তৌহিদুল হক
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:৫৮ পিএম
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:৪৭ পিএম
বাংলাদেশে বর্তমানে নারী সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ; যা পুরুষ সাক্ষরতার চেয়ে ৪ শতাংশ কম ছবি : ইউনিসেফ বাংলাদেশ
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশের নারীদের ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে। শিক্ষা ও সাক্ষরতার হারের দিক থেকেও নারীরা এগিয়েছে বহুদূর। কর্মক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। শিক্ষায় নারীর হার বাড়লেও জীবনমানের দিক থেকে পিছিয়ে আমাদের নারীরা। বাল্যবিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না। নেই অর্থনৈতিক সমতাও। সময় এসেছে এসব বিষয়ে জোর আওয়াজ তোলার
সমাজ কিংবা ব্যক্তির জীবনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প বুননে শিক্ষার ভূমিকা তর্কবিহীন গ্রহণযোগ্য। শিক্ষার সূচনা মানুষের অন্তর্নিহিত জিজ্ঞাসা উন্মুক্ত করে সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। ইচ্ছার পালে লাগে পরিবর্তনের ঘ্রাণ, অদম্য সাহসের তেজ জাগ্রত হয় মননের মণিরাম কোঠায়। পরিবর্তন কিংবা বদলের আগ্রহ মানুষকে এক স্তর থেকে নিয়ে যায় অন্য স্তরে। আর এ সংগ্রামের পশ্চাতে মূল শক্তি উৎপাদন করে শিক্ষার অনুষঙ্গ এবং সমাজ রূপান্তরের ভবিতব্য রূপ। বাংলাদেশে শিক্ষার অগ্রগতি সময়ের প্রেক্ষাপটে পরিসংখ্যানের মাপে সন্তোষজনক সংখ্যায় তীর্ণ হয়ে নতুন দিনের আভাসে আলোকিত করছে মানুষের ভাবনার করিডোর। মানুষ আজ বৈশ্বিক দিনলিপিতে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের মূলস্রোত হিসেবে শিক্ষার নৌকায় ওঠার কল্পনা নিয়ে সময়, শ্রম এবং বিনিয়োগে দ্বিতীয় চিন্তার সুযোগ রাখছে না। শিক্ষার জাদু বলতে যা বোঝায় উদাহরণ হিসেবে এটি দৃশ্যমান রসদ।
বাংলাদেশে নারীশিক্ষার অগ্রগতি ও জীবনের গুণগতমান নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ আলোচনাযোগ্য ও দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণীয়। সমাজ-সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পুরুষকুলের একপেশে দৃষ্টির কারণে নারীরা দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার আলো ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে অনুশীলনের অধিকার পেয়েছে। চোখ থাকতেও দৃষ্টির অধিকার নিজের ছিল না। সমাজের মধ্যে পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারীরা নারীর জীবনের পদচারণ ঠিক করে দিত। বৈশ্বিক পরিবর্তনের দোলায় সমন্বিত কর্মসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষায় নারীদের সম্পৃক্তকরণ প্রাথমিক অধিকার হিসেবে গণ্য হয়েছে। বাংলাদেশে নারীরা সমাজের বেঁধে দেওয়া পর্দার গণ্ডি মাড়িয়ে শিক্ষার আলোয় পৃথিবী দেখছে, দেখছে জীবনের অপরূপ প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে বর্তমানে নারী সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ; যা পুরুষ সাক্ষরতার চেয়ে ৪ শতাংশ কম। উল্লেখ্য, শতাংশ কম হলেও অর্জিত শতাংশ অর্জনে নারীকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ সময়, সংগ্রাম এবং অসংখ্য কষ্টের চাদরে মোড়া গল্পের ব্যথাতুর বাঁক। যেখানে চোখের জল, শরীরের ঘাম, জেগে ওঠার তেজ একসঙ্গে স্বপ্ন দেখেছে পরিবর্তন সময়ের দাবি, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার অনির্বাণ ইচ্ছা নারীকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে পেরেছে। সমাজ কিংবা পরিবারও নিরাপদ উপায় হিসেবে শিক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছে।

শিক্ষার সব স্তরে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে আগের তুলনায়। বায়ান্ন বসন্ত পেরিয়ে তেপ্পান্ন বসন্তে এসে বাংলাদেশ ভাবছে কাউকে ফেলে রেখে এগিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত ফল সন্তোষজনক হয় না। বরং সমাজের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় শ্রেণিবৈষম্যের মতো মৌলিক পাপ। মানুষ নারী-পুরুষ হিসেবে বিবেচ্য হলেও উন্নয়নের যাত্রায় সবাই কর্মী অথবা অংশীজন। সবাইকে সম্পৃক্তকরণের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যপূরণ সম্ভব। দেরিতে হলেও শিক্ষায় সমানাধিকার প্রসঙ্গ আন্দোলনের কালিতে দেশের সর্বত্র প্রকাশিত, উচ্চারিত এবং বাস্তবায়নে কর্মচাঞ্চল্য নিয়োজিত।
সমাজের মধ্যে নারীশিক্ষার বিরুদ্ধ মনোভাব ধারণকারী থাকলেও চারপাশে একাগ্র আওয়াজে অপশক্তি নীরব অথবা মানিয়ে নিচ্ছে সমানাধিকারের তেজ। শিক্ষার তাৎপর্য সূর্যের মতো আলোকিত করে সমাজের মধ্যে সৃষ্টি করে দেয় ন্যায়ের পথ, অধিকারের বিস্তৃত পরিসর। আর দাবিয়ে রাখার বিরুদ্ধে একযোগে গেয়ে ওঠে কোরাস। যেখানে পরস্পর সহযোগী, বেঁচে থাকার অপূর্ব বন্ধনে জোরালো পদক্ষেপ মননে শক্তির উত্তাপ ছড়িয়ে ডেকে নিয়ে যায় সবুজ-শ্যামল প্রান্তরে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমাজ বিনির্মাণ ও সামাজিক সাম্যের নিশ্চয়তা বিধানে চিন্তাভাবনা কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির সমতা প্রয়োজন। প্রয়োজন পরস্পরের সহযোগিতা গ্রহণ করা এবং স্বীকৃতি। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে এ মানসিকতা জাগ্রত হয়। সমাজে দীর্ঘদিনের লালিত একপেশে মনোভাব অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে এবং হচ্ছে। পরিবার, সমাজ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নারী-পুরুষ পরিচয়ের ব্যবধান হ্রাস করে সবার ব্যক্তিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নারীশিক্ষা মূল ভূমিকা পালন করে। কারণ সমাজের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের রূপরেখা পরিবারে নারী বিশেষ করে মায়ের মধ্য দিয়ে সন্তানের দিকে প্রভাবিত হয়।
সংখ্যার বিচারে শিক্ষায় নারীর যে পরিমাণ অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায় সেরূপ প্রভাব ও পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। এর পেছনে সমাজের বিদ্যমান কিছু পরিস্থিতি অন্যতম দায়ী। অন্যতম হলো দারিদ্র্য। আর্থিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় থাকা পরিবারে অভিভাবকরা কন্যাসন্তানদের বাল্যবিবাহ দিয়ে দায়মুক্তি খোঁজে। এ ছাড়া কন্যাশিশু বড় করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, অভিভাবকদের দিকনির্দেশনার ঘাটতিসহ সমাজে কিছু মানুষের লোলুপ দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে যথার্থ স্থান প্রদানে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। এখনও বাল্যবিবাহ নামক সামাজিক ব্যাধি জীবনের শুরুতেই অনেক কন্যাশিশুর ব্যক্তিক মর্যাদা ও গুণগত পরিচয় কেড়ে নেয়। অভাবের কাছে পরাজিত হতে হয়। যদি এদের প্রকৃত শিক্ষা দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেত তবে সমাজ বা পরিবার থেকে প্রাত্যহিক অভাব দূর হতো এবং সমাজে নারী নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে আরও সচেষ্ট হতে পারত।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত নারীর এক বড় অংশ নিজেকে ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। অর্থনৈতিক বৈষম্যপূর্ণ সমাজে নারী নিজেকে অর্থ উপার্জন থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে সমাজে নিপীড়িত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায় এবং তা-ই হচ্ছে। নারী পরিবারে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। দেখা গেছে, কর্মজীবী নারীর তুলনায় গৃহিণী নারী বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পরিবারের ব্যক্তি হিসেবে নারী অবস্থান ও মর্যাদা পূর্ণমাত্রায় পাচ্ছে না। কারণ পরিবারে এসব নারী স্বামী কিংবা উপার্জনকারী ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল। নির্ভরশীলতা নানা মাত্রায় মর্যাদার অবমূল্যায়ন নামক পরিস্থিতি ডেকে আনে। গবেষণা বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতার ৬৬ শতাংশ পারিবারিক। এসবে ভুক্তভোগীর মাত্র ১০ শতাংশ আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অন্যরা মেনে নেয় অথবা মানিয়ে নেয়। এর মধ্যে গৃহিণী নারীর সংখ্যাই বেশি। কারণ এসব নারী মনে করে, অভিযোগ করলে দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাবে।
জীবনে নেমে আসবে নির্যাতন কিংবা নির্মম বাস্তবতা। নির্ভরশীল নারী নির্যাতিত হয় বেশি। নারীর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না বাড়লে অর্জিত শিক্ষা নারীর মর্যাদার পরিবর্তন ঘটাবে না।অন্যদিকে পরিবারে অভিভাবকরা কন্যাসন্তানদের তথাকথিত ভালো বিয়ে দেওয়ার জন্য পড়াশোনা করানÑএ ধরনের অভিযোগ হামেশাই পাওয়া যায়। এ বাস্তবতার পরিবর্তন করতে না পারলে নারীর জীবনের গুণগতমান পরিবর্তন সম্ভব হবে না। শিক্ষা সব নারীকে মুক্তির পথ দেখাতে পারছে না। এ নিষ্ঠুর বাস্তবতা প্রতিরোধ করতে না পারলে শিক্ষার আলো সব নারীকে নিরাপদ জীবনের সন্ধান দিতে পারবে না। বাংলাদেশে শিক্ষার বাইরেও নানাবিধ সমাজবাস্তবতা নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
শিক্ষিত নারীকে অর্থ উপার্জনমূলক কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ অপরিহার্য। অন্যথায় সৃষ্টি হবে নির্ভরশীলতা যা ডেকে আনবে সহিংসতা, নির্যাতন-নিপীড়ন, অপমান-অবমানসহ বহুবিধ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। একসময় নারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল নারীকে শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ। এখন সময়ের দাবি হলো অর্থ উপার্জনের সঙ্গে নারীর সম্পৃক্তকরণ। বাংলাদেশে চলমান সব বাস্তবতা অর্থ ও ক্ষমতা দ্বারা প্রভাবিত। এ দুটি বিষয়বস্তু থেকে দূরে থাকলে নারীর অর্জিত শিক্ষা জীবনের প্রত্যাশিত পরিবর্তন ঘটাবে না। সৃষ্টি হবে নানাবিধ সংকট যা জীবন নিয়ে যাবে চূড়ান্ত বেদনার বিপর্যয়ে।
বাংলাদেশে বর্তমানে নারীর শিক্ষার সুযোগের পাশাপাশি অর্থ উপার্জনক্ষম কর্মের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণকেন্দ্রিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সামাজিক আলাপ-আলোচনা ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনবে। মনে রাখা প্রয়োজন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ জানে কীভাবে নারীকে বা দীর্ঘদিনের অবদমিত ব্যক্তিকে দমন করে রাখতে হয়। সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক মুক্তি সবার আগে প্রয়োজন এবং এ মুক্তি অন্যান্য মুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে।
নারীর অবস্থা পরিবর্তনে আরেকটি বড় বাধা হলো নারীর মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য পরস্পর পরস্পরের প্রতি সংবেদনশীল মানসিকতা পোষণ করবে, এ যেমন ঠিক তেমন নারীকে অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার ও সতর্ক থাকতে হবে। নিজ জীবনের প্রকৃত মূল্যায়ন ও যথার্থতা নিরূপণে নারীকে লড়াই করতে হবে। কখনও একা, কখনও সমষ্টিগত। এরূপ মানসিকতা বিশেষ করে সমষ্টিগত লড়াই এখন খুব বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে না; যা সহিংসতাপ্রবণ পুরুষ কিংবা নারীকে দাবিয়ে রাখা মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্যায় আবদার বাড়িয়ে দেয়। সমাজে নারীকে বঞ্চিত করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়। প্রয়োজন শিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতার প্রয়োগ ঘটানো।
লেখক : কবি ও সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়