পেরিয়ে বন্ধুর পথ
শিব শংকর রবিদাস, শিবচর (মাদারীপুর)
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৪ ১০:৫১ এএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৪ ১৩:২৫ পিএম
অভাবের পরিবারে বাড়তি আয়ের জন্য লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির সহকারীর কাজ করে আহাদ। পেয়েছে জিপিএ-৫। ভবিষ্যৎ নিয়ে যদিও আছে শঙ্কা। প্রবা ফটো
এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারীরা
যখন আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছে, এর উল্টো চিত্র শিবচরের শিরুয়াইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে
জিপিএ-৫ পাওয়া দুই দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস ও আহাদের বাড়িতে ভিন্ন
চিত্র।
ফল ঘোষণার দিনও জান্নাতের দিনমজুর
রঙমিস্ত্রি বাবাকে ঢাকায় কাজে ফিরতে হয় পরিবারের অভাবের কারণে। আর আহাদ সেদিন বাড়ি
থেকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরে রাজমিস্ত্রির জোগানের কাজ করছিল। ভালো ফল করেও কলেজে
ভর্তি হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে এই দুই মেধাবী।
ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার কালামৃধা ইউনিয়নের দোলকুন্ডি গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর বজলুর রহমান ও শিউলি বেগম দম্পতির ২ সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস। পরিবারটি শিবচরের বাসিন্দা হলেও নদী ভাঙনের কারণে স্থানান্তর হতে বাধ্য হয়। জান্নাতুলের বাবা রঙমিস্ত্রি বজলুর রহমান প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকায় কাজ করে পরিবারের খরচ চালিয়ে আসছিল। করোনাকালীন প্রায় দেড় বছর বাড়িতেই বেকার সময় কাটাতে বাধ্য হন বজলুর রহমান। তখন জান্নাতুলের নানা নূরুল ইসলাম হাওলাদারের সহযোগিতায় সংসারটি খেয়েপরে টিকে থাকে। হাজারো প্রতিবন্ধকতার মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যায় জান্নাতুল। দারিদ্রতাকে সঙ্গী করেই চলতি বছর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসিতে অংশ নেয় জান্নাতুল। ফরম ফিলাপের টাকাও দেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ।

একই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে
জিপিএ-৫ পেয়েছে আহাদ। উপজেলার নিলখী ইউনিয়নের বাগমারা গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ও রাবেতা
বেগম দম্পতির দুই ছেলের মধ্যে বড় আহাদ। বাবা দেলোয়ার হোসেন আগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়
বেডসিট বিক্রি করত। প্রায় দুই বছর আগে স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী। আহাদ তখন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এই বয়সেই সংসারের ভার
তুলে নেয় কাঁধে। সঙ্গে আত্মীয়দের সহযোগিতায় কোনোমতে চলে তাদের সংসার। পরিবারের জন্য
লেখাপড়ার পাশাপাশি দৈনিক ৪৫০ টাকা হাজিরায় রাজমিস্ত্রির সহকারি হিসেবে কাজ শুরু করে
সে। প্রতিদিন স্কুলেও যেতে পারেনি আহাদ। বই না থাকায় বন্ধুদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে পড়তে
হয়েছে। ফরম ফিলাপে সহযোগিতা করেন ওই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও এক সহকারী
শিক্ষক।
জান্নাতুল ফেরদৌসের মা শিউলি বেগম
বলেন, আমার স্বামী রঙমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালানো কষ্টকর। আমার বাবা ও বিদ্যালয়
কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা না পেলে জান্নাতুলের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া হয়তো হতো না। নিজের
প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিতে আজ জান্নাতুল ভালো ফল অর্জন করেছে। ওর ইচ্ছা ডাক্তার হবে। ভালো
কলেজে ভর্তি করব, সেই সামর্থ্য আমাদের নেই। সাহায্য না পেলে ওর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া
সম্ভব নয়।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলে, আমার বাবা
অনেক কষ্ট করেও আমাদের জন্য যা করতে পারেনি তা আমার নানা-মামারা করেছেন। আমি ভালো একটি
কলেজে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া করে ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। জানি না সেই স্বপ্ন পূরণ হবে
কি না।
আহাদের মা রাবেতা বেগম বলেন, আহাদের
বাবা স্ট্রোক করার পর আত্মীয়দের সহযোগিতা পেয়েছি। ছেলে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করে।
ভালো কলেজে ওকে ভর্তি করে লেখাপড়া যে করাব সেই সামর্থ্য আমাদের নেই। সবার কাছে ছেলের
ভবিষ্যতের জন্য সহযোগিতা চাই।
মেধাবী আহাদ বলে, বাবা অসুস্থ। ছোট ভাই লেখাপড়া করছে। মামা ও চাচাদের সহযোগিতায় চলি। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই লেখাপড়ার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির কাজ করি। ভালো একটি কলেজে পড়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে, কিন্তু আমার দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। জানি না কোথায় ভর্তি হবো।