কাওছার আহমদ, সিলেট
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ২১:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ২১:৪৯ পিএম
প্রতীকী ছবি
জন্ম থেকে কানে শুনতে পেত না ছয় বছরের আদ্রিকা রায় কথা। নাম ‘কথা’ হলেও জন্মগত কারণে কথা বলার শক্তিও যে ছিল না মায়ায় জড়ানো ছোট্র সোনামনিটির। নিভু নিভু আশা নিয়ে একদিন কথাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান মা। সেখানকার চিকিৎসায় এখন কথা ফুটেছে ফুটফুটে ‘কথা’র মুখে। শুনতে পাচ্ছে জন্মের পর কখনও না শোনা এই পৃথিবীর কথাও।
শুধু কথাই নয়, তার মতো অন্যসব জন্মগত শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধীদের আশার আলো জাগিয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অত্র হাসপাতালের কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে জন্মগত বধির এমন অনেকে শ্রবণশক্তি ফিরে পেয়েছেন। আগে তারা একবারেই কানে শুনতে পেতেন না। এখন সকলেই কানে শুনছেন এবং কথা বলতে পারছেন। সে জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে এই হাসপাতালে ছুটে আসছেন রোগীরা। এ ধরনের জন্মগত সমস্যাজনিত আরও ৪২ জনের আবেদন জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘কথা’ই প্রথম, মোট ৬২
হাসপাতাল সূত্র জানায়, কক্লিয়ার ইমপ্লান্ট কার্যক্রমে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগ শতভাগ সাফল্য অর্জন করেছে। সরকারি অর্থায়নে ২০২২ সালের ১৫ মে সর্বপ্রথম অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আদ্রিকা রায় কথার কানে স্থাপন করা হয় কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট। সফলভাবে চিকিৎসার পর শিশুটি শ্রবণশক্তি ফিরে পায়। এরপর এ পর্যন্ত সফলভাবে ৬২ জনকে সার্জারি করে দেওয়া হয়েছে অত্যাধুনিক এই ডিভাইস। এর মধ্যে পুরুষ ৩২ জন ও ৩০ জন হলেন নারী। তাদের মধ্যে তিনজন বয়স্ক রোগীও আছেন। বর্তমানে আরও ৪২ জন রোগীর আবেদন জমা পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সার্জারি প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। অভিজ্ঞ লোকবলের অভাবের কক্লিয়ার সার্জারি অনেক স্থানে করা সম্ভব না হলেও সিলেটের এই প্রধান হাসপাতালে ৬ জন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তা সম্ভব হয়েছে। সে জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নিতে এই হাসপাতালে ছুটে আসছেন রোগীরা। কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট সার্জারি করা সকলেই কানে শুনছেন এবং কথাও বলতে পারছেন।
‘কথা’র গল্প
কথা হয় হাসপাতালে সর্বপ্রথম এই চিকিৎসা নেওয়া ছয় বছরের আদ্রিকা রায় কথার সঙ্গে। মা-বাবার নাম জানতেই এক গাল হেসে হেসে বলল- মায়ের নাম সঞ্চিতা রায় ও বাবা বিপ্লব রায় লিটন। এরপর শোনাল বাংলা ও ইংরেজি কয়েকটি ছড়াও।
অনুভূতি জানাতে গিয়ে আদ্রিকার কথার মা সঞ্চিতা রায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাদের বাসা নগরীর দাঁড়িয়া পাড়ায়। দুই বছর আগে একটি স্থানীয় পত্রিকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানতে পারেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জন্মগত শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধীদের চিকিৎসার কথা। তখন তার মেয়ের বয়স ছিল চার বছর। প্রিয় মেয়ে কথাকে নিয়ে ছুটে যান হাসপাতালে। চিকিৎসকদের কথায় তার বুকে আশা জাগে। এরপর ২০২২ সালের ১৫ মে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আদ্রিকা রায় কথার কানে স্থাপন করা হয় কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট।
কথার মতো চিকিৎসা নিয়ে জীবনের নতুন স্বাদ পেয়েছেন ২৭ বছরের টগবগে যুবক আজাদ মিয়াও। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ঘিলাছড়ায় তার বাড়ি। হাসপাতালের নাক কান গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. নূরুল হুদা নাঈমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিয়ে এখন স্বাভাবিক কথা বলতে পারেন ও শুনতেও পান তিনি।
বিনামূল্যে সেবা
সার্জারির পরে যে ডিভাইসটি কানের মধ্যে স্থাপন করে দেওয়া হয় অত্যাধুনিক এই যন্ত্রের দাম সাত থেকে সাতাশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই ডিভাইসের অর্থায়ন করছে সরকারের সমাজসেবা অধিদফতর। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক কান গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগ বাকি কার্যক্রম সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করে যাচ্ছে। কেবল সিলেট বিভাগ নয়; ঝিনাইদহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াহ বিভিন্ন জেলার শিশুরাও এই সেন্টার থেকে সেবা পাচ্ছে।
যেসব শিশু জন্ম থেকেইন শ্রবণশক্তি নেই, তাদেরকে পাঁচ বছর বয়সের আগেই এখানে নিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট কার্যক্রম কর্মসূচি পরিচালক ও হাসপাতালের নাক কান গলা ও হেড-নেক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. নূরুল হুদা নাঈম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, পাঁচ বছরের আগে এটি করা হলে তুলনামূলক ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। জন্মগতভাবে যেসব শিশু বধির তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ কানে শোনার যন্ত্র স্থাপন করা হয়। এই যন্ত্রটি নিয়ে মানুষ সাঁতার কাঁটতে পারে, যন্ত্রটির কোনো সমস্যা হয় না। যন্ত্রটি ব্যয়বহুল হওয়ায় সবাই ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু সরকার এটি একেবারে বিনামূল্যে দিচ্ছে।
কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট কার্যক্রমের কর্মসূচি নিয়ে গত ১২ জুন হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলন করে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রাজধানীর বাইরে কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট সার্জারিতে সিলেট ওসমানী হাসপাতাল সুনাম অর্জন করেছে। হাসপাতালের মোট ছয়টি বিভাগের চিকিৎসকগণও এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। রোগীর ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার টেস্ট করা হয় একেবারে ফ্রি। সার্জারির পর বিনামূল্যে কেবিন দেওয়া হয়, যাতে করে সার্জারি করা শিশু বা রোগীর কোনো ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত না হয়। এসময় সরকারের এই সেবা গ্রহণ করতে ‘কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট’ কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে সকলের প্রতি আহ্বান পরিচালক।
এদিকে, চলতি বছর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই কক্লিয়ার ইমপ্ল্যান্ট সার্জারির জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।