× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাজা লক্ষ্মীকর্ণের বাড়ি

হাজার বছরের লুকানো ইতিহাস

মিশকাত রাসেল

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২:৩৮ পিএম

১০৪৫ সালের দিকে কলচুরির রাজা লক্ষ্মীকর্ণ মহারাজা গোবিন্দ চন্দ্রকে হত্যা করে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন

১০৪৫ সালের দিকে কলচুরির রাজা লক্ষ্মীকর্ণ মহারাজা গোবিন্দ চন্দ্রকে হত্যা করে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাজবাড়িটি নির্মাণ করেন

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামে আছে একটি দিঘি। বড়দিঘি নামে পরিচিত এর পশ্চিম পাড়ে আছে কলচুরির রাজা লক্ষ্মীকর্ণের  রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ। অনালোকিত স্থানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। হাজার বছরের বেশি সময়ের লুকানো ইতিহাস নিয়ে লেখা...

পশ্চিমের লাল সূর্য হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার আকাশে। শেষ বিকালের সূর্যকে আড়াল করেছে বাঁশঝাড়। পাশেই পুরোনো মাটির বাড়ি, নাম আকন্দ বাড়ি। প্রায় ২০০ বছর আগে সিংহশ্রী থেকে সরপদি আকন্দ আর তার ভাই আরপদি আকন্দ এখানে একটি বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন। সে বাড়ির পুবপাশে বিশাল দিঘি। স্থানীয়রা ‘কনক রাজার দিঘি’ বলে ডাকে। অনেকেই বলে ‘বড়দিঘি’।

ইতিহাসের ভাষ্যমতে, দিঘির পশ্চিম পাশে ছিল কলচুরির রাজা লক্ষ্মীকর্ণের বিশাল বাড়ি। হাজার বছর পুরোনো সেই রাজবাড়ি মুখ লুকিয়ে আছে ধুলোমাটির নিচে।

দিঘির পশ্চিমপাড়ে উত্তর-দক্ষিণে ৩০০ মিটার লম্বা। পুব-পশ্চিমে ১৫০ মিটার লম্বায় বিশাল জায়গা জুড়ে আছে এ রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ। বর্গাকৃতির পুরোনো টালিইটের স্তূপ বেশ কয়েক জায়গায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেসব ইটের টুকরো। এখানে সেখানে পড়ে আছে নকশাকৃত বিশাল বিশাল পাথরের খণ্ড। সে পাথরখণ্ডের একটিতে আছে আট পাপড়ির ফুল খোদাই করা। পাপড়ির কেন্দ্রে বৃত্তাকার গর্ভাংশ। দুই দিকে খোদাই করা লতাপাতা ও বৃক্ষদণ্ড। পাথরটি ২ ফুট লম্বা, ১ ফুট প্রশস্ত হবে। আলমগির আকন্দের বাড়ির গোসলখানার পাশে রেখে দেওয়া ৩ ফুট লম্বা, দেড় ফুট প্রশস্ত, ১ ফুট উচ্চতার আরেকটি পাথরের মধ্যখানে দেড় ইঞ্চি ব্যাসার্ধের লোহার খণ্ড বেরিয়ে থাকতে দেখা যায়। সেই পাথরের পাশেই আছে আরেকটি পাথর।


মাটির বাড়ির মালিক আলমগির আকন্দ কলার বাগান করেছেন দক্ষিণে। সে বাগানের ভেতরে গেলে ইতিহাসসন্ধানী মানুষের শরীর শিউরে উঠবে। কলাবাগানের মধ্যখানে সমতল থেকে ৩-৪ ফুট উঁচু ঢিবির ওপর কাঁঠাল গাছ। সে গাছের শেকড় আঁকড়ে ধরে আছে ইটের চুনসুরকি দেওয়া দেয়াল। এ ঢিবি দেখলে সহজেই অনুধাবন করা যায়, কয়েক বছর আগেও চারপাশের সমতল এ ভূমিও এমন উঁচু ছিল। আরেকটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে কলাবাগানের শেষপ্রান্ত। সে প্রান্তে দেখা মেলে মোটা দেয়াল, প্রাচীন টালিইটের। দেয়ালের ওপারে ৫ থেকে ৬ ফুট গভীরে ধানক্ষেত। দেয়ালটি দেখলেই আন্দাজ করা যায়, এটি ছিল রাজবাড়ির রক্ষাপ্রাচীর। দেয়ালটির উত্তরের প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট কেটে ফেলা হয়েছে। কেটে ফেলা অংশের ইট পাশেই স্তূপ করে রাখা। এ বিষয়ে জানতে কথা হয় আলমগির আকন্দের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমিই এখানে কলাবাগান করেছি। এখানে আগে ইটের স্তূপ ছিল। ইটের জন্য ভালো কোনো ফসল হয় না। তাই ইটগুলো উঠিয়ে ফেলেছি। আসলে এর ঐতিহাসিক বিষয়ের গুরুত্ব আমার তেমন জানা নেই। কৃষিকাজের জন্য আমি মাটি কেটেছি।’

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়ন। এর কর্ণপুর গ্রামে বড়দিঘির পশ্চিম পাড়ে এ রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ। ইতিহাসে আছে, ১০৪৫ সালের দিকে কলচুরির রাজা লক্ষ্মীকর্ণ যুদ্ধে মহারাজা গোবিন্দ চন্দ্রকে হারিয়ে হত্যা করে এখানে শিবির স্থাপন করেন। সে বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন এ দিঘি আর রাজবাড়ি। বর্তমানে এ রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষের ওপর একটি বাড়ি রয়েছে। বাড়ির দক্ষিণ পাশে কয়েক বছর আগে মাটি আর ইটের স্তূপ কেটে সমান করা হয়েছে। সেই সমতল জায়গা পাকা করে নির্মিত হয়েছে ঈদগাহ। সেখান থেকে প্রাচীন ইট বিছানো যে রাস্তাটি দিঘির ঘাটে মিশেছে, সেটি এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। ঘাটটিও ঈদগাহ মাঠের মুসল্লিদের সহজে অজু করার জন্য পাকা করা। ঘাট থেকে দিঘির পুবপাড় পর্যন্ত একটি দেয়াল আছে। চৈত্রে দিঘির পানি কমে গেলে সে দেয়াল চোখে পড়ে। কথিত আছে, কর্ণ রাজার ছিল দুই রানী। তাদের জন্য এ দেয়াল দিয়ে দিঘিটি দুই ভাগ করে দেওয়া হয়। রাজার মূল প্রাসাদের উত্তরে ছিল আরেকটি প্রাসাদ। সে প্রাসাদে থাকতেন দ্বিতীয় রানী। বর্তমানে বাদবাকি জায়গা জঙ্গলাকীর্ণ, বাঁশঝাড়ে পূর্ণ। এসবের মধ্যে ছোট ও মাঝারি আকৃতির টিলা চোখে পড়ে।


এ স্থাপনা নিয়ে ‘ঢাকার ইতিহাস’ প্রথম খণ্ডে যতীন্দ্রমোহন রায় লিখেছেন, ‘দুরদুরিয়ায় একটি প্রাচীন দুর্গের ভগ্নাবশেষ অদ্যাপি দৃষ্টিগোচর হইয়া থাকে। এই স্থানের বিপরীত দিকে বানার নদীর অপর তীরে একটি সমৃদ্ধ নগরীর চিহ্ন বিদ্যমান আছে। এতদুভয় স্থানই বৌদ্ধ নরপতিগণ কর্ত্তৃক নির্ম্মিত হইয়াছিল বলিয়া কেহ কেহ অনুমান করিয়া থাকেন।’ পাশাপাশি শফিকুল আসগর ও আবদুর রশীদের লেখা ‘গাজীপুর জেলার ইতিহাস’ বইটিতে আছে, ‘১০৪৫ খ্রিস্টাব্দের কোনো একসময় কলচুরি রাজা লক্ষ্মীকর্ণ কর্তৃক সমতট আক্রান্ত হলে চন্দ্রবংশের শেষ নরপতি মহারাজা গোবিন্দচন্দ্র কাপাসিয়া থানার অন্তর্গত সাহার বিদ্যাকুট নামক শীতলক্ষ্যার পূর্বতীরে একটি স্থানে সৈন্যসমাবেশ করে প্রতিরোধ ব্যূহ তৈরি করেন। রাজা কর্ণ তার সৈন্যবাহিনীসহ নদীর পশ্চিম তীরে শ্রীপুর থানার গোসিংগা বাজার সংলগ্ন স্থানে শিবির স্থাপন করেন। উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধের পর গোবিন্দচন্দ্র নিহত হন। যুদ্ধজয়ের পর কর্ণ যেখানে শিবির স্থাপন করেছিলেন সে স্থানের নামকরণ করেন কর্ণপুর। আর কর্ণপুরের নিকট খনন করেন এক বিশাল দিঘি।’

হাজার বছরের স্মৃতি ধারণ করে আছে প্রাচীন কর্ণপুর ও তার বিশাল ঘিঘি। প্রায় ২০ একর জায়গা জুড়ে আছে এ ঘিঘি, চারদিকের পাড়গুলো পাহাড়ের মতো উঁচু। আছে চারটি শানবাঁধানো ঘাট, ওপর থেকে ধাপে ধাপে একেবারে নিচে নেমে এসেছে। ঘিঘির পশ্চিম তীরে প্রশস্ত উঁচু পাড়ের ওপর একটি প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ। মূল ধ্বংসস্তূপটি উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩০০ ফুট লম্বা। ধ্বংসস্তূপের চারদিকে মাটির নিচে একটি বেষ্টনী প্রাচীর লক্ষ করা যায়। একটি শানবাঁধানো রাস্তা মূল ধ্বংসস্তূপ থেকে বেষ্টনী প্রাচীরের প্রবেশ তোরণ হয়ে দিঘির পাকা ঘাটকে সংযুক্ত করেছে। প্রাচীন বেষ্টনীর বাইরে উত্তর পাশে অন্য একটি ইমারতের ধ্বংসাবশেষ অপেক্ষাকৃত ছোট। এ ধ্বংসস্তূপটি পুব-পশ্চিমে প্রায় ১২০ ফুট লম্বা।

তবে এ স্থাপনা নিয়ে শেখ রেয়াজউদ্দীন আহমদ সম্পাদিত ‘শ্রীপুরের ইতিহাস ও কৃষ্টি’ বইটিতে লেখা, ‘শ্রীপুরের পূর্বদিকে গোসিংগা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামে আনুমানিক প্রায় ১০৫০ সালে ইন্দ্রপালের প্রপৌত্র কর্ণপাল উক্ত দীঘিটি খনন করান। ইহার পরিমাণ প্রায় ২২ একর জমি। সম্ভবতঃ এখানে তিনি বাড়ীও করিয়াছিলেন। তাহার ধ্বংসাবশেষ দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা কর্ণপুর বড়দীঘি নামে পরিচিত।’


প্রাচীন এ রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপ নিয়ে শ্রীপুর কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রধান সহকারী অধ্যাপক মো. সেলিম মোল্লা বলেন, ‘কর্ণপুরের প্রাচীন এ রাজবাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। স্থাপনাটির বিষয়ে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু বইয়ে উল্লেখ আছে। এটি খনন করে এর সঠিক ইতিহাস উদ্‌ঘাটন করা এবং স্থাপনাটি সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন।’

প্রাচীন এ স্থাপনায় নির্মিত ঈদগাহে আলাউদ্দিন আকন্দ ও তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। তারা প্লাস্টিকের চট বিছিয়ে ধান শুকাচ্ছেন। আলাউদ্দিন আকন্দের বয়স ৭৫-এর কমবেশি। তিনি সরপদি আকন্দের ছেলে জহুর উদ্দিন আকন্দের নাতি। এ স্থাপনার বিষয়ে বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম তখন এখানে গাছপালায় ঘেরা বড় দিঘি ছিল। দিঘি ভর্তি ছিল মাইক কলমি গাছ। এ দিঘির পাড়ে পাশের গজারি বন থেকে বাঘ এসে রোদ পোহাতো। ধীরে ধীরে বন কমে গেছে। পরে চারপাশে মানুষজন বাড়িঘর করতে থাকে একটা-দুইটা করে। পাকিস্তান আমলে কাদির পরধাইন্যা এ দিঘি পরিষ্কার করান। তখন দেখা যায় এখানে বড় বড় পাথর, ভাঙা ইটের স্তূপ। পাথরে সুন্দর সুন্দর নকশা কাটা। এ পাথর এখান থেকে বিভিন্ন সময় অনেকে নিয়ে গেছে। নিয়ে গেছে ইটও। তখন এ এলাকায় ইটের কোনো ভাটা ছিল না। এখনও অনেক ইট-পাথর পড়ে আছে। মনে হয় ইট-পাথরের শেষ নেই। আমাদের পুরান বাড়িতে ষষ্ঠভুজ আকৃতির সুন্দর একটা পাথর আছে।’

স্থাপনাটির বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘স্থানটি সম্পর্কে আমার জানা আছে। অনেক বইতে পড়েছি। কিন্তু এখনও সেখানে আমার যাওয়া হয়নি। কিছুদিন আগে আমার ঐতিহ্য অন্বেষণের টিম নিয়ে দরদরিয়া দুর্গ খনন করেছি। পরিকল্পনা আছে এ স্থানটিও খনন করার।’

স্থাপনার অনেক মূল্যবান অলংকৃত ইট, পাথর, পাথরের টুকরো মানুষ নিয়ে যাচ্ছে। আবার অসচেতনভাবে ধ্বংসও করছে। পরিকল্পিতভাবে যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থানটি খনন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে উন্মোচিত হবে হাজার বছরের ইতিহাস। স্থানটি হয়ে উঠবে প্রত্নপর্যটনের দর্শনীয় স্থান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা