ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ০৮:৪৮ এএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪ ০৮:৫২ এএম
বর্ষার শুরুতেই দেশে আবার ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি। টানা বৃষ্টির সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিবছরই দেখা যায়, তাপপ্রবাহে মশার প্রজনন কমে, আবার বৃষ্টিপাত হলেই মশা বাড়তে শুরু করে। বাংলাদেশে সাধারণত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর- এই কয়েক মাস ডেঙ্গুর জন্য উচ্চ ঝুঁকি বিরাজ করে। এ সময়টায় যথেষ্ট পরিমাণ বৃষ্টি হয় এবং মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা থাকে। তাই এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামী মাসের ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৯ জনের। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ২২ জন, অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। গত বছর প্রথম তিন মাসে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ছিল ৮৪৩ জন। এবার ১ হাজার ৭০৫ জন।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৬ জন। এর মধ্যে বরিশালে ৪ জন, ঢাকা জেলায় ৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকার বাসিন্দা ১৫ জন। তবে এই ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। এই সময়ে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ও নারী উভয়ের হার ৫০ শতাংশ।
এ মাসের শেষের দিকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা
চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ অন্যান্য বছরের তুলনায় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, এ বছর ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, বরিশাল, বরগুনা ও মাদারীপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেশি দেখা যাবে। মশার ঘনত্বের ওপর ডেঙ্গুর প্রকোপ নির্ভর করে। কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্ব দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি জেলায় কাজ করে আমরা এডিসের ঘনত্ব গতবারের চেয়ে বেশি পেয়েছি। জেলাগুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, বরিশাল, বরগুনা, গাজীপুর ও ঢাকা।
অধ্যাপক কবিরুল বাশার আরও বলেন, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল গত বছরের তুলনায়। এখন আবার সেটি কমে আসছে, যা গত বছরের তুলনায় কম। তবে সামনে সেটা আবার বাড়তে পারে। যখন বৃষ্টি হবেÑ এডিস মশার ঘনত্ব তখন বাড়তে থাকবে। বিশেষ করে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে এডিস মশা বাড়ে। এখন ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে প্রকোপটা বেশি। গত বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার দ্বিগুণেরও বেশি। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। ধারণা করি, এডিস মশার ঘনত্ব দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আর যদি রোগীর সংখ্যা বিবেচনা করি, ২০২৩ সালের তুলনায় এ বছরের মার্চে মাসে দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। ফলে আমরা যে তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছি তাতে ডেঙ্গু এবার অনেক প্রকট হবে। তবে মার্চের পর আবার তা কমতেও শুরু করেছে। আবার চলতি মাসের শেষের দিকে বাড়তে পারে।
ডেঙ্গু এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী। তিনি বলেন, এ বছর বর্ষা দেরিতে শুরু হয়েছে, তাই ডেঙ্গুও দেরিতে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা চিকনগুনিয়ার কয়েকজন রোগী পেয়েছি। এ বছরের শুরুর দিকে ডেঙ্গুর মাত্রা বেশি ছিল, যা এক গবেষণায় দেখা গেছে। তখন এডিস মশার ঘনত্ব বেশি ছিল।
পুরুষ বেশি আক্রান্ত হলেও নারীদের মৃত্যুহার বেশি
এদিকে প্রথম তিন মাসে পুরুষরা বেশি সংখ্যায় আক্রান্ত হলেও সম্প্রতি নারীর আক্রান্তের হার বাড়তে শুরু করেছে। তবে ডেঙ্গুতে পুরুষের চেয়ে নারীর মৃত্যুহার বেশি। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানে নারী ছিল ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে আক্রান্ত হয়ে পুরুষের তুলনায় নারীর মৃত্যু ১৩ শতাংশ বেশি। পুরুষের মৃত্যুহার ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। নারীর ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, পুরুষদের একটা অংশই বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকে। অফিস, আদালত থেকে শুরু করে বাইরে বিভিন্ন জায়গা থেকে মশার কামড়ে আক্রান্ত হয় বেশি। তবে নারীদের একটা অংশ বাসার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে থাকে, তাই তাদের আক্রান্তের হার কম। কিন্তু তাদের মৃত্যু বেশি হওয়ার প্রধান কারণ আমাদের দেশের নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তারা বেশিরভাগ সময় রোগ পুষে রাখে। বেশিরভাগেরই রক্তস্বল্পতা, ভিটামিন-ডি ডেফিসিয়েন্সি থাকে। তাই তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ঢাকার ভেতরে ডেঙ্গু রোগী যে বাসায় আছে, তার ২০০ মিটারের পরিধির মধ্যে সতর্কতা তৈরি করতে হবে। সেই রোগীদের মাধ্যমে যেন অন্য কারও মধ্যে রোগ না ছড়ায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। এই উদ্যোগটা নিতে হবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে। এছাড়া ঢাকার বাইরে জেলা প্রশাসকরা উদ্যোগ নিয়ে প্রত্যেকটি ইউনিয়নের একজনকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে হাতে-কলমে শেখাতে হবে।
তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনগণকেও সচেতন হতে হবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, জনগণকে নিজ নিজ বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। কোথাও পানি জমে থাকলে সেটা পরিষ্কার করতে হবে।
এ বিষয়ে ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমাদের দুই সিটি করপোরেশন ওষুধ দিচ্ছে মশা মারতে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। আগে থেকেই সচেতন না হলে এবার ধাক্কা সামলানো কঠিন হবে।
স্যালাইন সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি
২০২৩ সালে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন। গত বছর জুলাই-আগস্টের দিকে হঠাৎ ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন স্যালাইনের দামও বেড়ে যায়। চলতি বছরে সেরকম পরিস্থিতি যাতে না হয়, সেজন্য গত ৩১ মার্চ বৈঠক করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। মার্চ থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর মৌসুম ধরা হয়। এ সময়ে সারা দেশে প্রতি মাসে স্যালাইনের চাহিদা থাকে প্রায় ৫০ লাখ লিটার। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকে। ওই সময়ে এ ধরনের স্যালাইনের মাসিক চাহিদা থাকে প্রায় ৩০ লাখ লিটার।
গতে এপ্রিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে পর্যাপ্ত পরিমাণে স্যালাইন ও ওষুধ সংরক্ষণের কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবার স্যালাইনের অভাব হবে না। পাশাপাশি কেউ যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। তবে চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের ঘাটতি যেন না থাকে তা নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনই প্রতি বছর মশা মারতে তাদের বাজেট বাড়াচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। দুই সিটির চলতি অর্থবছরে মশা মারার বাজেট ১৫২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে উত্তরের ১২১ কোটি ৮৪ লাখ আর দক্ষিণের ৩১ কোটি ১ লাখ টাকা। গত ১২ বছরে ঢাকার মশা মারার আয়োজনে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই বাজেটের টাকা মশা নিবারণের নানা যন্ত্রপাতি, কীটনাশকসহ আরও অনেক কাজে ব্যয় হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০টি অঞ্চলের ৭৫টি ওয়ার্ডে মশা নিধনে ১৫০ জন মশক সুপারভাইজারসহ ১ হাজার ৫০ জন কাজ করছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০টি অঞ্চলে মোট ৫৪টি ওয়ার্ডে ৭৫ জন মশক সুপারভাইজারসহ প্রায় ৬০০ জন কাজ করছেন।