গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৪ ১১:৫০ এএম
আবু সালমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ
প্রিয়জনের হঠাৎ অসুস্থতায় রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া যেমন চ্যালেঞ্জ, ঢাকার মতো ব্যস্তসমস্ত যানজটের শহরে তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সময়মতো রক্তদাতাকে রোগীর কাছে পৌঁছানো। এখনও বেশিরভাগ মানুষ পরিচিতদের মাধ্যমে ফোনে অথবা সমাজমাধ্যমেই কষ্টকর পদ্ধতিতে রক্তদাতার খোঁজ করে থাকে। ‘ব্লাডম্যান’ নামে একটি সংগঠন রক্ত গ্রহীতা ও দাতার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের কাজ করে।
এজন্য তাদের রয়েছে একটি কল সেন্টার। এ ছাড়া রক্তের জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে তাদের ফেসবুক পেজে। এমন মহান কাজ যারা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, সেসব স্বপ্নদ্রষ্টার একজন আবু সালমান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি জানালেন, সামাজিক সংগঠন ব্লাডম্যানের শুরুটা যেভাবে-আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইবিএতে এমবিএ করছি এবং সেখানে পড়াশোনার সুবাদে ওখানকার কিছু ছোট ভাইবোন ও বন্ধু মিলে আমরা দেশের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা কীভাবে ডিজিটালি সমাধান করতে পারি, এ সম্পর্কিত একটি উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সে সময় আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
ব্লাডম্যান সংগঠনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমসমস্যাটা হলো জরুরি পরিস্থিতিতে রক্ত জোগাড় করা অর্থাৎ জরুরি মুহূর্তে রক্ত অথবা রক্ত দানকারী ব্যক্তির চাহিদা পূরণ করাই ছিল আমাদের এ উদ্যোগের মূল এবং প্রথম উদ্দেশ্য। কারণ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সমীক্ষামতে বাংলাদেশে প্রতি বছর ২ থেকে ৩ ব্যাগ রক্তের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে একটা ব্যবধান থাকে। এই যে চাহিদা ও জোগানের তারতম্যের সমস্যাটি, এটি কীভাবে আমরা কমিয়ে আনতে পারি, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছিলাম। তখন আমরা চিন্তা করলাম যদি সব আগ্রহী রক্তদাতার একটি ডেটাবেজ তৈরি করতে পারি, যেখানে তাদের সব প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, তাহলে যাদের রক্তের প্রয়োজন তাদের যেখানে সেখানে রক্ত খুঁজতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে হবে না। প্রক্রিয়াটি হলো- একটি কল সেন্টারের মাধ্যমে একজন রিকোয়েস্ট জেনারেট করবেন এবং বলবেন যে তার কোন এলাকায় রক্তের প্রয়োজন। তখন কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ ডেটাবেজ থেকে দেখে জানাবেন ওই এলাকার কাছাকাছি কোনো রক্তদাতা অবস্থান করছেন কি না এবং থাকলে তাদের একত্র করে দেবেন।
তবে শুধু ব্লাড ডোনেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আমরা চিন্তা করেছি যে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঠিক চিকিৎসাসেবা পাওয়ার যে অধিকার, তা নিয়ে আমরা কাজ করতে পারি। তখন আমরা যেটা করলাম, একদম প্রান্তিক অঞ্চল যেমন চরাঞ্চলে, পাহাড়ে একেবারেই প্রত্যন্ত জায়গায় যেখানে হয়তো খুব ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, যেখানে মানুষ হাতুড়ে ডাক্তারের ওপর ভরসা করে সেখানে আমরা শহরের ভালো ডাক্তার নিয়ে গিয়ে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন করলাম এবং এখন পর্যন্ত আমাদের এ কাজটা চলমান রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্লাডম্যান তাদের স্বেচ্ছাসেবীদের একসঙ্গে করে এ জায়গাগুলোয় সহায়তা প্রদানের জন্য সর্বদা নিরলসভাবে কাজ করে থাকে।

সংগঠনটির এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাজ নিয়ে সালমান বলেন, আমাদের ব্লাডম্যানের এ বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ১০ বছরের পথচলা পূর্ণ হচ্ছে। এ সময়টাতে আমরা কয়েক লাখ মানুষের জন্য রক্ত জোগাড় করে দিতে পেরেছি। আমরা টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শহরের ভালো ডাক্তারের সঙ্গে কানেক্ট করতে পেরেছি। করোনা মহামারির সময় যখন হাসপাতালগুলো বন্ধ ছিল তখন সাধারণ মানুষের করোনা ছাড়াও অন্যান্য রোগ হচ্ছিল। তখন কীভাবে এদের ডাক্তারের সেবা নিশ্চিত করা যায় সে জায়গাটায় আমরা এ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সেবাগ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।
প্রায় ১৮-২০ হাজার মানুষকে আমরা এখন পর্যন্ত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের আওতায় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেছি। সংগঠনের লক্ষ্য এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে সালমান বলেন, ব্লাডম্যানের স্বপ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের একজন মানুষও রক্তের অপ্রতুলতায় মারা যাবে না, রক্তের অপ্রতুলতায় তাদের একটুও কষ্ট হবে না। দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জ। এখন দেশে ফোরজি প্রযুক্তি রয়েছে এবং সামনে ফাইভজি প্রযুক্তি আসবে। যদি আমরা এদের প্রযুক্তির মাধ্যমে সাহায্য করতে পারি তাহলে স্বাস্থ্যসেবার যে গ্যাপটি রয়েছে তা সহজেই কমিয়ে আনা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ আইবিএ থেকে এমবিএ করা সালমান বর্তমানে বিএটি বাংলাদেশে এক্সটার্নাল কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তিনি ফ্যাকাল্টি অব বিজনেস স্টাডিজ থেকে বিবিএ শেষ করেছেন। এর আগে রেডিও জকি হিসেবে কাজ করা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সালমান স্বপ্ন দেখেন দেশের সব মানুষ একদিন উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবে।