ডা. এমআর করিম রেজা
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৫ ০৮:৪৮ এএম
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৫ ০৮:৫৮ এএম
বাংলাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, শর্টসার্কিট কিংবা রান্নাঘরে আগুন এমন অগ্নিদুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। এসব ঘটনায় দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা শুরু হয় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, তা হলো ‘শরীরের কত শতাংশ পুড়েছে?’ চিকিৎসকরা জানেন, শরীরের যত বড় অংশ দগ্ধ হয়, রোগীর মৃত্যুঝুঁকি ততই বাড়ে।
দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা শুরুতেই তাই চিকিৎসকরা শরীরের পোড়া অংশের অনুপাতে একটি হিসাব নির্ধারণ করেন, যা চিকিৎসা পদ্ধতি ও রোগীর বাঁচার সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা দেয়।
দগ্ধতার হিসাব : কীভাবে করেন চিকিৎসকরা?
Rule of Nines (নাইনস রুল): প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বহুল ব্যবহৃত ও সহজ একটি পদ্ধতি হলো Rule of Nines। এতে মানবদেহকে বিভিন্ন অংশে ভাগ করে প্রতিটি অংশের জন্য নির্দিষ্ট শতাংশ ধরা হয়। যেমন মাথা ও গলা (৯ শতাংশ), বুক ও পেট (সামনের অংশ-১৮ শতাংশ), পিঠ ও কোমর (পেছনের অংশ-১৮ শতাংশ) প্রতিটি হাত (৯ শতাংশ), প্রতিটি পা (১৮ শতাংশ), গোপনাঙ্গ (১ শতাংশ)
যদি কোনো রোগীর দুই হাত এবং বুক-পেট পুড়ে যায়, তাহলে তার মোট পোড়া অংশ হবে ৯ শতাংশ+৯ শতাংশ+১৮ শতাংশ= ৩৬ শতাংশ।
শিশুদের জন্য : Lund and Browder চার্ট : শিশুদের ক্ষেত্রে শরীরের গঠন ভিন্ন হওয়ায় মাথার অনুপাত বেশি হয়। এ কারণে বিশেষ একটি চার্টÑ Lund & Browder Chart ব্যবহার করে হিসাব করা হয়।
Palmar Method (হাতের তালু পদ্ধতি) : জরুরি অবস্থায় রোগীর একটি হাতের তালু (তালুসহ আঙুল) মোট শরীরের আনুমানিক ১ শতাংশ হিসাবে ধরে পোড়ার পরিমাণ বোঝার চেষ্টা করা হয়।
কত শতাংশ পুড়লে কতটা ঝুঁকি?
শুধু পোড়ার শতাংশ জানলেই মৃত্যুঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না। রোগীর বয়স, অন্যান্য শারীরিক জটিলতা এবং ফুসফুসের অবস্থা সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখে। যেমন রোগীর বয়স যদি বেশি হয়; ধরা যাক ৬০ বছরের ওপরে, তাহলে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। আবার কারও যদি ধোঁয়ার কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও পরিস্থিতি মারাত্মক হতে পারে। কেউ যদি আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনির অসুখে ভুগে থাকে, তাহলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
তবে একটি সাধারণ নিয়ম আছে। যদি ২০ শতাংশের নিচে পোড়ে, তাহলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু যতই এই শতাংশ বাড়ে, ততই মৃত্যুর ঝুঁকির হার বাড়তে থাকে। ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পুড়ে গেলে ঝুঁকি একেবারেই এড়ানো যায় না। আর যদি ৮০ শতাংশের বেশি শরীর দগ্ধ হয়, তবে প্রায় ক্ষেত্রেই সেটা জীবনহানির দিকে গিয়ে দাঁড়ায়।
যেসব কারণে ঝুঁকি বেড়ে যায় : ৬০ বছরের বেশি বয়স হলে ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়। ধোঁয়া বা গ্যাস ফুসফুসে ঢুকলে অবস্থা গুরুতর হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুঝুঁকি দ্রুত বাড়ে। পর্যাপ্ত স্যালাইন না দিলে কিডনি ও হার্ট ফেল করতে পারে। ২০ শতাংশের বেশি পুড়লেই রোগীকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ৪০ শতাংশের বেশি পোড়া মানে জীবন ঝুঁকির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।
চিকিৎসক যত তাড়াতাড়ি জানতে পারবেন কত শতাংশ দগ্ধ হয়েছে, তত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা যায়। সেই সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। তাই কেউ দগ্ধ হলে আগে গায়ে পানি ঢালুন, কাপড় খুলুন, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান এবং চিকিৎসককে জানান কোন কোন অংশে দগ্ধ হয়েছে। এই তথ্যই একেকটা প্রাণ বাঁচাতে পারে।
দগ্ধ রোগীদের জন্য সময়ই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। যত দ্রুত সঠিক চিকিৎসা শুরু হবে, ততই বাড়বে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। এজন্যই অগ্নিদগ্ধ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং ঘরে-বাইরে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।