ওয়ার্ল্ড সায়েন্স এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পিটিশন
ইমদাদুল হক
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৪ ১৪:৪৩ পিএম
আপডেট : ২৬ মে ২০২৪ ১৮:৪৪ পিএম
রোবট উদ্ভাবনের মাধ্যমে একই ক্যাটাগরিতে দুটি স্বর্ণপদক জয় করল বাংলাদেশ
টেকসই প্রযুক্তির রোবট উদ্ভাবনের মাধ্যমে একই ক্যাটাগরিতে দুটি স্বর্ণপদক জয় করল বাংলাদেশ। দেশের সফল রোবোটিক দল টিম অ্যাটলাস এবং দেশের প্রথম নারী রোবোটিক দল কোড ব্ল্যাক একই মঞ্চে ওড়াল লাল-সবুজের পতাকা
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ পঙ্ক্তির বাস্তব প্রতিফলন পুরো বিশ্বকে জানিয়ে দিল আমাদের দেশের তরুণ উদ্ভাবকরা। টেকসই প্রযুক্তির রোবোট উদ্ভাবনের মাধ্যমে একই ক্যাটাগরিতে দুটি স্বর্ণপদক জয় করল বাংলাদেশ। দেশের সফল রোবোটিক দল টিম অ্যাটলাস এবং দেশের প্রথম নারী রোবটিক দল কোড ব্ল্যাক একই মঞ্চে ওড়াল লাল-সবুজের পতাকা।
পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি রেসকিউ রোবট ‘প্রহরী’ নিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইন্দোনেশিয়া জয় করে টিম অ্যাটলাস থেকে সৃষ্টি স্বতন্ত্র নারী দলটি। প্রথম বিদেশ সফরেই তাক লাগিয়ে দিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইসি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের জান্নাতুল ফেরদৌস ফ্যাবিনের দল। এই দৌড়ের অপর সদস্যরা হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান সিনহা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান নওরিন ও সানিয়া ইসলাম সারা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সিএসই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তাহিয়া রহমান।
একই মঞ্চে সৌরশক্তিচালিত স্ব-চালিত জলজ রোবট নিয়ে হাজির হয়েছিলেন টিম অ্যাটলাস দলনেতা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানি জুবায়ের। এই উদ্ভাবনে তার সতীর্থ ছিলেন ঢাকা কলেজের আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, দাউদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র আতিক শাহরিয়ার হাসা এবং নির্ঝর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র মো. মারুফ মিয়া ও মো. আল মাহমুদ আলিফ। সাগরের নীল জলরাশিতেও এই বোটটি যেন পানির ময়লা নিষ্কাশন করতে পারে, সেজন্যই হয়তো নাম দেওয়া হয় ব্লু-বট। দূষণরোধী ও পরিবেশবান্ধব রোবটটি তৈরির সময় আকাশের নীলে মিশে জলাশয়ের পানিও নীলচে দেখায় বলেই হয়তো রঙহীন পথে চলা যানটির গায়েও দেওয়া হয়েছে নীল রঙের প্রলেপ। রঙ যাই হোক না কেন, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড সায়েন্স এনভারনমেন্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিযোগিতায় (ডব্লিউএসইইসি) নীল বট কিংবা কালো দলের প্রহরী রেঙেছে সোনালি দ্যুতিতে। বাংলাদেশের নারী-পুরুষের দুই দল হাতে হাত; কাঁধে কাঁধ রেখে জয় করেছে স্বর্ণপদক।
কম্পিটিশনে বিশ্বের ১৮টি দেশ থেকে মোট ৩১১টি দল অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের ব্ল্যাক ছাড়াও এই ইভেন্টের রসায়ন বিভাগে সিলভার জয় করেছে ইন্দোনেশিয়ারই একটি নারী দল। তবে বিদেশ থেকে অংশ নিয়ে একমাত্র স্বর্ণজয়ী দল বাংলাদেশের কোড ব্ল্যাক।
রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে গড়ে তোলা রিসার্চ ল্যাবেই জন্ম ও বেড়ে উঠেছে রোবট দুটির। এর মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলাসহ নকশি কাঁথার বিভিন্ন ফোড়ের ডিজাইনের মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে রোবট প্রহরীর অবয়বে। রোবট প্রহরী কিন্তু মোটেই আক্ষরিক অর্থের দারোয়ান টাইপের কিছু নয়। কেননা সে একই সঙ্গে আগুন নেভানো, ফাস্টএইড কিটস বহন করা এবং ভূমিকম্পে উদ্ধার কাজেও অংশ নিতে পারে। রোবটের মুন্সিয়ানা বলতে গিয়ে ব্ল্যাক দলনেতা জান্নাতুল ফেরদৌস জানালেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) এই রোবটটি একই সঙ্গে ইমেজ প্রসেসিং, বাস্তব সময়ে ভিজ্যুয়াল ডেটা বিশ্লেষণ, বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং বিপজ্জনক অবস্থা মূল্যায়ন করে অনায়াসে বৈরী পরিবেশে চলাচল করতে পারে। বহন করতে পারে ৮০ কেজি ওজনের বস্তু। তবে এই ওজনদার রোবট নিয়ে প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জও ফেস করতে হয়েছে টিম ব্ল্যাককে। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে জান্নাতুল ফেরদৌস বললেন, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আমরা অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছি।
প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জিং অংশ ছিল দেশ থেকে পার্টস খুলে প্যাক করে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ায় সেগুলো অ্যাসেম্বল করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া। এয়ারপ্লেনে প্রেশারের কারণে এবং অতিরিক্ত চাপে মেটাল রোবটের কিছু অংশ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে রোবটের অংশগুলো সেট করার সময় বিপাকে পড়তে হয়। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে অন্য আঙ্গিকে রোবটটি সেট করা হয়। এ ছাড়াও দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া কিছু যন্ত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সেগুলোর পরিবর্তে একই কাজ করবে এমন অন্য যন্ত্র ম্যানুয়ালি বানিয়ে রোবটে লাগানো হয়েছে। স্বর্ণজয় করে এখন সব কষ্টই পানি হয় গেছে।
অপরদিকে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে নিরাপদ রাখার প্রত্যয়ে পানি দামল রোবট কারিগররা প্রমাণ দিল তাদের তৈরি দূষণ প্রতিরোধী স্বয়ংক্রিয় ব্লু-বট। ৫ বাই ৩ ফুট আকারের এই ওয়াটার বোটটি পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। নদী কিংবা পুকুরের কচুরিপানা, শ্যাওলা কিংবা ভাসপান কোনো ময়লা থাকলে তা যেমন নিজের পেটে পুরে পানির আবর্জনা পরিষ্কার করে একইভাবে পানি বিশুদ্ধকরণ ক্যাপসুল ও হ্যালোজেন টিউব দিয়ে পানি শোধন করতেও সমান পারঙ্গম। সৌরশক্তিতে চলতে পারে বিধায় মাঝপথে শক্তি ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও নেই বললেই চলে। বটটি নদীর পাশের যেসব কলকারখানা পানিদূষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি পরীক্ষা করে, সেগুলো চিহ্নিত করতে পারে। একই সঙ্গে নদীতে ট্রলার আটকে গেলে সার্ভিলেন্স বোট এবং ১০ কোজি পর্যন্ত ওজনের ত্রাণ বহন করতে পারে।
এ ছাড়াও ১০ মিটার পর্যন্ত এলাকার মধ্যে সোনার ডিটক্টর দিয়ে চর চিহ্নিত করে জলযানগুলোকে আগাম সতর্ক করার সক্ষমতাও এটির রয়েছে। একেবারে নিজেদের অর্থায়নে এই বটটি প্রস্তুত করার কারণ হিসেবে টিম অ্যাটলাস দলনেতা সানি জুবায়ের বললেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের পানিতে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। এর জন্য কোনো প্রযুক্তির ব্যবহার নেই। পানিসম্পদ রক্ষা করতেই আমরা ব্লু বট ডিজাইন করি। আর্থিক টানাপড়েন উতরে ওভার ক্লকস্পিডে সবটাই প্রমাণ দিতে পেরেছি প্রতিযোগিতায়। উড়িয়েছি লাল-সবুজের পতাকা। এই আনন্দে উড়ে গেছে সব সীমবদ্ধতা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা।
ফুরফুরে মেজাজে দেশে ফিরেই বিজয়ী নীরা মনোযোগী হয়েছে ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের জন্য এমন একটি রোবট বানাতে যেটি বাড়ির আঙিনাতে ফসল ফলাতে সাহায্য করবে কৃষানিকে। এককথায় অল্প স্থানে বেশি ফসল ফলানো বা জুমচাষে ব্যবহৃত হবে। তখন আমরা আবারও কাজী দার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইবÑ হে মোর রানী! তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে। আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে। অবশ্য ক্ষান্ত হয়নি দামালেরাও। নতুন উদ্যোমে তারা নেমেছে স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট চাষাবাদের সুযোগ করে দিয়ে কৃষাণের বিজয় কেতন ওড়াতে। খেতে ব্যবহৃত কৃষিযন্ত্রের আধুনিকায়নে মগ্ন টিম অ্যাটলাস। এজন্য লাঙ্গল-জোয়ালে আইওটি সেন্সর যুক্ত করা যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিবেশ দূষণে দায়ী উপকরণ নবায়নযোগ্য করা যায়, তা নিয়েই চলছে গবেষণা ও উন্নয়নকাজ। এই কাজে সফল হয়ে পরিবেশের বৈশ্বিক ঝুঁকি রোধেও হয়তো তারা ওড়াবে বিজয়ের নতুন কেতন। তখন বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ভাষায় বুক চেতিয়ে আমরা সমস্বরে গাইব-
ওই যে তাহার বিশ্ব-চেতন কেতন-আগে
জ্বলছে নূতন দীপ্তি রতন তিমির-মথন শুভ্ররাগে;
মশাল-ভস্ম লুপ্তি-ধুলায় নিত্যদিনের সুপ্তি মাগে।
আনন্দলোক দ্বার খুলেছে,
আকাশ পুলক-ময়—
জয় ভূলোকের, জয় দ্যুলোকের, জয় আলোকের জয়।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিবাংলা টেক ও বিআইজেএফ