ইকবাল খন্দকার
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১৩:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১৩:৪১ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
সবুজ-শ্যামল একটি গ্রাম। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শান্ত নদী। যে নদীতে আছে নানানরকম মাছ। আর সাঁতার কাটে পাড়ার দুষ্টু ছেলেরা। নদীটির চমৎকার একটি নামও আছে। শীতলছায়া। নামটি কে রেখেছিল, কারও জানা নেই। শীতলছায়ার পারেই ছোট্ট একটি বন। ছোট হলেও দেখতে বেশ সুন্দর। ঠিক যেন বইয়ের পাতায় হরেক রঙে আঁকা নিখুঁত কোনো ছবি। কেবল তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। বনজুড়ে কত রকমের গাছ! ফুলের, ফলের আর কাঠের। এ বনে বাস করে একটি কাক। কাকটি বেশ বয়স্ক। কিছুটা অসুস্থও। তাই খুব বেশি ওড়াউড়ি করতে পারে না। দিনের বেশিরভাগ সময় বাসায়ই থাকে। ঝড়তুফানে বাসা ভেঙে গেলে আবার বানায়। একা একাই বানায়। কারণ সে নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করে। কাকের বাসার ঠিক দক্ষিণ পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাঝারি আকারের একটি বেলগাছ। গাছটি দখল করে রেখেছে একটি ঘুঘু। অথচ কিছুদিন আগেও এ গাছে বাস করত কাকের ছেলেমেয়ে আর নাতিনাতনিরা। ঘুঘুর ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে এখন তারা চলে গেছে অন্য গাছে। ঘুঘুটি ভীষণ অহংকারী। নিজেকে বড় ভাবা এবং অন্যকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা তার স্বভাব। এমন স্বভাব একদমই পছন্দ নয় কাকের। তাই সে তাকে বহুবার বুঝিয়েছে। বলেছে, অহংকার করা ভালো না। যে অহংকার করে তার পতন নিশ্চিত। অতএব অহংকার ছাড়ো, সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকো। কাকের কথা গায়ে মাখেনি ঘুঘুটি। সে অহংকার তো ছাড়েইনি, আরও বড় বড় কথা শুনিয়েছে। বলেছে, তুমি যদি দেখতে-শুনতে আমার মতো সুন্দর হতে, তাহলে তুমিও অহংকার করতে। তোমার গায়ের যা রঙ! কুচকুচে কালো। অহংকার করবে কী নিয়ে? অথচ আমার গায়ের রঙ দেখো!
প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায় কাক। তাই ঘুঘু যতই অহংকার করুক, তবু তার সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করে সে। খোঁজখবর নেয় শরীরস্বাস্থ্যের। কিন্তু ঘুঘু চায় না কাক তার সঙ্গে কথা বলুক। তাই কিছু জিজ্ঞেস করলে না শোনার ভান করে। মুখ ফিরিয়ে রাখে অন্যদিকে। গ্রীষ্মের দুপুর। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। কাক তাই বাসায় বসে বিশ্রাম করছে। তার চোখে অলস ঘুম। এমন সময় কেউ তাকে ডাক দেয়। গলাটা পরিচিত। অর্থাৎ ঘুঘুর গলা। কিন্তু কাকের যেন বিশ্বাস হয় না। তার কেবল মনে হতে থাকে, আগ বাড়িয়ে কথা বললেও যে মুখ ফিরিয়ে রাখে, সে বাসায় আসবে? তাকে ডাক দেবে?
প্রথম ডাকে সাড়া না পেয়ে আবার ডাক দেয় ঘুঘু। এবার চোখ খোলে কাক। উঁচু করে মাথাও। দেখে সত্যিই ঘুঘু এসেছে। আর বসে আছে জড়োসড়ো হয়ে। তার চোখে-মুখে ভয়, দুশ্চিন্তা। কাক জানতে চায় কী হয়েছে। ঘুঘু বলে, মহাবিপদে পড়েছি ভাই। আমাকে বাঁচাও। কাক উড়ে যায় ঘুঘুর কাছে। জানতে চায় কিসের বিপদ। ঘুঘু কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, এইমাত্র খবর পেলাম বনে নাকি শিকারি ঢুকবে। আর তুমি তো জানো, শিকারিরা তোমাদের না খেলেও আমাদের ঠিকই খায়। তার মানে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও ভাই। তোমাকে কত কথা শুনিয়েছি! কতভাবে কষ্ট দিয়েছি!
হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে ঘুঘু। কাক তাকে সান্ত্বনা দেয়। তারপর ডেকে আনে তার ছেলেমেয়েদের। কী যেন বলে তাদের কানের কাছে মুখ নিয়ে। তারপর আদেশ করেÑ এক্ষুনি যাও। আছে কি না দেখো। তারপর আমাকে জানাও। দ্রুত যাবে। কোথাও যেন দেরি না হয়। কাকের ছেলেমেয়েরা চলে যায়। ঘুঘু জানতে চায় তাদের কোথায় পাঠানো হলো, কেন পাঠানো হলো। কাক কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে পথের দিকে। আর অপেক্ষা করে ছেলেমেয়েদের জন্য। একটু পরই ফিরে আসে তারা। আর সুখবর দেয় কাককে। কাক এবার ঘুঘুকে বলে, গতকাল নদীর দিকে গিয়েছিলাম। তখন দেখেছি এক লোক নৌকা মেরামত করছে। আমার মনে হয়েছিল, মেরামত শেষ হলেই আলকাতরা আনবে। কেন জানো? নৌকায় দেওয়ার জন্য। আর এখন আমি ছেলেমেয়েদের কোথায় পাঠিয়েছিলাম জানো? নৌকাটার কাছে। তারা বলল আলকাতরা আনা হয়েছে। এখন যাও, আলকাতরার বালতিতে একটা ডুব দিয়ে এসো। শীতলছায়া নদীর পারে যায় ঘুঘু। ডুব দেয় আলকাতরার বালতিতে। তারপর ফিরে আসে কাকের কাছে। একটু পরই বনে ঢোকে শিকারি। তাকে দেখে ভয়ে কাঁপতে থাকে ঘুঘু। কাক ফিসফিসিয়ে বলে, আরে ভয়ের কিছু নেই। শিকারি কোনোভাবেই বুঝতে পারবে না তুমি ঘুঘু। সে তোমাকে কাক ভাববে। কারণ এখন আমাদের গায়ের রঙের সঙ্গে তোমার গায়ের রঙের কোনো তফাত নেই। কাকের কথাই সত্যি হয়। চলে যায় শিকারি। আর কাকের হাত চেপে ধরে ঘুঘু। বলে, গায়ের কালো রঙের কারণে তোমাকে কত নিন্দা করেছি! আর নিজের গায়ের রঙ নিয়ে কত অহংকার করেছি! আজ আমার সব অহংকার... ঘুঘুকে কথা শেষ করতে দেয় না কাক। পরম আদরে বুকে টেনে নেয় তাকে।