত লক্ষ্য- ২০৩০ সালের মধ্যে জলাতঙ্কজনিত মানব মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা- অর্জনে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে।
বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য। সচেতনতা, টিকাদান ও সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল শূন্য মৃত্যুর লক্ষ্য অর্জনই নয়, বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার লড়াইয়েও একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: মো: মামুন হাসান ,সিনিয়র তথ্য অফিসার ,মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।