প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ০০:৫৯ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৪ ১০:৪৫ এএম
আফ্রিকার কঙ্গো, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, উগান্ডা, কেনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে সংক্রামক রোগ মাঙ্কিপক্স। এ অবস্থায় বাংলাদেশেও এটি নিয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ রোগে মৃত্যুর হার কম হলেও আক্রান্তদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এর জন্য শুরু থেকেই সতর্ক থাকা দরকার। গত ১৬ আগস্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মাঙ্কিপক্স নিয়ে বৈশ্বিক সতর্কতা জারি করেছে।
মাঙ্কিপক্স কী
মাঙ্কিপক্স একটি ভাইরাসবাহিত রোগ, অনেকটা জলবসন্তের ভাইরাসের মতো। তবে এর ক্ষতিকারক প্রভাব কম। রোগের প্রাথমিক উপসর্গ হচ্ছে জ্বর, মাথাব্যথা, হাড়ের জয়েন্ট এবং মাংসপেশিতে ব্যথা এবং দেহে অবসাদ। জ্বর শুরু হওয়ার পর দেহে গুটি দেখা দেয়। এসব গুটি শুরুতে দেখা দেয় মুখে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে হাত এবং পায়ের পাতাসহ দেহের সব জায়গায়। এই গুটির জন্য শরীরে খুব চুলকানি হয়। পরে গুটি থেকে ক্ষত দেখা দেয়। গুটি বসন্তের মতোই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেও এসব ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়।
কীভাবে ছড়ায় মাঙ্কিপক্স
মাঙ্কিপক্স সংক্রমিত রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস ছড়ায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে, ত্বকের ক্ষত থেকে এবং নাক, মুখ ও চোখের ভেতর দিয়ে এই ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে। তা ছাড়া বানর, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, এমনকি মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত বিছানাপত্র থেকেও এই ভাইরাস অন্যকে সংক্রমিত করতে পারে। অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তিই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। এই ভাইরাসটি গুটি বসন্ত রোগের ভাইরাসের মতো একই গোত্রভুক্ত। তবে কম মারাত্মক। তা ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি ডিএনএ জাতীয় ভাইরাস এবং কোভিড বা ফ্লুর মতো সহজে বা দ্রুতগতিতে এর রূপান্তর ঘটে না।
২০২২ সালের মে মাসে রোগটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে যৌন কার্যকলাপকে উল্লেখ করেছিলেন। তারা দাবি করেছিলেন, এ রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই পুরুষ এবং তাদের ৯৭ শতাংশ সমকামী।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
রোগটির প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইমেরিটাস অধ্যাপক ডাক্তার এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, মাঙ্কিপক্স মূলত আফ্রিকা মহাদেশের রোগ। যেহেতু বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষ যাতায়াত করে। আবার আমাদের অনেক লোক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করে। তারা দেশে আসে। এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ। এই যাতায়াতের কারণে রোগটি ছড়িয়ে যেতে পারে। এতে করে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তো আছেই। সেজন্য বিমানবন্দরে যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে, তা ঠিক আছে। বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে কেউ দেশে এলে তার দেহ ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। দেহে কোনো ধরনের ফুসকুড়ি আছে কি না দেখতে হবে। কারও দেহে ফুসকুড়ির মতো কিছু দেখলে তাকে আমাদের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। পাকিস্তান, ভারতসহ এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। যদিও এটি খুব সিরিয়াস নয়, তবে আক্রান্ত হলে খুব ভোগায়। রোগটি দুই ধরনের। টাইপ ওয়ান প্রাণঘাতী ও টাইপ টু প্রাণঘাতী নয়। তবে দুটিই খুব দ্রুত সংক্রমণশীল।
দেশে এ রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা করা যাবে, সেটা কঠিন কিছু না। তবে কোনোভাবেই যাতে রোগটি ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য সতর্কতা দরকার। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এর চিকিৎসা নেই। তবে যেসব টিকা দেওয়া হয় তা লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়। আমাদের প্রতিকারের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে তার পরিবারের ক্ষতি, আর্থিক ক্ষতি। এসব ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা সবার জন্যই কষ্টকর।
ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) অন্যতম উপদেষ্টা ডাক্তার মুশতাক হোসেন বলেন, মাঙ্কিপক্সের যে ধরনটি এখন ছড়িয়ে পড়ছে তাকে টাইপ বি বলা হয়। এ রোগে মৃত্যুর হার কম। এটি এমনি এমনিই সেরে যেতে পারে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হবে। সেজন্য এটি উদ্বেগজনক। তাই যাদের দেহে এ রোগের কোনো চিহ্ন দেখা যাবে তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে। সেটা সম্ভব না হলে হটলাইনে যোগাযোগ করে চিকিৎসা নেবে।
বেনাপোল ইমিগ্রেশনে সতর্কতা জারি
বেনাপোল প্রতিবেদক জানান, মাঙ্কিপক্স ভাইরাস নিয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বেনাপোল ইমিগ্রেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যবোঝাই ট্রাকের চালক-হেলপারদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না। গতকাল ইমিগ্রেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. মরিয়ম বেগম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
হিলি (দিনাজপুর) প্রতিবেদক জানান, মাঙ্কিপক্স ভাইরাস নিয়ে দিনাজপুরের হিলি আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে এখনও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতিদিন এই বন্দরের চেকপোস্ট ব্যবহার কয়েকশ যাত্রী যাতায়াত করেন। হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ আশরাফুল জানান, এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। নির্দেশ এলে দ্রুত সময়ে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
মাঙ্কিপক্স : প্রথম শনাক্ত হয় বানরের দেহে
১৯৫৮ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে একটি পরীক্ষাগারে বানরের দেহে প্রথম মাঙ্কিপক্স শনাক্ত হয়েছিল। ১৯৭০ সালে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে মানুষের দেহে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়। ২০২২ সালে মাঙ্কিপক্স আফ্রিকার বাইরে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হয়। ওই বছরের মে মাসে যুক্তরাজ্যেও এর প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। পরে তা ইউরোপের অন্যান্য দেশ, উত্তর আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়াতে সংক্রমিত হয়। চলতি মাসের ১৬ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাঙ্কিপক্স নিয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। গত ১৭ আগস্ট শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ রোগের বিষয়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।