হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:২২ এএম
নতুন রূপে সাজছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পাঠাগার নর্থব্রূক হল লাইব্রেরি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলা সদরে অবিস্থত ‘একুশ স্মৃতি পাঠাগার’। এই পাঠাগারটি প্রায় এক যুগ ধরে বই পড়া কার্যক্রম, পাঠক সৃষ্টি, মাসিক আলোচনাসহ শিশুদের আর্ট শেখা, আবৃত্তি শেখা ও সামাজিক অনেক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। দুর্বৃত্তদের হামলা ও আগুনে পাঠাগারটির সমস্ত বইপুস্তক, আসবাবপত্র পুড়ে যাওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেটি সচল হয়নি। সরকারও কোনো উদ্যোগ নেয়নি এটি চালুর।
একুশ স্মৃতি পাঠাগারের সভাপতি শেখ আবুল হোসেন সিলন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তরা পাঠাগারটিতে হামলা করে সমস্ত বইপুস্তক, আসবাবপত্র পুড়িয়ে দেয়। সেই থেকে রক্তদান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিয়জিত সেবা কেন্দ্র ‘স্পন্দন’ পরিচালিত এই পাঠাগারটির সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ আছে। আমাদের আপাতত চালু করার পরিস্থিতি নেই। এখন পর্যন্ত পাঠাগার চালু করার বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট মহলের কোনো সহযোগিতা পাইনি।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো কুমিল্লার বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তনে। এতে ১৩৯ বছর বয়সী এই পাঠাগারে সংরক্ষিত প্রায় দুশ বছরের পুরনো বই, পুঁথি লুট হয়ে যায়। বহু দুষ্প্রাপ্য বইয়ে ভরপুর ২৫ হাজারেরও বেশি বই-সমৃদ্ধ এই গণপাঠাগারটির অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে পড়েছে। হুমকির মুখেÑ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ফেনীর পরশুরাম থানার বিলোনিয়া গ্রামের ‘ভাটিয়াল মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পাঠাগার’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে অবস্থিত ‘সত্যেন বোস পাঠাগার’, নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের কাজলা গ্রামের ‘শাহেদা স্মৃতি পাঠাগার’সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক পাঠাগার। Ñএমনই বাস্তবতার মধ্যে আজ সারা দেশে একযোগে উদযাপিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ২০২৬’।
‘জ্ঞানেই মুক্তি, আগামীর ভিত্তি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জনগণকে গ্রন্থাগারমুখী করা, পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি, মননশীল সমাজ গঠনের কেন্দ্রবিন্দু ও জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে লাইব্রেরির ভূমিকাকে দৃঢ় করা প্রত্যয়ে প্রতিবছরের এবারও এ দিবসটি উদ্যাপন করতে জাতীয় পর্যায়ে বর্ণিল কর্মসূচির পাশাপাশি জেলা-উপজেলার সরকারি গণগ্রন্থাগারসমূহে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রাজধানীর শাহবাগের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গনে জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘গ্রন্থাগার ও জ্ঞানচর্চা : একুশ শতকের প্রেক্ষাপট’ বিষয়ে এবং গ্রন্থাগার দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্বের ওপর এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। মূল আলোচক থাকবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোস্তাক গাউসুল হক। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মফিদুর রহমান। উপস্থিত থাকবেন গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মনীষ চাকমাসহ অন্যরা।
দিবসটি উপলক্ষে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ গ্রন্থাগার সমিতি, বাংলাদেশ গ্রন্থাগারিক ও তথ্যায়নবিদ সমিতি, বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সমিতি, বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি পেশাজীবী, ব্র্যাকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একযোগে দিবসটি পালন করবে। ঢাকার বাইরে সকল জেলায় স্থানীয় জেলা প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংগঠন নিজ নিজ কর্মসূচি অনুযায়ী দিবসটি উদ্যাপন করবে।
এবারের এ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাঠাগারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সভাপতি আবদুস ছাত্তার খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দুঃখের বিষয় হলো আমাদের দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন পাঠাগারের ওপর হামলা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো গত ১৮ মাসে সরকার এই পাঠাগারগুলোর পাশে দাঁড়ায়নি। কোনো প্রতিকার না হওয়ায় অনেক সংগঠক তাদের কার্যক্রম সংকুচিত করেছে। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবসে আমাদের দাবি ক্ষতিগ্রস্ত পাঠাগারের পাশে রাষ্ট্র তার সহযোগিতার হাত বাড়াক।
তিনি জানান, এমনই বেদনা-দুঃখের মধ্যেও এবারের এ জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে সেমিনার, সাহিত্যপাঠ ও মিনি বইমেলার আয়োজন করেছে সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলন। প্রকাশনা সংস্থা ‘প্রকৃতি’র সহযোগিতায় আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে এই আয়োজন শুরু হবে। এতে ‘গ্রামে গ্রামে কেন পাঠাগার প্রয়োজন’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করবেন কবি, প্রাবন্ধিক ও প্রকাশক সৈকত হাবিব। আয়োজনে প্রধান অতিথি থাকবেন কথাসাহিত্যিক ও মনোশিক্ষাবিদ মোহিত কামাল। সম্মানিত অতিথি থাকবেনÑ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সাখাওয়াত টিপু কবি, লেখক ও এনার্জি সিস্টেম স্পেশালিস্ট ড. মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাসেল।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে সেখানে অবস্থিত শহীদ রুমী স্মৃতি পাঠাগারের প্রায় ছয় হাজার বই ও আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পাঠাগারে কয়েকজন সদস্য ও কড়াইলের বাসিন্দা আক্ষেপ করে জানান, ‘আগুনে শহীদ রুমী স্মৃতি পাঠাগার’ পুড়ে গেছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের সভায় বৈঠকে ৫ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস পালন করা হয়।