পারভেজ খান ও আসাদুজ্জামান তপন
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০৯ এএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:৫১ এএম
জরুরি সেবাদানে যে যানটি অসুস্থ কাউকে নিয়ে রাজপথ থেকে শুরু করে শহর-নগরের অলিগলিতে বিরতিহীনভাবে সাইরেন বাজিয়ে ছুটে চলে সেটির নাম অ্যাম্বুলেন্স। অসুস্থ ব্যক্তি বা রোগীদের দ্রুত ও নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহৃত হয় পরিবহনটি। এটির আরও বেশকিছু আভিধানিক নাম আছে- ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল, তৃণমূল হাসপাতাল, রোগীর কাছে ছুটে যাওয়া খুদে হাসপাতাল ইত্যাদি।
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে যেসব অ্যাম্বুলেন্সকে পথেঘাটে ছুটোছুটি করতে দেখা যায় সেগুলোর প্রায় শতভাগই মূলত অ্যাম্বুলেন্স নয়। এগুলোর বেশিরভাগই মাইক্রোবাস কেটে বানানো। ভেতরে লক্কড়ঝক্কড় একটি ট্রলি ছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বলতে তেমন কিছুই থাকে না। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে বহনকারী এসব অ্যাম্বুলেন্স নিজেই একেকটা মৃত্যুপথযাত্রী রোগী।
পেশিশক্তির ব্যবহার, রাজনৈতিক পরিচয়, বিআরটিএ এবং পুলিশকে ম্যানেজ করে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট সেবার নামে এই বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক এবং প্রকৃত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতি ও ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির কর্মকর্তাদের দাবি, মাইক্রোবাস কেটে যে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হয় সেগুলো এখন আর সাধারণত ঢাকায় চলাচল করে না। এগুলো সবই ঢাকার বাইরে চলে। তা ছাড়া সব অ্যাম্বুলেন্সই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে রেজিস্ট্রেশন করানো।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে কথা হয় বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদল মাতব্বর ও ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল দেওয়ানের সঙ্গে। টেলিফোনে কথা হয় বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফার সঙ্গেও। তাদের সবারই অভিন্ন কথা। ঢাকা শহরে এখন রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ব্যতীত রূপান্তরিত অ্যাম্বুলেন্স নেই। ঢাকার বাইরে রূপান্তরিত অ্যাম্বুলেন্স আছে। ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী অ্যাম্বুলেন্সগুলো অ্যাম্বুলেন্স হিসেবেই ইম্পোর্ট করা। সারা দেশে প্রায় নয় হাজার অ্যাম্বুলেন্স আছে।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, প্রতিটি যানেরই একটি রেজিস্ট্রেশন আছে, যার নম্বরকে প্রচলিত অর্থে নম্বর প্লেট বলা হয়। সেখানে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ‘ছ’ সিরিয়াল নির্ধারণ করা আছে। শুধু ‘ছ’ সিরিয়ালই নয়, এর সঙ্গে মূল নম্বরের আগে ‘৭১’ অথবা ‘৭৪’ ও ‘৭৫’ যোগ হয়। এর বাইরে কোনো নম্বরযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স দেখা গেলেই বুঝতে হবে সেটি মাইক্রোবাস কেটে তৈরি করা এবং প্রকৃত অ্যাম্বুলেন্স নয়।
বিআরটিএর পক্ষ থেকে এ ধরনের অ্যাম্বুলেন্সকে রাস্তায় চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই সংস্থারই কিছু অসৎ কর্মকর্তার পরোক্ষ মদদে এরা অবাধে চলাচল করছে। কোনো মনিটরিং নেই। বিআরটিএর অনুমতি ছাড়া যেখানে একটি গাড়ির বাইরের রঙ পরিবর্তন করাটাই নিষিদ্ধ, সেখানে মাইক্রোবাসের পুরো অবয়ব পাল্টে তৈরি করা হচ্ছে এই বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স। এরপর সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নানা জাল কাগজপত্র তৈরি করে বিআরটিএ থেকেই নেওয়া হচ্ছে রেজিস্ট্রেশন।
সূত্র মতে, সড়ক পরিবহন আইনের ৩১ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, রুট পারমিট প্রযোজ্য নহে, এইরূপ কোনো মোটরযান দ্বারা বাণিজ্যিক কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। যেসব মাইক্রোবাস কেটে অ্যাম্বুলেন্স বানানো হয়েছে সেগুলোর কোনোটারই রুট পারমিট নেই। এগুলো প্রাইভেট এবং সারা দেশেই চলাচল করতে পারবে। ফলে এগুলো কেটে অ্যাম্বুলেন্স বানিয়ে সেগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করাটা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সূত্র আরও জানায়, কেবল সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের অ্যাম্বুলেন্সকেই নিবন্ধন দেওয়া হয়। ব্যক্তিমালিকানার অ্যাম্বুলেন্স চলাচল অবৈধ। এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে নিবন্ধন পেতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। যেমনÑ রোগীর জন্য স্থায়ী শয্যা (মাথার দিকে রিভলভিং), অক্সিজেন সিলিন্ডার ও মাস্ক, চিকিৎসক বসার ব্যবস্থা, স্ট্রেচার ও সাইরেন থাকতে হবে। এ ছাড়া চালক, চিকিৎসক, রোগীসহ সর্বোচ্চ ছয়জন বহন করা যাবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। সিংহভাগ অ্যাম্বুলেন্সই এই শর্ত পূরণ করেনি। আর এসব অ্যাম্বুলেন্সের অধিকাংশই ব্যক্তিমালিকানার। এ ছাড়া বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে নিবন্ধন পেয়েছে মাইক্রোবাস কেটে বানানো যানগুলো। এই নিবন্ধন পাওয়ার ব্যাপারে বিআরটিএর প্রচলিত আইন মানা হয়নি। মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা নামকাওয়াস্তে একটি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে। আসলে নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকার কারণে আর সঠিক নজরদারির অভাবে এসব ঘটছে।
কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্স মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু ঢাকার অভ্যন্তরে সার্ভিস দিয়ে থাকে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ হৃদরোগ হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স, ঢাকা মেডিকেল অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, আদ্ব-দ্বীন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিমিটেড।
ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে রয়েছে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান। সারা দেশে তাদের মোট অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা প্রায় চার হাজার।
স্কয়ার হাসপাতাল অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান (জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল), কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, আলিফ অ্যাম্বুলেন্স ও আল মারকাজুল ইসলাম অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সগুলো ঢাকাসহ সারা দেশে রোগী ও লাশ পরিবহনে সেবা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া নামে-বেনামে রাজধানীজুড়ে ভাড়ায় চলে আরও শত শত অ্যাম্বুলেন্স।
এগুলোর বাইরে রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যক্তিমালিকানায় কতগুলো অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে তার সঠিক হিসাব কারও কাছেই নেই। এসব অ্যাম্বুলেন্সের শতকরা ৯০টিই মাইক্রোবাস কেটে তৈরি করা এবং একটি অ্যাম্বুলেন্সে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক তার ন্যূনতম ব্যবস্থাও এগুলোতে নেই। খুব বেশি থাকলে একটি ট্রলি আর বড়জোর একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার। এই সিলিন্ডারও পরিচালনা করেন চালক বা তার সঙ্গে থাকা একজন হেলপার।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক আব্দুস সালাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু দেশের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো যোগসূত্র নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাদের কোনো অনুমোদনও নিতে হয় না।
বিআরটিএর লাইসেন্স নিয়ে লোক দেখানো কিছু মেডিকেল যন্ত্রাংশ সংযোজন করে ‘অ্যাম্বুলেন্স’ পরিচয় দিয়ে ঠেলে দেওয়া হয় রাস্তায়। অথচ আধুনিক চিকিৎসা উপকরণে সমৃদ্ধ একটি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহনকালেও চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়। এতে রোগীর ঝুঁকি অনেকটা কমে আসে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ব্যবহৃত সরকারি বা বেসরকারি বেশিরভাগ অ্যাম্বুলেন্সেই এসব সুবিধা নেই। ফলে হাসপাতালে আনার সময় মারা যায় অনেক রোগী, অনেকে হয়ে পড়ে আরও বেশি অসুস্থ।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স প্রতিষ্ঠানের মালিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, তাদের প্রায় ৩০টির মতো অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে এবং ঢাকায় তারা সবচেয়ে কম টাকায় সার্ভিস দিয়ে থাকেন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের কর্মচারীরা এখন সারা দেশে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা দখলে নিয়েছে। হাসপাতালের সামনে অন্য সব ভালোমানের অ্যাম্বুলেন্স তারা ভিড়তে দেন না।
মূলত কোনো নীতিমালা না থাকায় সরকারি হাসপাতালের কর্মচারীরা মাইক্রোবাস কেটে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসা দেদার চালিয়ে যাচ্ছে। রোগীবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্সে যা যা থাকা দরকার তার কিছুই ওইসব অ্যাম্বুলেন্সে নেই। অ্যাম্বুলেন্স কখনও প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস বা যাত্রীবাহী গাড়ি হতে পারে না।
অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে রোগীর একটা যোগসূত্র রয়েছে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রোগীকে সাময়িক কিছু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার দায়িত্বও অ্যাম্বুলেন্সের ওপর বর্তায়। একটি ভালোমানের অ্যাম্বুলেন্সে থাকবে প্রাথমিকভাবে আইসিইউর প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা উপকরণ।
ঢাকার গুটিকয়েক উন্নতমানের অ্যাম্বুলেন্সে প্রশিক্ষিত ডাক্তার, নার্স ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ থাকলেও সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে ডাক্তার না থাকলেও নিদেনপক্ষে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন ভালো মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট থাকা প্রয়োজন। আর এসব সুবিধা থাকলেই একজন মুমূর্ষু রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে আনার সময় পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু এসবের কিছুই নেই। মাইক্রোবাস কাটা অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে টাকাই মুখ্য।
দেশের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পুরোপুরি সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণে না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের সঙ্গে রোগীর জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি জড়িত। এমন মানবিক বিষয় নিয়ে কেউ ইচ্ছামতো অমানবিক কাজ করে যাবে তা হতে দেওয়া যায় না। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি করলেও অজ্ঞাত কারণে এখনেও তা চূড়ান্ত হয়নি। নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
তিনি আরও বলেন, তবে কিছু কিছু উপজেলায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একজন সহকারী কমিশনার, এসি ল্যান্ড, একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং একজন সমাজসেবা কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের অ্যাম্বুলেন্স চলাচল মনিটরিং কমিটি আছে। তবে সেটা নামমাত্র। তারা শুধু সরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোই দেখভাল করেন এবং ভাড়া নির্ধারণ করে দেন।
প্রতিষ্ঠিত অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, তারা সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স মালিক, চালক আর দালাল সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় এসব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে আছেন বাবুল, বাদল, উজ্জ্বল, রাজু, নাসির ও ইমন।
পঙ্গু, হৃদরোগ, চক্ষু বিজ্ঞান, শিশু হাসপাতালসহ আশপাশের সাতটি হাসপাতাল এলাকায় সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন আলমগীর, বাবু, সেলিম খান ও সাজ্জাদ।
এ ছাড়া বৃহত্তর উত্তরা এলাকায় গোলাম মোস্তফা, বাংলামোটর এলাকায় রিপন, সাবেক পিজি হাসপাতাল এলাকায় খোকন, রফিক ও শহীদুল এবং পুরান ঢাকাসহ মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় কামাল, রশিদ, লতিফ ও সোহেল এসব অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট চালিয়ে আসছেন।
সিন্ডিকেটের এসব নিয়ন্ত্রক নিজ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী এবং তারাই মূলত এলাকা ভাগ করে নিয়ে এই অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। বিআরটিএ এবং পুলিশের লাইনম্যান হিসেবেও কাজ করেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র মতে, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও অসুবিধা দূর করে একটি আধুনিক, মানসম্মত ও সেবাধর্মী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রচলনের লক্ষ্যে ‘অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা, ২০২৩’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করা হলেও সেটি চূড়ান্ত হয়নি। বিআরটিএ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি এই খসড়া তৈরি করেছে।
কমিটির অন্যতম সদস্য এবং সেই সময়ের বিআরটিএ পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই রব্বানী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যেকোনো সময় নীতিমালাটি পাস হবে বলে আমি আশাবাদী। আর এটি পাস হলে অনেক কিছুই আইনের আওতায় আসবে। তখন অব্যবস্থাপনাও অনেকটা দূর হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘অ্যাম্বুলেন্স’ অর্থ অসুস্থ ও আহতদের বহন অথবা অন্য কোনো চিকিৎসাজনিত উদ্দেশ্যে এবং তজ্জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করে ডিজাইনকৃত ও নির্মিত মোটরযান। শুধুমাত্র সম্পূর্ণ যুক্ত (Complete Build Up-CBU) অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে আমদানিকৃত ডুয়েল এয়ারকন্ডিশন্ড বিশিষ্ট মোটরযানকে এই সার্ভিসে ব্যবহার করা যাবে। মাইক্রোবাস জাতীয় মোটরযানকে স্থানীয়ভাবে রূপান্তর করে অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
অ্যাম্বুলেন্সে রোগীকে শোয়ানোর জন্য উপযুক্ত পরিমাণের বেড সংবলিত স্ট্রেচার থাকতে হবে এবং কমপক্ষে একজন প্যারামেডিকস (নার্স/মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট) থাকতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সে মেডিকেল যন্ত্রাংশ এবং ব্যবহারযোগ্য মেডিকেল দ্রব্যাদি (অক্সিজেন সিলিন্ডার, নেবুলাইজার মেশিন, ইন্ট্রাভেনাস ইনজেকশন স্ট্যান্ড, ফার্স্ট এইড বক্স, ফার্স্ট এইড কিট, ট্রমা প্যাডস ইত্যাদি) রাখার জন্য পর্যাপ্ত এবং নিরাপদ জায়গা থাকতে হবে।
নীতিমালায় আরও উল্লেখ আছে, অ্যাম্বুলেন্সে সেফটি বেল্টযুক্ত স্ট্রেচার থাকবে; যার পরিমাপ হবে অন্যূন ১৯০x৫০x৯০ সেমি। এতে ঝাঁকুনি রোধ সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য থাকবে এবং ভাঁজ করা যায় এই ধরনের বহনযোগ্য সাব স্ট্রেচার থাকতে হবে। অ্যাম্বুলেন্সের ছাদের ওপরে ঘূর্ণায়মান লাল রঙের বিকন লাইট থাকতে হবে। অনবরত শব্দ তৈরি করতে পারে এরূপ অ্যামপ্লিফায়ারসহ সাইরেন ও স্পিকার থাকতে হবে। এক্ষেত্রে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন বা সাইরেন থেকে নির্গত শব্দের মানমাত্রা নির্ধারিত হবে এবং প্রতিটি অ্যাম্বুলেন্সে রিফ্লেক্টিভ ট্রায়াঙ্গেল থাকতে হবে।
খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন সংক্রান্ত গঠিত কমিটি বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বলেছে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিকের পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পরিচালিত হতে দেখা যায়। এটি আইনসিদ্ধ নয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত অ্যাম্বুলেন্স সাধারণত মাইক্রোবাস জাতীয় গাড়িকে স্থানীয়ভাবে রূপান্তর করে তৈরি করা হয়।
সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি-৬১-এর ব্যাখ্যা অংশে অ্যাম্বুলেন্সের অর্থ উল্লেখ থাকলেও উক্ত বিধিমালায় অ্যাম্বুলেন্সের গঠন কাঠামো বা অ্যাম্বুলেন্সের আবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকায় রূপান্তারিত এসব অ্যাম্বুলেন্সে অসুস্থ রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সুবিধাদি অনুপস্থিত থাকে।
অন্যদিকে সরকার কর্তৃক অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া নির্ধারিত না থাকায় তারা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে। মানহীন এসব অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সেবাপ্রত্যাশী রোগী ও রোগীর স্বজনরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। বরং তারা বিভিন্নভাবে ভোগান্তির শিকার হয়ে থাকেন।