মেরিলিন ফারজানা আহমেদ
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫৩ পিএম
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫৮ পিএম
শারমীন একটি কর্পোরেট অফিসে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে কর্মরত। তিনি বিবাহিতা এবং একটি কন্যা সন্তান রয়েছে তার। গত দুমাস ধরে তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করছেন। অফিস থেকে ফিরে অল্পতেই রেগে, চিৎকার করেন, বাচ্চার খেয়াল রাখতে পারছেন না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ঘুমের ব্যাঘাত ও খাবারে অনীহা। সব বিষয়ে নেতিবাচক চিন্তা করছেন। আত্মঘাতী আচরণ করছেন। অন্যদের থেকে নিজেকে অনেক বিচ্ছিন্ন মনে করছেন। পরিবারের কারো সুখ - আনন্দ ইত্যাদিকে গুরুত্ব দিতে পারছেন না, কাজ করার জন্য প্রেরণা পাচ্ছেন না, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন, ভাবছেন পরে করবো। ফলে তিনি নিজেকে অযোগ্য ভাবছেন। হাসি-খুশী মানুষটি হয়ে উঠেছেন খিটখিটে মেজাজের।
পেশাগত চাপ বা কর্মক্ষেত্রের চাপ (অকুপেশনাল স্ট্রেস) কমবেশি সব পেশাজীবীদেরই থাকে। অতিরিক্ত কাজের চাপের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে না পারা, সহকর্মীদের সঙ্গে মতের অমিল ইত্যাদি কারণেও উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা হয়। তবে এই দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ যদি নিয়ন্ত্রণে আনা না হয় তা ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত মানসিক চাপ তখন হয়ে ওঠে ব্যক্তি সফলতার একটি বাধা। ওপরের শারমীনের মতো, কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত মানসিক চাপকে আমলে না আনায় তা কীভাবে ব্যক্তিগত জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে, তেমন দৃষ্টান্ত জানতে আমরা কথা বলেছিলাম, "শোনো" নামের একটি মানসিক স্বাস্থ্য কেয়ার লাইনে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশিষ্ট মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ (সাইকিয়াট্রিস্ট) ও মনোবিজ্ঞানীদের (সাইকোলজিস্ট) সাথে।
শারমীনের সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর জনাবা আখতার বানু শম্পা, সাইকোলজিস্ট, শোনো; থেকে জানা যায় ক্লায়েন্টের মানসিক সমস্যা শনাক্ত করার জন্য মৌলিক ফর্মুলেশন করে দেখা গেল, তার প্রচণ্ড বিষণ্নতা (সিভিয়ার ডিপ্রেশন) এবং উদ্বেগের (আ্যংজাইটি) জন্য দায়ী তার কর্মক্ষেত্রের নানা কারণ। যেমন, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনেক কাজ করতে গিয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপ অনুভব করেন। কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রেসার তার উদ্বেগ (আ্যংজাইটি) বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া সহকর্মীদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ঊর্ধ্বতনদের প্রভুসুলভ আচরণ ও অনৈতিক প্রস্তাব, কাজের যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া, একটুতেই চাকরি হারানোর ভয় তাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলেছে।
কর্মক্ষেত্রের মানসিক চাপ বা কর্মস্থলের অসহযোগীতামূলক পরিবেশ দীর্ঘদিন সহ্য করলে ব্যক্তির ব্যক্তিগত, সামাজিক, শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার প্রকট সম্ভাবনা থাকে। এরকম আরো দুইটি ঘটনা দেখলে ব্যাপারটির জটিলতা সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া যাবে।
সুমন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি করেন। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে সাথে নিয়ে তার পাঁচ বছরের সুখী দাম্পত্য জীবন। চাকরিসহ পারিবারিক সকল দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করে তিনি অভ্যস্ত। করোনা পরবর্তী সময়ে দেশীয় ব্যাংকগুলোতে যখন রিজার্ভ সংকট তৈরি হয়, সুমনের অফিসের কাজের চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। পারিবার ও কর্মক্ষেত্রের চাপ সামলাতে যেয়ে তিনি হিমশিম খেতে লাগলেন। একদিন কাজের ডেডলাইন পার হয়ে যাওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তীব্র সমালোচনার শিকার হলেন, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সময়ের সাথে সাথে ঊর্ধ্বমুখী কাজের চাপের ফলে তার মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে, যার ফলস্বরূপ, তিনি সবসময় বিষণ্ন থাকতেন, ঘুমাতে পারতেন না এবং কিছুদিন পরপর প্যানিক অ্যাটাকের (ভীতি ও উদ্বেগের অনুভূতি) শিকার হতেন। বিশেষ করে কোনো ডেডলাইন এগিয়ে আসলে প্যানিক অ্যাটাক হওয়া শুরু করতো, এ সময় তার শ্বাস নিতে কষ্ট হতো, দম বন্ধ হয়ে আসতো, মনে হতো, মারা যাবেন। অবস্থা আরো অবনতি হলে তিনি “শোনো”র পরামর্শক ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদ, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপকের শরণাপন্ন হন।
অন্যদিকে, ফরহাদ সাহেব একটি গার্মেন্টসে নতুন চাকরিতে ঢোকার পরপরেই তার কর্মস্থলের দুইজন সহকর্মী দ্বারা নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে থাকেন। হেনস্তা করার একটি বড় কারণ ছিল তার নিজ জেলার পরিচয়। জেলার নাম তুলে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, কাজে ত্রুটি না থাকলেও অসৌজন্যমূলক কথা তার উদ্দেশ্যে বলা হতো। এ সমস্ত মানসিক অত্যাচারের পাশাপাশি চেয়ারে পিন রেখে দেয়ার মতো মারাত্মক ঘটনার সম্মুখীনও হয়েছেন তিনি। প্রায় ছয় বছর সব সহ্য করে গিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে নিজ থেকেই চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেন। তিনি এই চাকরিটিতে অনেক আশা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যোগদান করেছিলেন কিন্তু কর্মস্থলের তিক্ত অভিজ্ঞতা দীর্ঘকালীন ট্রমার (মানসিক আঘাত) সৃষ্টি করে, যার ফলে পরবর্তীতে তিনি নতুন করে কোনো চাকরিতে যোগদানের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

ডা. নাসির উদ্দিন আহমেদের মতে, সুমন সাহেবের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি অন্তর্মুখী প্রকৃতির একজন ব্যক্তি যিনি সবসময় রুটিনমাফিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে অভ্যস্থ। কর্মস্থলের অতিরিক্ত চাপ যখন তার রুটিনের ওপরে নিয়মিত প্রভাব ফেলা শুরু করে এবং বসের সমালোচনা, পূর্বে অতিরিক্ত চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় সব মিলিয়ে তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকতেন। অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্ব থাকায় তিনি তেমন কারো সাথে তার মানসিক চাপ নিয়ে কথাও বলতেন না। ফলে ধীরে ধীরে অতিরিক্ত উদ্বেগ, চাপ, অবসাদ থেকে দীর্ঘ মেয়াদি ডিপ্রেশন ও প্যানিক অ্যাটাকের উপসর্গ দেখা দেয়া শুরু করল।
ফরহাদ সাহেবের ঘটনায়, ফরহাদ সাহেবের পরামর্শক, সেন্টার ফর সাইকোলজিকাল হেলথ, লন্ডন ও ঢাকা শাখার কনসালট্যান্ট সাইকোলজিস্ট, জনাব জে ইউ এম নাজমুল হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, বছরের পর বছর সহকর্মী দ্বারা বুলিং, প্রচণ্ড অসহযোগিতামূলক আচরণ, কর্মস্থলে মানসিক সুস্থতার চর্চা ও সমর্থনের অভাব তার মানসিক অবস্থার এতটাই অবনতি ঘটিয়েছে যে তার মধ্যে পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার) এর লক্ষণগুলো প্রকট হয়ে উঠে ফলে কর্মক্ষেত্র নিয়ে তার মাঝে একটি স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা, হতাশা, উদ্বেগ জেঁকে বসে। যদিও ফরহাদ সাহেব নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে, বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তবুও নাজমুল সাহেবের মতে, ফরহাদ সাহেবের মানসিক আঘাতের ব্যাপ্তি ততদিনে এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে, এর প্রতিকার এখন হতে হবে দীর্ঘমেয়াদী।
উপরের তিনটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই ধারণা পাওয়া যায় যে, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এর বিপরীতে ব্যবস্থা বা মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন না নেয়ার পরিণতি কতটা ভয়ানক হতে পারে। গত বছর (২০২৪ সালে) ১০ অক্টোবর, পালিত হলো বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো: ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার এখনই সময়’।
শুধুমাত্র ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, বরং সামষ্টিকভাবে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মাত্রাতিরিক্ত চাপ, নিজেদের মাঝে সুসম্পর্ক, সুস্থ পেশাদার মনোভাব ও আচরণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত চাপ সামাল দেয়া এবং কর্মস্থলে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কিছু বিষয় মেনে চলা, একটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মীদের জন্য প্রয়োজন:
১। কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ প্রদান করা উচিত।
২। আপনার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের কাউন্সেলিং সেবা, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট কর্মশালা, অনলাইন / অফলাইন হেল্পডেস্ক, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত করুন।
৩। কর্ম ও ব্যক্তিজীবনে ভারসাম্য রাখার অভ্যাস করতে হবে। কাজের ক্ষেত্রে কোম্পানিকে যেমন নমনীয় থাকতে হবে, তেমনিভাবে কর্মীকেও নিয়মিতভাবে বিরতি নিতে উৎসাহ দিতে হবে যা সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে এবং কোম্পানির সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে করে কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক শান্তির পথেও বাধা তৈরি করতে পারবে না।
৪। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অনেক কাজ শেষ করতে গিয়ে কর্মীরা মানসিক চাপ অনুভব করেন। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রত্যাশার অতিরিক্ত চাপ কর্মীদের মধ্যে মানসিক উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। কাজের এই চাপ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে এটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৫। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি জরুরি। কর্মক্ষেত্রে হিংসাত্মক বা অবমাননাকর আচরণ দূর করতে কর্মীদের মধ্যে নিয়মিতভাবে টিমবিল্ডিং ট্রেনিং করা উচিত।
৬। নিয়মিতভাবে কর্মীদের কাজের মূল্যায়ন করে তাদের উন্নতির জন্য সুবিধাজনক পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।
৭। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা প্রণয়ন করে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। যদি কোনো কর্মী তার মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হন, তাহলে তিনি তার ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করতে পারেন।

উল্লেখ্য "শোনো" বিভিন্ন সময়ে "মাইন্ড ম্যাটার্স" শীর্ষক কর্পোরেট মেন্টাল ওয়েলনেস প্রোগ্রাম ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ এর আয়োজন করে থাকে, যা কর্মজীবীদের মধ্যে মানসিক সুস্থতার ধারণা পৌঁছে দেয়।
দিনশেষে মনে রাখা জরুরি যে, পেশাজীবীরা দিনের একটি বড় অংশ কর্মক্ষেত্রে ব্যয় করেন। কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, কর্মকাণ্ড শুধু কর্মক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, ব্যক্তির সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারিবারিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেয়া বা এড়িয়ে চলার কোনো অবকাশ নেই, এতে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাকেই ডেকে আনা হবে। কর্মস্থলে সফলতা আমরা সবাই কমবেশি চাই, তাই কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ, কর্মক্ষেত্রের জটিলতাকে অবহেলা না করে একে সমাধান ও মোকাবিলা করা এখন সময়ের দাবি।
দাবি পরিত্যাগী:
উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনার চরিত্রের নাম কাল্পনিক ও একান্তই পাঠের সহজবোধ্যতার জন্য উল্লেখ করা।
মেরিলিন ফারজানা আহমেদ, ফেলো - জবস এন্ড প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপমেন্ট, ইয়ুথ পলিসি ফোরাম-ওয়াইপিএফ
ফারিয়া জাহান নূর, ডেপুটি লিড, এডুকেশন এন্ড স্কিল পলিসি টিম, ইয়ুথ পলিসি ফোরাম-ওয়াইপিএফ