× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

৮৭ দিনে ২০ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি

চার চাকায় আফ্রিকা ভ্রমণ

জুলিয়া পারভীন

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৪ ১৩:২৩ পিএম

আপডেট : ২০ মে ২০২৪ ১৩:২৬ পিএম

আফ্রিকার বিস্ময় ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের সামনে জুলিয়া পারভীন ও সিমন আলম দম্পতি

আফ্রিকার বিস্ময় ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের সামনে জুলিয়া পারভীন ও সিমন আলম দম্পতি

চার চাকায় আফ্রিকা ঘুরে দেখার স্বপ্ন পূরণে জুলিয়া পারভীন ও সিমন আলম দম্পতি বেরিয়ে পড়েন দুঃসাহসিক অভিযানে। ৮৭ দিনে আফ্রিকার ২০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার রোমাঞ্চকর এক গল্প ঘুরিয়ার পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন জুলিয়া পারভীন

ওভারল্যান্ডিং, শব্দটি যদিও ইউরোপিয়ান, আমেরিকান বা সাউথ আফ্রিকানদের কাছে অনেক জনপ্রিয়। কিন্তু আমাদের এশিয়ান বা আফ্রিকানদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। আমাদের অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল ‘আফ্রিকান টেইল বা লেজ’ গাড়ি নিয়ে এক্সপ্লোর করব। এজন্য আমাদের লেক্সউস আর এক্স ৪৫০ হাইব্রিড গাড়িটিকেই ক্যাম্পারে রূপান্তরিত করে নিলাম। মাত্র এক মাসের মধ্যে ১০টি দেশের ভিসা এবং গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজগুলো তৈরি করতে অনেক হিমশিম খেতে হলো। 

জুলিয়া পারভীনের অভিযানের ওভারল্যান্ড রুট ম্যাপ

আমরা মোম্বাসা থেকে ২ জানুয়ারি, ২০২৪-এ আমাদের চার চাকার অভিযান শুরু করি। মাত্র ৮৭ দিনে আমরা অতিক্রম করি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার, মোট ১০টি বর্ডার অতিক্রম করি। ১০টি দেশ ভ্রমণ করার ইচ্ছা থাকলেও আমাদের বুরুন্ডিতে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টের কারণে বুরুন্ডি থেকে ফিরে আসতে হয়। পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার এই দেশগুলো হলো- কেনিয়া, তানজানিয়া, মালাউই, মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, নামিবিয়া, জাম্বিয়া, বুরুন্ডি হয়ে কেনিয়া; যেটাকে আফ্রিকার লেজ বলা হয়ে থাকে। রুয়ান্ডা ও উগান্ডা বুরুন্ডি থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার ড্রাইভ করলেই আমরা আমাদের ১০টি দেশ শেষ করতে পারতাম। যেহেতু আগে থেকে আমাদের ভিসা নেওয়া ছিল না, এজন্য আমাদের সাউথ আফ্রিকা বর্ডার, অ্যাঙ্গোলা বর্ডার এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর অনেক কাছে থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। যদিও এর আগে আমরা সাউথ আফ্রিকা গাড়ি নিয়ে এক্সপ্লোর করেছি আর তাই এই ট্রিপে আমাদের তালিকায় সাউথ আফ্রিকা ছিল না। 

প্রাকৃতিক স্তম্ভ তানজানিয়ার প্রস্তর যুগ 

আমরা তানজানিয়াতে গতবার যখন মাউন্ট কিলিমানজারো অভিযানে আসি, তখন গাড়ি নিয়ে পুরো দেশ এক্সপ্লোর করি। তাই এবার শুধু এটাকে মালাউই যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আমাদের এই ট্রাভেলে মোট তিনবার এ দেশটির ভিসা নিতে হয়েছে। একবার কেনিয়া থেকে মালাউই যাওয়ার সময় আর একবার জাম্বিয়া থেকে বুরুন্ডি এবং বুরুন্ডি থেকে আমাদের রুয়ান্ডা যাওয়ার প্ল্যান থাকলেও পলিটিক্যাল কারণে হঠাৎ করে বুরুন্ডি-রুয়ান্ডা বর্ডারপোস্ট বন্ধ থাকায় বুরুন্ডি থেকে আরও একবার তানজানিয়াতে এন্ট্রি করতে হয়েছে।

আফ্রিকা সত্যি ম্যাজিক্যাল। বিশ্বের বৃহত্তম, সবচেয়ে প্রাচীন মিঠাপানির হ্রদ-লেক মালাউই দেখে আমরা চলে গেলাম আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ বাঁধ এবং বিশ্বের পঞ্চম ‘কাহোরা বাসা বাঁধ’ দেখতে। সেখান থেকে জিম্বাবুয়ের হারারে যাওয়ার পথে আমাদের গাড়ির দুটি চাকা কেটে গেল গর্তের মধ্যে পড়ে। চাকাগুলো হারারে থেকে কিনে এনে বদল করতে সহযোগিতা করেছিল স্থানীয় একজন। যদি সেদিন সেই আগুন্তুকের সাহায্য না পেতাম তবে ডাকাতির কবলে পড়তে হতো। আসলে পটহলস জিম্বাবুয়ের জাতীয় সমস্যা। এজন্য এই দেশ ভ্রমণের সময় সঙ্গে দুটা বা তিনটা অতিরিক্ত চাকা সঙ্গে রাখা ভালো।

আফ্রিকার বিস্ময় ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দেখার ইচ্ছা থেকে আমাদের এই ওভারল্যান্ডিং অভিযান শুরু। যেখানে প্রতি মিনিটে ৫ মিলিয়নেরও বেশি ঘনমিটার পানির পতন হয়। ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ইগুয়াজু জলপ্রপাত ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের সমতুল্য। স্থানীয় ভাষায় এর ওপর নাম ‘মসি-ওয়া-তুন্-তুনিয়া’ ধোঁয়া থেকে বজ্রপাত : ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত। আমাদের জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে দুই দিক থেকেই ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। 

আফ্রিকার প্রাণী বৈচিত্র্য যে কোন পর্যটককে মুগ্ধ করবে

ওকাভাঙ্গা ডেল্টায় পানির মধ্যে বন্য পশুপাখি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, যেটা বতসোয়ানার মৌন শহরে অবস্থিত। কাভাঙ্গো ডেল্টার পূর্বদিকে রয়েছে মোরেমি গেম রিজার্ভ। এই অঞ্চলে আফ্রিকান বুনো হাতি, জলহস্তী, দক্ষিণ আফ্রিকান চিতা, সিংহ, মহিষ ছাড়াও আরও অনেক বন্যপ্রাণীর বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে। ওকাভাঙ্গো বদ্বীপকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

নামিবিয়ার গ্রুটফন্টেইনের কাছে অবস্থিত হোবা উল্কাপিণ্ড

মহাকাশ থেকে টুপ্ করে পড়ে যাওয়া একটি দেশ যেন নামিবিয়া। কেউ যদি এলিয়েন মুভি বানাতে চায়, তাহলে এই দেশটি হবে শুটিংয়ের জন্য উপযুক্ত। এখানকার পরিবেশ দেখে  আপনার মনে হবে আপনি মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করেছেন। মাত্র ২৬ লাখ মানুষের বসবাস এই দেশে। নামিবিয়ার রাজধানী উইন্ডহোয়েক থেকে এর শেষ সীমানা স্কেলেটন বে প্রজন্ত, আবার সেখান থেকে ইটোসা ন্যাশনাল পার্ক, এখানকার আদিবাসী হিম্বার সঙ্গে রাত্রিযাপন, জীবনে প্রথম চিতার সঙ্গে হাঁটার অভিজ্ঞতা আর ভিনগ্রহ থেকে আসা উল্কাপিণ্ড ছুঁয়ে দেখা, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রিস্টাল, পিঙ্ক লেক- সে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমরা রাত্রে যখন ড্রাইভ করতাম তখন আকাশ তারায় তারায় আলোকিত থাকত, যেন মনে হতো আমরা আকাশের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে চলেছি।

ডেডভলেই গাছগুলো আনুমানিক ৯০০ বছর পুরোনো বলে অনুমান করা হয়

মেঘে ঢাকা আকাশ মাঝে মাঝে এমনভাবে গর্জন করত, আর এমনভাবে বিদ্যুৎ চমকাত যেন মনে হতো বিদ্যুৎ আকাশ থেকে মাটি ছুঁতে চাচ্ছে। ৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন বছরের পুরোনো সোসুসভলেই বালুর টিলাগুলো অন্বেষণ এবং ৩২৫ মিটারের সর্বোচ্চ টিলা ‘বিগ ড্যাডি’ আরোহণের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ না করলে নামিবিয়ার কোনো ভ্রমণ সম্পূর্ণ হবে না। এটি হলো নামিবিয়ার নামিব-নাউক্লুফ্ট জাতীয় উদ্যানে নামিব মরুভূমির দক্ষিণ অংশে অবস্থিত উচ্চ লাল টিলা দ্বারা বেষ্টিত একটি লবণ ও মাটির প্যান। ডেডভলেই গাছগুলো আনুমানিক ৯০০ বছর পুরোনো বলে অনুমান করা হয়, তবে শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সেগুলো পচেনি। ডেডভলেই ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি স্বর্গ। 

দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘতম অরেঞ্জ নদীতে ক্যাম্পিং

দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্তের ঠিক উত্তরে, ফিশ রিভার ক্যানিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যানিয়ন দেখতে হলে নামিবিয়ায় আসতেই হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার দীর্ঘতম নদী অরেঞ্জেতে কায়াকিং এবং সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা অবিস্মরণীয়। যার এক পাশে সাউথ আফ্রিকা অন্য পাশে নামিবিয়া। কোলমানস্কপ দক্ষিণ নামিবিয়ার নামিব মরুভূমির এক বিখ্যাত ভূতের শহর। বন্দর শহর লুডরিটজ থেকে কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে অবস্থিত এই ভূতের শহর। নামিবিয়ার রেলকর্মী জাকারিয়াস লেওয়ালা মরুভূমিতে একটি হীরা খুঁজে পান কোলমানস্কপে।

বছরে প্রায় এক মিলিয়ন ক্যারেট বা বিশ্বের মোট হীরা উৎপাদনের প্রায় ১১.৭ শতাংশ উত্তোলন করত এই শহর থেকে। ১৯০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঔপনিবেশিক শাসকরা একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করে; যার মধ্যে কোলমানস্কপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। বহু বছর পর যখন জার্মানরা রাতারাতি শহর থেকে পালিয়ে গেল সমস্ত হীরা উত্তোলন করে, তখন এটা ভূতের শহরে পরিণত হলো। নামিবিয়া অন্বেষণ শেষ করে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ বৃহত্তম ‘কারিবা বাঁধ’ দেখা। কারিবা বাঁধ হলো জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের মধ্যবর্তী জাম্বেজি নদীর অববাহিকার কারিবা গিরিখাতে অবস্থিত। এখান থেকে জাম্বিয়ার লুসাকা এবং সেখান থেকে গেলাম Nc'wala অনুষ্ঠানটি উদযাপন করতে। চিপাতা জেলার জাম্বিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে থাকা আদিবাসী এনগোনি লোকেরা ঋতুর প্রথম ফসলের উত্তোলনের জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মালাউই, মোজাম্বিক থাকা এই আদিবাসীর রাজা বাস করেন এই শহরে। আমরাও গেলাম, কিন্তু এন্ট্রান্সের গেট থেকে আমাদের আইফোন ১৫প্রম্যাক্স, ব্যাকআপ হার্ড ড্রাইভ, মানিব্যাগ, মেমোরি কার্ড সর্বস্ব চুরি হয়ে গেল। আর এভাবে আমরা হারিয়ে ফেললাম আমাদের এত্তগুলো দেশের ভ্রমণের ছবি, ভিডিও, ড্রোন শট। আমাদের ট্রাভেল ফুটেজগুলো হারিয়ে অনেকটাই মর্মাহত ছিলাম। আমরা সাধ্যের বাইরে গিয়ে ওখানকার রাজা, পুলিশ, সিআইডির মাধ্যমে ডিভাইসগুলো ফেরত পেতে চেষ্টা করেছি, এমনকি চোর বাজারে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি এই মডেলের ফোন বিক্রি হচ্ছে কি না। একজন বলল, গত রাতে এই মডেলের একটা ফোন আসছে, পরে যখন ওরা আমাদের সামনে ফোন নিয়ে আসবে, কেউ একজন আগে এসে আমাকে দেখে চিনে ফেলাই আর সামনে নিয়ে আসেনি। 

আমরা একবার ভাবলাম ফিরে আসি, পরে আমাদের এই ট্রমা থেকে বের হওয়ার জন্য তানজানিয়ায় আসার পরে ইসিমিলিয়া স্টোন এইজ, গোরনগোরো ক্রেটার, অন্বেষণ করে চলে যাই বুরুন্ডির দিকে। বুজুম্বুরা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে একটি হোটেল দেখতে পেয়ে শিমন গাড়িটা পার্ক করে চলে গেল হোটেল দেখতে। আমি গাড়িতেই প্যাসেঞ্জার সিটে বসা। কিছুক্ষণের মধ্যে পার্ক করে থাকা গাড়িটা রিভার্সে চলা শুরু করল। বৃষ্টির মধ্যে পিছলা রাস্তা, স্টিপ স্লোপস, গাড়ির পেছনে থাকা হেভি লোড, গাড়িটি হঠাৎ করে শেক করে উঠল, সম্ভবত হার্ডব্রেক কাজ করেনি, পেছাতে পেছাতে গাড়িটা আমাকে নিয়ে প্রায় ১০০ মিটার নিচে পড়ে গেল পাহাড়ি খাদে, সেটা ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্যোগ। গাড়িটা হোটেলের পার্কিং পেরিয়ে প্রথমে একটা হাইওয়ে ক্রস করে যখন পাহাড়ি খাদে ৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে সোজাভাবে পড়ে গেল, যদি এইটা সোজা না গিয়ে উল্টানো শুরু করত, তাহলে আমার বাঁচার কোনো রকম সম্ভাবনা ছিল না। রাতের অন্ধকারে শিমনের চিৎকার ভেসে আসছিল। কিন্তু আমাকে একটা বলয় ঘিরে রেখেছে যে, ওর চিৎকারে কোনো সাড়া দিতে পারলাম না।

আমার পাশের ড্রাইভিং সিট্ খালি, আমার ভেতর থেকে মনে হচ্ছিল কোনো অদৃশ্য শক্তি মনে হয় গাড়িটিকে পরিচালনা করছে, সেই সঙ্গে যেন গাড়ি আমাকে বলতে চাচ্ছে ভয় নেই, তুমি চুপচাপ বসে থাকো, তোমার কিছু হবে না। আবার মনে হচ্ছে, আজকেই আমার এই দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার দিন। এই অনুভূতিগুলো কয়েকটি শব্দে হয়তো বোঝানো যাবে না। অবশেষে গাছের গুঁড়িতে গিয়ে গাড়িটি আটকায়, গাড়ির পেছনে থাকা গাছ এবং আমার পাশে যে ছোট গাছটি ছিল, সেটা আমার দিকের দরজার সঙ্গে আটকায় গেল । ওই সময় গাড়িটা ওখান থেকে উল্টানোর পর্যায়ে যেতে গিয়ে গাছ এবং গাছের গুঁড়ির সঙ্গে গাড়িটিকে আটকায় ফেলল। ততক্ষণে শিমনও গাড়ির কাছাকাছি এসে আমাকে জানালা দিয়ে উদ্ধার করল। এরই মধ্যে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেছে, ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলা স্থানীয়রা আমাদের সাহায্যর বদলে গাড়ি থেকে জিনিসপত্র চুরি করতে শুরু করল। সেদিন আমি হয়তো বেঁচে থাকতাম না, জীবনের দ্বিতীয় চান্স পেলাম। সবাই বলাবলি করছিল ‘গড ওয়ার্ক’। তিন দিন লেগে গেল গাড়িটি পাহাড়ের খাদ থেকে ক্রেন দিয়ে ওঠাতে। পরে একটি ট্রাকের ওপরে উঠিয়ে নিয়ে আসা হলো বুজুম্বুরাতে। এই অ্যাকসিডেন্টে ফুয়েল ট্যাংক, সাইড মিরর, পেছনের বামপার পুরোটাই বিধ্বস্ত হলো। ফুয়েল ট্যাংক এবং সাইড মিরর আফ্রিকার কোনো দেশে পাওয়া যাচ্ছিল না।

বুরুন্ডিতে লেখকের গাড়ির দুর্ঘটনা এবং অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া

৩ সপ্তাহের বেশি সময় লেগে গেল দুবাই থেকে ফুয়েল ট্যাংক কিনে সেটা উগান্ডা ইম্পোর্ট করতে। পরে উগান্ডা থেকে বাসে করে রুয়ান্ডা হয়ে তানজানিয়া এবং পরে বুরুন্ডি পর্যন্ত আনতে। আসলে বুরুন্ডি পৃথিবীর দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ, এখানে এই ধরনের লাক্সারি গাড়ি নেই বললেই চলে, আবার ইম্পোর্টও খুব কম হয়, যে কারণে এ রকম কোনো কিছু দেশের বাইরে থেকে আনতে মাসের পরে মাস অপেক্ষা করতে হয় লজিস্টিক কানেকশনসের জন্য। এখানে অনেক জিনিসের অপ্রতুলতা আছে যেমন- ইলেকট্রিসিটি, পেট্রল, ডিজেল, এমনকি ওষুধ।

আমাদের থাকার সময় কোথাও চিনি পাওয়া যাচ্ছিল না, পরে যখন বাজারে এলো তখন লম্বা লাইন দিয়ে কিনা লাগত। অনেকটা ট্রমা, আর ডিপ্রেশন কাজ করছিল আমাদের ওই সময়। যদিওবা ফুয়েল ট্যাংক পেলাম একই মডেলের কিন্তু 4wd। আর আমাদের গাড়ি ছিল 2WD। এজন্য ফুয়েল ট্যাংকের পাইপগুলো আগের ট্যাংক থেকে কেটে নতুন ট্যাংকে ওয়েল্ডিং করে লাগানো হলো। বলাই বাহুল্য, পেট্রল ফুয়েল ট্যাংকে ওয়েল্ডিং করা অনেক ঝুঁকির, এটা বোমার মতো কাজ করে, সাধারণত মেকানিকরা এধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি হয় না, কিন্তু আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য অবশেষে এই পন্থা অবলম্বন করতে হলো। ওই মুহূর্তে আমাদের একটাই লক্ষ্য, কখন গাড়ি ঠিক হবে আর আমরা বাড়ি ফিরব। যদিও বুজুম্বুরা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে আফ্রিকান গ্রেট টাঙ্গানিকা হ্রদ। সাইবেরিয়ার বৈকাল হ্রদের পরে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম স্বাদু পানির হ্রদ, আয়তনের দিক থেকে দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং গভীরতম। অবশেষে অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমাদের গাড়ি কোনোরকম ঠিক হলো। আমরা রওনা দিলাম ৪ এপ্রিল, প্রায় ২০ কিলোমিটার ড্রাইভ করার পরে টের পেলাম আমাদের গাড়ির ফুয়েল ট্যাংক থেকে টেপের পানির মতো তেল বের হচ্ছে। 

৮৭ দিনে আফ্রিকার ২০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন জুলিয়া পারভীন ও সিমন আলম

গাড়ি বুজুম্বুরাতে নিয়ে গেলাম আবার ঠিক করার জন্য। মেকানিক কোনো একটা পাইপ জয়েন্ট দিতে ভুল করেছিল, সেটা ঠিক করে আবার প্রায় ৭০ কিলোমিটার টেস্ট ড্রাইভ দিয়ে আমরা রওনা হলাম ৫ এপ্রিল। এবার কোথাও না থেমে বুরুন্ডি থেকে তানজানিয়া এবং পরে মোম্বাসা ফিরে আসি টানা দুই দিনে। প্রায় দিন-রাত দুই হাজার কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যের শহর মোম্বাসাতে। 

ওভারল্যান্ডিংয়ের বিশ হাজার কিলোমিটারে আমরা যেমন হারিয়েছি, তেমনি পেয়েছি অনেক কিছু। আমরা কি আবার ওভারল্যান্ড করব? হ্যাঁ, অবশ্যই! আমাদের এই চার চাকায় বিশ্বভ্রমণ চলতেই থাকবে। এজন্য আমরা আর্লি রিটায়ারমেন্ট করছি, যাতে এই চার চাকায় বিশ্বকে পুরোটাই অন্বেষণ করতে পারি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা