প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৮:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আইসল্যান্ডের উত্তর উপকূল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গ্রিমসে নামের এই ছোট্ট দ্বীপ ইউরোপের অন্যতম প্রত্যন্ত বসতি। এটা সামুদ্রিক পাখির সমৃদ্ধ আবাসস্থলও বটে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এই দ্বীপে হাতে গোনা মানুষের বাস। বাসিন্দাদের সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে যায় গ্রিমসের সামুদ্রিক পাখির সংখ্যা। এখানে হাসপাতাল নেই, পুলিশ স্টেশনও নেই। তিন সপ্তাহে একবার ডাক্তার আসেন বিমানে চেপে।
দ্বীপটি ৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার দীর্ঘ। গ্রিমসে কিন্তু দেশের উত্তরের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এমন একটি দ্বীপ যেখানে জনবসতি রয়েছে। এটি আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে অবস্থিত আইসল্যান্ডের একমাত্র অংশও বটে। বলতে গেলে অনেক দিক থেকেই এই হিমশীতল দূরবর্তী দ্বীপ ‘অধরা’ এবং চরম পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু এটাই বোধহয় এই দ্বীপকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়ও করে তোলে।
গ্রিমসেতে পৌঁছানোর জন্য ১৯৩১ সাল পর্যন্ত একমাত্র উপায় ছিল একটা ছোট নৌকায় সফর করা, যা বছরে দুবার ওই দ্বীপে চিঠি সরবরাহ করত। বর্তমানে আকুরেইরি শহর থেকে ২০ মিনিটের বিমানযাত্রা এবং ডালভিক (আইসল্যান্ডের পৌরসভার অন্তর্গত গ্রাম) থেকে তিন ঘণ্টা ফেরি সফর করে এই দূরবর্তী বন্ধুর দ্বীপে পৌঁছানো যায়। ইউরোপের সবচেয়ে দুর্গম জনবসতি, সামুদ্রিক পাখি আর বন্য প্রাণীর বৈচিত্র্যে ঘেরা এই দ্বীপ।
আর্কটিক টার্ন এবং সমৃদ্ধ জনসংখ্যাযুক্ত পাফিনের মতো পাখি ছাড়াও কালো পা-ওয়ালা কিটিওয়েকস (সামুদ্রিক প্রজাতির পাখি), রেজরবিল এবং গিলেমটস (সামুদ্রিক পাখি) অবাধে ঘুরে বেড়ায় গ্রিমসে দ্বীপে। আইসল্যান্ডের ঘোড়া ও ভেড়ার বিচরণও এই দ্বীপে অবাধ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই দ্বীপের বাসিন্দাদের সংখ্যাকে ছাপিয়ে গেছে এখানকার সামুদ্রিক পাখির সংখ্যা, যারা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর গ্রিমসেকেই নিজেদের ঠিকানা করেছে। দ্বীপে বসবাসরত পাখি ও মানুষের অনুপাত ৫০ হাজারের তুলনায় এক।
যদিও আইসল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড ব্যাপকভাবে নির্ভর করে ভূ-তাপীয় এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ওপর। কিন্তু গ্রিমসে এতটাই দূরে অবস্থিত যে এই দ্বীপ জাতীয় পাওয়ার গ্রিডের আওতার বাইরে। পুরো দ্বীপ নির্ভর করে সিঙ্গেল-ডিজেল চালিত একটি জেনারেটরের ওপর।
আইসল্যান্ডের অনেক ছোট শহর ও গ্রামের মতো, গ্রিমসের ইতিহাসেরও খোঁজ মেলে স্থানীয় লোককাহিনীতে। সেই কাহিনী অনুযায়ী, গ্রিমার নামে বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তির নামের সঙ্গে গ্রিমসে দ্বীপের যোগ রয়েছে। গ্রিমার পশ্চিম নরওয়ের সন জেলা থেকে যাত্রা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।
গ্রিমসে দ্বীপের প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০২৪ সালে। ‘হেইমসক্রিংলাÑ এ হিস্ট্রি অব দ্য নর্স কিংস’-এ প্রাচীন আইসল্যান্ডীয় কাহিনীর উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নরওয়ের রাজা ওলাফুর বন্ধুত্বের চিহ্ন হিসেবে গ্রিমসে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয় নেতারা সেই আর্জি প্রত্যাখ্যান করেন। মাছ ও পাখির প্রাচুর্যের কারণে ওই দ্বীপকে মূল্যবান বলে মনে করতেন সেখানকার মানুষ, তাই এই সিদ্ধান্ত।
আঠারো শতকের শেষের দিকে, নিউমোনিয়া ছাড়াও মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ায় গ্রিমসের জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে এবং প্রাকৃতিক বন্দরের অভাবে এখানে অবতরণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
মূল ভূখণ্ড থেকে আসা মৎস্যজীবীদের অবিচ্ছিন্ন স্রোত এবং হোসাভিকের (আইসল্যান্ডের উত্তর উপকূলে অবস্থিত) কাছে বসতি স্থাপনকারী ব্যক্তিদের কারণে এই দ্বীপের বাসিন্দারা টিকে থাকতে পেরেছিলেন।