ডা. এম আর করিম রেজা
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৪:৫৪ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫ ১৬:২৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) এখন নীরব মহামারি হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একসময় অ্যান্টিবায়োটিক ছিল ভরসার নাম, কিন্তু প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে সেসব ওষুধ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, কেবল ২০১৯ সালেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধজনিত সংক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। এ মৃত্যু সংখ্যা ক্যান্সার বা হৃদরোগজনিত মৃত্যুর মতোই ভয়ঙ্কর সংকেত দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হতো এ সংকটের মূল কারণ কেবল অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধও নীরবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়াচ্ছে। বিশেষত আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামলের প্রভাব এখন চিকিৎসকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।
নতুন গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফল
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরা ইশেরিশিয়া কোলাই (ই. কোলাই) নামের ব্যাকটেরিয়ার ওপর গবেষণায় দেখেছেন, অ্যান্টিবায়োটিক সিপ্রোফ্লক্সাসিনকে প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেনের সঙ্গে একত্রে ব্যবহারে ব্যাকটেরিয়ার জিনগত গঠনে বড় পরিবর্তন ঘটে। জীবাণু নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্রিয় করে অ্যান্টিবায়োটিককে কার্যকর হওয়ার আগেই শরীর থেকে বের করে দেয়। ফলে কেবল একটি নয়, একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হয়।
ওষুধের পারস্পরিক প্রভাবের জটিলতা
গবেষণায় আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামলের পাশাপাশি ডাইক্লোফেনাক, ফিউরোসেমাইড, মেটফরমিন, ট্রামাডল, অ্যাটোরভাস্টাটিন, টেমাজেপাম ও সুডোএফেড্রিনসহ ৯টি বহুল ব্যবহৃত ওষুধ বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা গেছে, এককভাবেই এসব ওষুধ ব্যাকটেরিয়ার জিনে প্রভাব ফেলে প্রতিরোধ বাড়াতে পারে, তবে একসঙ্গে ব্যবহার করলে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় থাকা রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
বৈশ্বিক সংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি ও সমাজের জন্যও বড় বোঝা। এতে হাসপাতালে ভর্তি, চিকিৎসার সময় ও খরচ বেড়ে যায়, মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়, হাতুড়ে চিকিৎসক বা লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান থেকে যে কেউ সহজেই কিনতে পারেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যথানাশক ওষুধের অজানা প্রভাব। দুই মিলে এক ভয়ঙ্কর চক্র গড়ে উঠছে।
করণীয় কী?
চিকিৎসকদের ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় রোগীর ওষুধ ব্যবহারের সমন্বয় জরুরি।
ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
জনগণকে বোঝাতে হবে যে প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুধু ব্যক্তির জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্যই হুমকি।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক নীরব বিপর্যয়, আর সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ সেই সংকটকে আরও জটিল করছে। তাই প্রয়োজন বিচক্ষণ ওষুধ ব্যবহার, গবেষণাভিত্তিক নীতিমালা এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা। অ্যান্টিবায়োটিক একদিন সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যাবে—এ ভয়কে বাস্তবে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।