বিহঙ্গ
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ ১১:৫১ এএম
আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:৫৫ পিএম
ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে ডিমে তা দানরত পুরুষ রাঙা হালতি পাখি। ছবি- লেখক।
প্রথমবার ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে যখন
পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খানের বাড়ি ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে যাই, তিনি তখন নিভৃতচারী
রহস্যময় পাখিটিকে দেখানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথমবার তো
দূরের কথা দ্বিতীয়বারও ওর দেখা পেলাম না। দেখতে দেখতে পনেরো বছর পেরিয়ে গেল।
কর্মব্যস্ততা ও দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে সাতশৈয়া গ্রামে আর যাওয়া হলো না।
কিন্তু শরীফ খানের মামাতো ভাই শিপলু খানের মাধ্যমে ফি-বছর প্রজনন মৌসুমে ওদের
ডিম-ছানা তোলার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে লাগলাম। এরপর ২০১২ সালে এলো সেই
মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন বিরল এই পাখির প্রজনন প্রতিবেশ নিয়ে গবেষেণা করার জন্য ছোটখাটো
একটি গবেষণা অনুদান পেলাম। তখন থেকে আবার সাতশৈয়া গ্রামে যাওয়া-আসা শুরু হলো। এবার
কিন্তু আর শূন্য হাতে ফেরা নয়। ওদের ডিম-ছানার ছবি ও মাপজোকসহ বহু অজানা তথ্য আমার
গবেষণার ভান্ডারে পুঞ্জীভূত হলো।
দীর্ঘ পনেরো বছর অপেক্ষার পর পাওয়া
রহস্যময় পাখিটির নাম রাঙা হালতি বা বড় হালতি, অন্তত তার আবাস এলাকা
বাগেরহাট-ফকিরহাটে সে এ নামেই পরিচিত। এটি এদেশের বিরল আবাসিক পাখি। ইংরেজি নাম Slaty-legged Crake, Banded Crake বা Slaty-legged Banded Crake। বৈজ্ঞানিক নাম Rallina eurizonoides (র্যালিনা ইউরিজোনইডস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি এটি।
প্রাপ্তবয়স্ক রাঙা হালতির ঠোঁটের
আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ২১ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৪৭
থেকে ৫০ সেন্টিমিটার ও ওজন ১০০ থেকে ১৮০ গ্রাম। পিঠ, ডানা ও লেজ জলপাই-বাদামি হলেও
প্রথম দর্শনে পাখিটিকে লালচে দেখায়। মাথা লালচে-বাদামি। গলা ও থুতনি সাদা। বুক,
পেট ও লেজের তলা কালো, তাতে সাদা রেখা টানা। চোখের রঙ গাঢ় লাল। চঞ্চু, পা, পায়ের
পাতা ও আঙুল সবুজাভ-ধূসর। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। তবে আকারে সমান হলেও
পুরুষটি তুলনামূলকভাবে বেশি উজ্জ্বল ও হৃষ্টপুষ্ট হয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা,
ঘাড় ও বুক কালচে জলপাই-বাদামি।
রাঙা হালতি মূলত খুলনা-বাগেরহাট,
বিশেষ করে ফকিরহাট উপজেলার গ্রামীণ বনের বাসিন্দা। তবে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও রংপুর
বিভাগের আলতাদীঘিতেও দেখা গেছে বলে জানা যায়। এ ছাড়াও সাম্প্রতিককালে রাঙামাটিতেও
দেখার তথ্য রয়েছে। ওরা সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। মূলত গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা
জলাশয় ও তার আশপাশে বাস করে। তবে ঘন গ্রামীণ বাগানের ঝোপঝাড়ের নিচে থাকতে পছন্দ
করে বেশি। মাটির ওপরের কীটপতঙ্গ ও শস্যদানা খায়। শীতকালে ঝোপঝাড়ের মাথায় বসে রোদ
পোহায়। সচরাচর ‘কেক-কেক--কেক-কেক--কেক-কেক---’ শব্দে ডাকে।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ
সময় ওরা দিন-রাত পাড়া কাঁপিয়ে ডাকতে থাকে। তবে বাসা বানানো হয়ে গেলে ডাকাডাকি থেমে
যায়। মাটির ওপরে বা মাটি থেকে ১ থেকে ২ মিটার উঁচুতে ঝোপঝাড়ে বা গাছের কাটা গোড়ায়
লতাপাতা ও শিকড়-বাকড় দিয়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ৭টি, রঙ সাদা। স্ত্রী-পুরুষ
মিলেমিশে তা দেয়। ডিম ফোটে ১৯ থেকে ২১ দিনে। সদ্যফোটা ছানাগুলোর দেহের কোমল পালক
কুচকুচে কালো। দেহের ভেজা কোমল পালক শুকানোর পরপরই ওরা বাসা থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে
যায়। প্রায় দেড় মাস বয়সে কালো পালকের রঙ বদলে লালচে হতে থাকে, শুরুতে যা ফোঁটার মতো
দেখা যায়। ছয় মাস বয়সের মধ্যে ডানার পালক পুরোপুরি গজিয়ে যায় ও উড়তে শেখে। প্রায়
সাত মাসে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মতো রঙ আসে ও ১০ থেকে ১২ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়।
প্রজননক্ষম হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ওরা বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকে। আয়ুষ্কাল ৩ থেকে ৪
বছর।