প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৫ ২২:৩৯ পিএম
বাংলাদেশের ৬৫৪টি সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ৫১ হাজার ৩১৬টি শয্যা। কিন্তু এসব হাসপাতালে একজনও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি ২৫ শয্যার জন্য একজন করে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক। বাস্তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষিতই থেকে গেছে। ফলে দেশের ওষুধ ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক সংকট, যা রোগীর সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
শুক্রবার (২ মে) রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য তুলে ধরেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাউন্সিলের হাসপাতাল ফার্মেসি কমিটির সভাপতি মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, “স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হতে হলে সবার আগে ফার্মাসিস্টদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সরকার নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ৭০০ নতুন ওষুধের দোকান চালু করতে যাচ্ছে, যেখানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কাজ করবেন। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”
সভাপতির বক্তব্যে মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, “আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় হাসপাতাল ফার্মাসিস্ট ছাড়া গুণগত স্বাস্থ্যসেবা অসম্ভব। অথচ দেশে এখনও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়াই ওষুধ সংরক্ষণ, ডিসপেন্সিং ও বিতরণ চলছে। ডাক্তার, নার্স এবং ফার্মাসিস্ট একত্রে কাজ করলে রোগী পাবেন নিরাপদ চিকিৎসা।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সভাপতি মো. সাইদুর রহমান বলেন, “হাসপাতালে ফার্মাসিস্টের অংশগ্রহণ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার ৭০০ ফার্মেসি করার উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের পদায়ন করা হবে।”
আরেক বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, “জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-এর ৪.৩ অনুচ্ছেদে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ফার্মাসিস্টের তত্ত্বাবধানে হসপিটাল ফার্মেসি কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। ফলে ওষুধের অপব্যবহার এবং অনিরাপদ ব্যবহারে রোগীরা বিপদে পড়ছেন।”
সভায় জাতীয় পর্যায়ের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। তিনি বলেন, “বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে ওষুধ ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যা স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে।” আন্তর্জাতিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ইউ লি চ্যাং।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান, এক্রিডিটেশন ও এডুকেশন কমিটির সদস্য, হসপিটাল ফার্মেসি কোর্সের শিক্ষক এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের কর্মরত ফার্মাসিস্টরা।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে ফার্মাসিস্টরা বিপ্লব ঘটিয়েছেন। দেশ এখন বছরে ৯৮ শতাংশ দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ১৬০টির বেশি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। অথচ দেশের রোগীরা সেই দক্ষতার সুফল পাচ্ছেন না, কারণ চিকিৎসা ব্যবস্থায় তাদের যুক্ত করা হয়নি।
বক্তারা আরও বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে ৬৫৪টি সরকারি হাসপাতালে ৫১ হাজারের বেশি শয্যা থাকলেও একজনও গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। এর ফলে ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা বা নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারে রোগীরা দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন, কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ফার্মাসিস্ট থাকা অপরিহার্য।
সভায় বক্তারা হাসপাতালে ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পদবিন্যাস প্রস্তাব করেন। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বহির্বিভাগ ফার্মেসিতে একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট এবং প্রতি ৫০ শয্যার জন্য অন্তঃবিভাগে একজন ফার্মাসিস্ট নিয়োগ দেওয়া উচিত। সেইসঙ্গে ‘ফার্মাসিস্ট (ক্লিনিক্যাল) > সিনিয়র ফার্মাসিস্ট > উপ-প্রধান ফার্মাসিস্ট > প্রধান ফার্মাসিস্ট’—এভাবে পদোন্নতির সুযোগ তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
সবার বক্তব্যে উঠে আসে একটি বিষয়—চিকিৎসক ও নার্সের পাশাপাশি একজন দক্ষ ফার্মাসিস্ট না থাকলে ‘সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা’ সম্ভব নয়। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে সে ঘাটতি আজও রয়ে গেছে।