ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৫ ১৮:৫৫ পিএম
শহুর ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বেশি। এর মধ্যে পুরুষের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারীরা। বিশ্বে বছরে ১৩০ কোটি মানুষ (৩০-৭৯ বছর বয়সি) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, যার বেশিরভাগ বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। এই উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগে আক্রান্তসহ মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তা ছাড়া বিশ্বে বছরে এক কোটিরও বেশি মানুষ এ রোগের কারণে মারা যায়। এ মৃত্যু সকল সংক্রামক রোগের মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি।
এ অবস্থায় খাতটিতে বাজেট বৃদ্ধি, নিয়মিত চিকিৎসা প্রদান ও পারিবারিক পর্যায়ে আরও বেশি সচেতনতা সৃষ্টির প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বে ১৩০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে : উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যা অকালমৃত্যু ঘটায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) হিসাবে বিশ্বে ১৩০ কোটি মানুষ (৩০-৭৯ বছর) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে, যার বেশিরভাগ বাস করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি রোগে আক্রান্তসহ মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মানুষ এ রোগের কারণে মারা যায়, যা সকল সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি। বাংলাদেশও উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারির মধ্যে রয়েছে।
সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০২২’-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৪ জনে ১ জন প্রাপ্ত বয়স্ক (২৩.৫%) উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। দেশে উচ্চ রক্তচাপজনিত অসুস্থতা এবং অকালমৃত্যুর বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমিয়ে আনা-সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ ব্যাপারে ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্টস স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ডা. মলয় কান্তি মৃধা বলেন, আমাদের দেশে শহরে উচ্চ রক্তচাপের পরিধি বেশি। লবণাক্ত পানি গ্রহণ করায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ বাড়ছে। আগে পুরুষদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা বাড়লেও বর্তমানে নারীরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এসব নারী যেসব সন্তান জন্ম দিচ্ছেন, তারাও আক্রান্ত হচ্ছে। এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে কাজ করা দরকার।
বিশ্বব্যাপী উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চ রক্তচাপ বিষয়ক প্রথম বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডব্লিউএইচও। তাতে বলা হয়, ৩০-৭৯ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ (৩৪% পুরুষ, ৩২% নারী) উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত এবং ৩০ বছরে (১৯৯০-২০১৯) মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬৫ কোটি থেকে বেড়ে ১৩০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ধনী দেশগুলো থেকে কমে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯ সালে কানাডা, পেরু ও সুইজারল্যান্ডের মতো ধনী দেশগুলোতে বিশ্বের সর্বনিম্ন উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ ছিল।
অন্যদিকে ডোমিনিকান রিপাবলিক, জ্যামাইকা ও প্যারাগুয়েতে নারী এবং হাঙ্গেরি, প্যারাগুয়ে ও পোল্যান্ডে পুরুষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সর্বোচ্চ হার পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ রোগে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ৭৮ শতাংশই বসবাস করে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে স্বয়ং ডব্লিউএইচও। ২০২৩ সালে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৩০-৭৯ বছর বয়সি ৫৫ শতাংশ পুরুষ ও ৪৬ শতাংশ নারী জানেন না, তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হারও খুব কম। মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা পায়, সেখানে ৩৪ শতাংশ পুরুষ ও ৪২ শতাংশ নারী।
ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে, যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। সেখানে ৫১% পুরুষ, ৫৮% নারী। অন্যদিকে ‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’ অনুযায়ী, ২০১১-১৮ সাল সময়ের মধ্যে ৩৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে; যা পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে সিবিএইচসির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. গীতা রানী দেবী বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ। সেখানে ১৪% পুরুষ, ১৫% নারী অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন। নিয়মিত শরীরচর্চা রোগটি থেকে বেঁচে থাকার অন্যতম উপায়। আমাদের দেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ।
ঢাকার সাড়ে ৩ শতাধিক মাঠকে ব্যবহার উপযোগী করা হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য শাখার যুগ্ম সচিব মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, আমরা শরীরচর্চার পরিধি বাড়াব। এটি নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকায় সাড়ে ৩ শতাধিক মাঠ আছে। এগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেসব মাঠ রয়েছে, সেগুলো যেন সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়। যাতে স্থানীয় শিশু থেকে সব বয়সি মানুষ সেখানে হাঁটাহাঁটি করতে পারে। খেলাধুলা করতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপসমূহ
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ মোকাবিলায় সরকারিভাবে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধের তালিকায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট (সিসিএইচএসটি)-এর কমিউনিটি ক্লিনিকে ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা হালনাগাদকরণ কমিটি ২০২৩ সালের ১৪ মে সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধের তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের জন্য এমলোডিপিন ৫ মিগ্রা ও ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরমিন ৫০০ মিগ্রা সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার (সিবিএইচসি), এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)সহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
জনস্বাস্থ্য খাতে ৫ শতাংশেরও কম ব্যয় অসংক্রামক রোগে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ১ শতাংশের নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারের মোট অর্থায়নের মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম ব্যয় হয় অসংক্রামক রোগ-সংক্রান্ত বাজেটে।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ অর্থ রোগীর পকেট থেকে দিতে হয়। এক্ষেত্রে সরকারকে চিকিৎসা খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। কেননা অনেক সময় মানুষ তার শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে চিকিৎসা করায়। সরকার যদি বাজেট বৃদ্ধি করে, তাহলে জনমানুষের ব্যয়ভার কম হবে।
উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সরকারি কার্যক্রম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০১৮ সাল থেকে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা, চিকিৎসা দেওয়া এবং ফলোআপ কার্যক্রম শক্তিশালী করা। বর্তমানে দেশের ৩১০টি উপজেলায় এনসিডি কর্নারে কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তৃণমূল পর্যায়ে প্রকল্পটি আরও সফল করতে সিলেট জেলার ৪টি উপজেলার (গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজার) ৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে।
পাঠ্যসূচিতে স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা দরকার
প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের পাঠ্যসূচিতে স্বাস্থ্য বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা দরকার বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. এনামুল হক। তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বাজেট বৃদ্ধির পাশাপাশি বরাদ্দকৃত বাজেট সঠিকভাবে কাজে লাগানোর চিন্তা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সেজন্য আমাদের পাঠ্যসূচিতে স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের বাসস্থানকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে অথচ আমরা হাসপাতালকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে নিই। সুস্থ থাকতে হলে স্বাস্থ্যসেবাকে নিজ ঘর থেকেই শুরু করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ কমাতে দীর্ঘদিন ধরে সভা, সেমিনার ও জনসচেতনতা বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় দাবি করা হয়েছে, উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কমাতে সকল হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা এবং ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তা হবে অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় একটি ব্যয়সাশ্রয়ী পদক্ষেপ।