প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২২ ১৮:৫৯ পিএম
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২ ২০:১০ পিএম
‘আমি আমার ছেলের জন্য ব্যাগ কিনতে একটি দোকানে গিয়েছিলাম। আমি একটি নোট দেওয়ার পর তারা আমাকে বাকি অর্থ ফেরত দেয়নি। তারা ধরেই নিয়েছে, আমাকে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।’
লটারি জেতার পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যের অনুপ বি। দুই মাস আগে তিনি একটি সরকারি লটারি জেতেন। ৩২ বছর বয়সি অনুপ বলেছেন, তার জীবনের এমন পরিবর্তন হয়েছে, যা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। হঠাৎ করে একসঙ্গে অনেক টাকা পাওয়ার আনন্দ ধীরে ধীরে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে রূপ নিয়েছে।
অনুপ বলেন, বাইরে বের হলেই সবাই তাকে ঘিরে ধরে। লটারি জেতার পর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব থেকে শুরু যাদের সঙ্গেই দেখা হয়েছে, সবাই তার কাছে টাকা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক লোক একসময় যারা আমাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারা এখন আমাদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।’
অনুপ দুই মাস আগে সেপ্টেম্বরে সরকারি একটি লটারিতে ২৫ কোটি রুপি জেতেন, যা একটি লটারিতে সর্বোচ্চ পুরস্কার। ভারতের অনেক রাজ্যে লটারি বেআইনি। তবে কেরালাসহ কয়েকটি রাজ্যে কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে লটারি চালু রয়েছে। লটারি পাওয়ার পর অনুপ সংবাদমাধ্যমগুলোতে শিরোনাম হন।
তবে কয়েক দিন পর অনুপ আবারও ভাইরাল হন। এবার তিনি ভাইরাল হন একটি ভিডিওর জন্য। ওই ভিডিওতে অনুপকে বলতে দেখা যায়, টাকার জন্য তিনি ও তার পরিবারকে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকার জন্য মানুষের প্রতি অনুরোধ করছেন।
চলতি সপ্তাহে বিবিসি অনুপের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, নতুন করে সংবাদ হলে তিনি আবারও মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবেন। সেটা তিনি চান না। পরে তিনি তার ছবি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
অনুপ বলেন, ‘আমি মনে করি আপনি যদি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়ে থাকেন, তবেই আপনি আমার এ পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন। এটি একটি সিনেমার গল্পের মতো। হঠাৎ আপনি আপনার পরিচিত সবাইকে আপনার বাড়িতে ভিড় করতে দেখবেন।’
কেরালার তিরুবনন্তপুরম জেলার বাসিন্দা অনুপ আগে পেশায় বাবুর্চি ছিলেন। পেশা পরিবর্তন করে পরে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লটারির টিকিট কিনে আসছিলেন। এর আগেও তিনি লটারিতে অল্প অঙ্কের অর্থ জিতেছিলেন। কিন্তু এবার লটারিতে বড় অঙ্কের অর্থ জেতার পর তার জীবন এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে তাকে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘লটারি জেতার পর আমার প্রতি মানুষের মনোভাব রাতারাতি পরিবর্তিত হয়েছে।’
লটারি জেতার ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পর তার বাড়ির আশপাশের কয়েকশ লোক সাহায্য চান। অনুপ বলেন, ‘ভোরে আমরা বাড়ির বাইরে ভিড় দেখে জেগে উঠতাম। ভোর ৫টা থেকে মানুষ আসা শুরু হতো এবং তারা গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে থাকত।’
অনুপের স্ত্রী মায়া বলেন, মানুষ অযৌক্তিক অঙ্কের সাহায্যের দাবি জানাতে থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থান থেকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ আসতে থাকে। কেউ কেউ তাদের বন্ধকি বা ঋণ পরিশোধের জন্য সাহায্য চান। কেউ কেউ তাদের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য সাহায্য চান।
অনুপ বলেন, এমনকি ব্যাংক-বীমা থেকেও অনেক ফোন আসে। চেন্নাই থেকে আসা একটি দল একটি চলচ্চিত্রে অর্থায়ন করার অনুরোধ নিয়ে আসে।’
আসলেই সাহায্যের প্রয়োজন, এ ধরনের লোকদের অনুরোধের পাশাপাশি এমন লোকও তাদের বাড়িতে আসে, যাদের মানসিকতা এমন ছিল যে, এই অর্থে তাদের অধিকার রয়েছে। অনেকে শৌখিন পণ্য কিনে দেওয়ার দাবি নিয়ে আসেন। অনুপ বলেন, একজন লোক সারা দিন আমাদের বাড়িতে বসে আমার কাছে একটা রয়্যাল এনফিল্ড মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘সবাই মনে করে যে, আমি এই টাকা বিনামূল্যে পেয়েছি। তাই কেন আমি তাদের কিছু দিচ্ছি না, সে বিষয়ে অনুযোগ করতে থাকে।’
এ লটারি জেতা সংক্রান্তে অনলাইনে ছড়ানো নানা রকমের গুজবও এ দম্পতির শান্তি নষ্ট করে। অনুপ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধমের পোস্টে এমন কথাও বলা হয় যে, আমি লটারি জেতার বিষয়ে মিথ্যা বলেছি। আমার কাছে আগে থেকেই প্রচুর অর্থ ছিল। আমার লটারি জেতার বিষয়টি প্রতারণামূলক।’
অনুপ জানান, তিনি এখনও জনসমক্ষে যেতে ভয় পান। তিনি বলেন, ‘আমি যখনই বাইরে বের হই, মানুষ আমাকে চিনতে পারে। কারণ আমাকে নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল।’
অনুপের স্ত্রী এখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনুপ তার ছোট ছেলের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত। তবে তার এ অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়, এটাই তাকে কিছুটা সান্ত্বনা দেয়।
গত মাসে স্থানীয় টিভি চ্যানেলের একটি গেম শোতে অনুপ ৫৯ বছর বয়সি জয়পালনের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জয়পালন গত বছর একই লটারি জিতেছিলেন। অনুপ যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, জয়পালনের সঙ্গে কথা বলে অনুপ জানতে পারেন, জয়পালনও একই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছেন।
ওই অনুষ্ঠানে জয়পালন বলেন, ‘কার আসলেই সাহায্যের প্রয়োজন এবং কে খামাখাই টাকা চাইতে এসেছেন, তা বলা কঠিন হয়ে পড়েছিল। অনেক বন্ধুও শত্রু হয়ে যায়। অনেকে এখনও মন খারাপ করে রয়েছে আমি টাকা দিইনি বলে।’ অনুপ বলেন, জয়পালন আমাকে টাকার ব্যাপারে খুব সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।’
অনুপ বলেন, ‘লোকেরা মনে করে লটারি জেতার কারণে টাকা নিয়ে আমার সব উদ্বেগ দূর হয়ে গেছে। কিন্তু সবকিছু এখনও অনিশ্চিত। আমি জানি না ট্যাক্স দেওয়ার পর আমার কাছে কতটুকু থাকবে।’