ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৪ এএম
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৪ ১১:১২ এএম
সচরাচর দেখা যায় বর্ষা মৌসুমেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হয়। এবার বর্ষা শেষ হয়ে শীতও এসে পড়েছে। কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমেনি। এখনও তা রয়ে গেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে। মাসের হিসাবে ডেঙ্গুর মৌসুম শেষ হলে এ বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে নভেম্বরে। ডিসেম্বরেও যে এই প্রাণঘাতী রোগের হাত থেকে রেহাই মিলবে, তারও কোনো লক্ষণ নেই। বাস্তবতা এমন, এখন আর গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, হেমন্ত কিংবা বসন্ত বলে কোনো কথা নেই। পুরো বছরটাই যেন ডেঙ্গুর মৌসুম হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা অবশ্য ধারণা দিয়েছেন, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ নাগাদ হয়তো ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কমে আসতে পারে।
কেন এই অবস্থা সেটা এক কথায় বলা না গেলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডেঙ্গুর ভয়াবহতার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি সরকারের দায়সারা পদক্ষেপ, এডিস মশার প্রজনন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ায় ঘাটতি, পর্যাপ্ত গবেষণা না করা ও জনসচেতনতার অভাবই ডেঙ্গুতে এত প্রাণ ঝরে যাওয়ার কারণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, এবার বর্ষা এসেছে দেরিতে। এর মধ্যে একাধিকবার নিম্নচাপ হওয়ার কারণেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে গবেষণাগুলো হওয়া প্রয়োজন তাও হয়নি। ফলে রোগীরা জানতে পারছে না তাদের শরীরে ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী হতে পারে। মানুষকে সচেতন করা দরকার। ডেঙ্গু মোকাবিলায় উপযুক্ত ওষুধ তৈরি করতে হলে মশার স্বভাবচক্র নিয়ে গবেষণা করতে হবে। সেই গবেষণাও হয়নি। জাতীয় কৌশল বাস্তবায়ন করে মাঠপর্যায়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, তার কিছুই দেখা যায়নি। ডেঙ্গুর মতো রোগে আক্রান্ত হয়ে এত মানুষের মৃত্যু সত্যিই দুঃখজনক।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গুর যে লক্ষ্মণগুলো আছে সেখানে দেখা যায় জ্বর নেই, রোগীর পাতলা পায়খানা হয়েছে। সেখানে রোগী ডায়রিয়া ভেবে বাসায় বসে স্যালাইন খাচ্ছে। পরে যখন ডাক্তারের কাছে আসে রক্ত পরীক্ষায় দেখা যায় প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। কারও শক সিনড্রোম দেখা দেয়। ফলে রোগীরা যেমন দ্বিধায় ভুগছেন তেমনি ডেঙ্গু হয়েছে কি না সেটা বুঝতে ডাক্তারদেরও দ্বিধায় পড়তে হচ্ছে। শনাক্তকরণে রোগীরা কনফিউজড হয়ে যাচ্ছে। গবেষণা করে লক্ষ্মণগুলোর পরিবর্তন নিয়ে যে কাজ করা দরকার ছিল তা হয়নি বলেই ডেঙ্গু দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে। যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেন তারা গবেষণাকে গুরুত্ব দেন না। যেসব জায়গায় অর্থের ভাগাভাগি আছে সেখানে গুরুত্ব দিলেও গবেষণার মতো জায়গায় তারা আগ্রহী না। আবার গবেষণা করার জন্য যে ধরনের ভাবনা প্রয়োজন সেটা তাদের নেই। দক্ষ জনবল নেই।
ভয়ংকর নভেম্বর
এ বছর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে। যার মধ্যে নভেম্বরেই ভর্তি হয়েছে ২৮ হাজার ৬২৩ জন। অক্টোবরে ভর্তি হয় ৩০ হাজার ৮৭৯ জন। আক্রান্তের হিসাবে অক্টোবর থেকে পিছিয়ে থাকলেও রেকর্ড মৃত্যু হয়েছে নভেম্বরে। মাস শেষ হওয়ার আগেই এ মাসের ২৯ দিনে ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবরে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৩৫। চলতি বছর এ রোগে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮৫ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে তিনজনই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চিকিৎসাধীন ছিল। তাদের মধ্যে একজন পুরুষ ও দুজন নারী।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় গত বছর। তখন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। আর মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট রোগী ভর্তি হয়েছে ৯০ হাজার ৭৯৪ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩৫৪ জন। যাদের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশেনেই ভর্তি ১৭৬ জন, অর্থাৎ ৫০ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৬ জন, রাজশাহীতে ৪১, চট্টগ্রামে ৩৮, খুলনায় ২৫, ময়মনসিংহ ২২, রংপুরে একজন।
আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর মৃত্যুহার বেশি। আক্রান্তের দিক থেকে ৬৩ শতাংশ পুরুষ, ৩৭ শতাংশ নারী। মৃত্যুর দিক থেকে নারীর হার ৫২ শতাংশ, পুরুষের ৪৮ শতাংশ।
বেশি আক্রান্ত ঢাকা উত্তরে, মৃত্যু দক্ষিণে
আক্রান্তের দিক থেকে এগিয়ে আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এ বছর ডিএনসিসিতে মোট রোগী ভর্তি হয়েছে ১৯ হাজার ২৬২ জন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৯৮৮ জন। ডিএনসিসিতে মোট মৃত্যু হয়েছে ৮৯ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ডিএসসিসিতে, ২০৫ জন। যা মোট মৃত্যুর ৪২ শতাংশ ও ঢাকা উত্তরে ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৬০ শতাংশ মৃত্যুই হয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়।
চাপ বেশি সরকারি হাসপাতালে, তথ্যেও ঘাটতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত যে তথ্য পাঠায়, সেটা রাজধানীর ১৮টি সরকারি ও ৫৯টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট হাসপাতালের। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানও থাকে। এর বাইরে সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসা হলেও সেসব তথ্য সরকারের পরিসংখ্যানে থাকে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই ভিড় করে ঢাকার ১৮টি সরকারি হাসপাতালে।
এখন পর্যন্ত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে মোট ভর্তি রোগী ৩৬ হাজার ৩২৮ জন। এর মধ্যে ২২ হাজার ৫৭৬ জনই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি, যা ঢাকায় মোট ভর্তি রোগীর ৬২ শতাংশ। এই হাসপাতালগুলোতে মোট ৩০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২২৮ জনই সরকারি হাসপাতালে। বর্তমানে ১ হাজার ২৫৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছে, যার মধ্যে ৭১৯ জন সরকারি হাসপাতালে।
ডেঙ্গুতে ৭০ শতাংশই ডেন-২ ধরন
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এক মাস ধরে ডেঙ্গুর সেরোটাইপ নিয়ে গবেষণা করছে। এতে দেখা যায়, এবারও ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে ‘ডেন-২’ বেশি। আইইডিসিআর ডেঙ্গু পজিটিভ ৪০ জনের নমুনা বিশ্লেষণ করে ৬৯ দশমিক ২০ শতাংশের শরীরে ডেন-২-এর উপস্থিতি দেখতে পায়। ২০ দশমিক ৫০ শতাংশের শরীরে পাওয়া যায় ডেন-৩ এবং ১০ দশমিক ৩০ শতাংশের শরীরে ডেন-৪। বিশ্লেষণে ডেন-১ আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও সংস্থাটির পরামর্শক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এখন অধিকাংশ রোগীই ডেন-২ ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে। ডেন-১ ধরনে একবার আক্রান্ত হলে ওই ব্যক্তি আর কখনও একই ধরনে আক্রান্ত হবে না। তার শরীরে ওই ধরনে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যায়। ফলে যারা আবার আক্রান্ত হচ্ছে তারা ডেন-২ ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার একেবারা যারা প্রথমবারের মতো আক্রান্ত হচ্ছে তাদের মধ্যেও এই ধরনটি দেখা যায়। একজন ব্যক্তির মোট চারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একাধিকবার আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় কারণ। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পর এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে। আশা করা যায়, ডিসেম্বরের শেষের দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমে আসবে।