× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মুদ্রায় বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তন

এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ

প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:০৭ পিএম

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:১১ পিএম

মুদ্রায় বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তন

মুদ্রা হচ্ছে অর্থনীতির প্রধান বিনিময়মাধ্যম। তবে মুদ্রা যে শুধুই বিনিময়মাধ্যম, এমন ভাবনা ভুল। কারণ মুদ্রা হচ্ছে একটি দেশের ঐতিহ্যের অংশ; একটি ভূখণ্ডের ইতিহাস পুনর্গঠনের অন্যতম উপাদান। যেকোনো দেশের মুদ্রা সে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এমনকি ধর্মীয় অবস্থার কথাও বর্ণনা করে। এরই ধারাবাহিকতায় মুদ্রার সাক্ষ্যে বাংলার রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে বিশেষ লেখা...

সুলতানি আমল 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, বখতিয়ার খলজির গৌড় বিজয়ের আগে বাংলায় সেন শাসনামলে কোনো ধাতব মুদ্রার প্রচলন ছিল না। এমনকি সেন-পূর্ববর্তী পাল শাসনামলেও বাংলায় কোনো ধাতব মুদ্রা ছিল না। বাংলা অঞ্চলের জন্য একক জাতীয় মুদ্রানীতির সূচনা সুলতানি যুগে মুসলমানরাই করে; যার শুরু বখতিয়ার খলজি কর্তৃক দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ ঘুরির নামে গৌড় বিজয়ের স্মারকমুদ্রা জারির মাধ্যমে। বাংলার অর্থব্যবস্থায় যা নতুন মাত্রা যোগ করে। শুধু তাই নয়, এ মুদ্রায় স্থানীয় জনগণের ভাষা দেবনাগরী লিপির ভাষ্য ও স্থানীয় সাল ব্যবহার বখতিয়ার খলজির রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেন নতুন শাসককে স্থানীয় জনগণ নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে না করে।

এ পর্বের শুরুটা সুলতানি আমলের শিরোনামে হলেও কয়েক লাইনে প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও একই সুতোয় গেঁথে নিতে চাই পাঠকের সুবিধার্থে। আমাদের বাংলা ভূখণ্ডের রাজনীতি সেই প্রাচীনকাল থেকেই কখনও স্থিতিশীল ছিল না। সম্রাট অশোক, গুপ্ত রাজন্যবর্গ ও শশাঙ্কের শাসনামল পর্যন্ত এ ভূখণ্ডের রাজনীতি জনকল্যাণমুখী থাকলেও পরবর্তী সময়ে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতিতে বাংলা তলিয়ে যায় অরাজকতার যুগে। প্রায় ১০০ বছরের রাজনৈতিক বন্ধ্যত্ব কাটিয়ে বাঙালি নিজেদের দায়িত্ব তুলে দেয় রাজা গোপালের হাতে। ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে রাজা গোপালের বংশ বাংলা শাসন করে প্রায় ৪০০ বছর। এরপর পালদের থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের সেনবংশীয়রা। সেন রাজারা দেড়শ বছরের শাসনকালে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির পতন ঘটিয়ে বাংলায় ডেকে আনেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এ বিপর্যয়ের অবসান ঘটে ১২০৫ সালে বখতিয়ার খলজির গৌড় বিজয়ের মাধ্যমে। সেন শাসকদের অত্যাচারে বর্ণপ্রথা আর শূদ্র অভিধায় কোণঠাসা অতিষ্ঠ সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠী যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন সুলতানরা। সে কারণেই মধ্যযুগের মুসলিম শাসনের ৫৫০ বছরে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে ঘটেনি অবনতি।

ইলিয়াস শাহি সুলতানরা বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা ও স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনার সুবিধার্থে দেশি হিন্দু রাজাদের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতেন। তাদেরই একজন রাজা গণেশ। গণেশ ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও ক্ষমতাধর রাজনীতিক। মুসলিম রাজশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সালতানাতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সফলও হন। তিনি ছিলেন সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের সভাসদ। তার চক্রান্তেই সুলতান নিহত হন। এরপর একে একে মসনদে বসেন সাইফুদ্দিন হামজা শাহ, শিহাবুদ্দিন বায়েজিদ শাহ ও আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ। তারা কেউই বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। এতজন সুলতানের ক্ষমতাকালে রাজা গণেশই ছিলেন বাংলার রাজনীতির একমাত্র নিয়ন্ত্রক। তার ইশারায়ই নিহত হন একের পর এক সুলতান। একপর্যায়ে নিজেই ‘দনুজমর্দন দেব’ উপাধি নিয়ে বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। সালটা ছিল ১৪১৪-১৫। তিনি বাংলার রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। ক্ষমতায় এসেই পূর্ববর্তী মুসলমান সুলতানদের বিরোধিতা করে মুদ্রালিপিতে আরবির পরিবর্তে বাংলা ও হিজরির পরিবর্তে শকাব্দ ব্যবহার করে মুদ্রা জারি করেন। পরিবর্তন করেন টাঁকশাল শহরের নামেরও। হজরত পাণ্ডুয়ার বদলে পাণ্ডুনগর, চট্টগ্রামের স্থলে চাটিগ্রাম এবং হজরত জালাল সোনারগাঁয়ের স্থলে সুবর্ণগ্রাম নামে মুদ্রা উৎকীর্ণ করেন।

ছেলে মহেন্দ্র দেব প্রথম দিকে বাবার অনুকরণে বাংলা লিপিতেই মুদ্রা জারি করেন। তবে গণেশের আরেক ছেলে যদু ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহ উপাধিসহ যে মুদ্রা জারি করেন সেখানে নাটকীয়ভাবে ফিরে আসে আরবি লিপি ও হিজরি সাল। দীর্ঘদিন পর তিনি বাংলার মুদ্রায় পুনরায় কলমা প্রবর্তন করেন। যদু এক ধাপ এগিয়ে নিজেকেই খলিফা ঘোষণা করেন। তার ৮৩১ হিজরির একটি মুদ্রার গৌণ দিকের লিপিভাষ্যে দেখা যায়, ‘খলিফাতুল্লাহ নাসির আল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (আল্লাহর প্রতিনিধি, ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্যকারী)’। 

বাংলার কিছু সুলতানের মুদ্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলিম খেলাফতের সীমানা থেকে বাংলা বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের ক্ষমতা বৈধকরণ অথবা ইসলামি আন্তর্জাতিক রাজনীতিসংক্রান্ত আত্মিক যোগ প্রদর্শনের জন্য কিংবা ধর্মীয় কারণে খলিফার নাম মুদ্রায় ব্যবহার করতেন। যেমন গিয়াসুদ্দিন ইওজ খলজির ৬১৯/১৭, ২১ হিজরির মুদ্রার মুখ্য পিঠে কলমার পর বাগদাদের খলিফার উদ্দেশে ‘আল নাসির আমিরুল মুমিনিন’ কথাটি উৎকীর্ণ হয়েছে। আব্বাসীয় খেলাফতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে ৭৮১ হিজরিতে সুলতান সিকান্দার শাহের মুদ্রার গৌণ পিঠে উৎকীর্ণ হয়েছে ‘ইয়ামিনু খলিফাতুল্লাহ নাসির আমির আল মুমিনিন, গাউসুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন খুল্লিদাত খিলাফাতুহ’ লিপিভাষ্য।

আবার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজের জীবদ্দশায় দেখা যায়, তার দুই ছেলে শিহাবুদ্দিন বুগদা শাহ ও গিয়াসুদ্দিন বাহাদুর স্ব-স্ব নামে মুদ্রা প্রচলনের অধিকার পেয়েছিলেন। মুদ্রায় তারা ‘সুলতান বিন সুলতান’ অর্থাৎ সুলতানের ছেলে সুলতান অভিধা ব্যবহার করতেন। বাবার জীবদ্দশায় ছেলেদের নামে মুদ্রা প্রবর্তনের কারণ বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এটা বিদ্রোহের কোনো ফল নয় বরং বাবার ক্ষমতা আর অধিকার ছেলেদের সঙ্গে সমন্বয় ও ভাগাভাগি। যার ফলে বাবা ও ছেলেদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় রাজ্য অধিকতর শক্তিশালী হয়েছিল এবং বিস্তৃতি লাভ করেছিল।

বাংলার সুলতানরা বহিরাগত হলেও কেউ তাদের জন্মস্থানে ফিরে যাননি। বাংলার সম্পদ নিজের দেশে পাচার করেননি। উল্টো কর্মভূমিকায় তারা হয়ে উঠেছিলেন খাঁটি বাঙালি। নিজেদের মেধা আর বাংলার সম্পদ এ ভূখণ্ডের কল্যাণেই ব্যয় করেছেন; যা সম্ভব হয়েছে একমাত্র জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার ফলেই।

মুঘল আমল

সম্রাট আকবরের সময়ই বাংলায় মুঘল শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রদেশ হিসেবে এ সময় বাংলায়ও শুরু হয় সম্রাট আকবরের হাত ধরে মুঘল মুদ্রার প্রচলন। এসব মুদ্রায় শাসক পরিবর্তনের স্পষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দের পর আকবর মুঘল মুদ্রায় কলমার পরিবর্তে ‘আল্লাহু আকবার জাল্লা জালালুহু’ এবং ‘ইলাহি’ শব্দ উৎকীর্ণ করে মুদ্রা চালু করেন। এ সময় থেকে মুদ্রায় আরবির পরিবর্তে ফারসিতে লেখার প্রচলন হয়। মূলত আকবরের দিন-ই-ইলাহি মতের প্রকাশ ও প্রচারের লক্ষ্যেই মুদ্রায় এভাবে পরিবর্তন আনা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীর আকবরের ‘ইলাহি মুদ্রা’ বন্ধ করে দেন। তার সময়ই ঢাকায় সুবে বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী স্থাপিত হয়। তাই তার নামানুসারেই ঢাকার নামকরণ হয় জাহাঙ্গীরনগর এবং জাহাঙ্গীরনগর টাঁকশালের নামে ঢাকা থেকে মুঘল মুদ্রা জারি শুরু হয়। সম্রাট শাহজাহানের সময় মুদ্রায় পুনরায় কলমা ও হিজরি সাল ফিরিয়ে আনা হয়। আওরঙ্গজেব পুনরায় মুদ্রা থেকে কলমা উঠিয়ে দিয়ে ‘সনেহ জুলুস মায়মানাত মানুস’ (সমৃদ্ধ হোক রাজ্যারোহণের বছর) জাতীয় বাক্য ব্যবহার শুরু করেন।

ইংরেজ আমল

সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে আগমন করে। প্রথম দিকে তারা বেচাকেনা জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য পিণ্ড সঙ্গে করে নিয়ে আসত। পরে তা মুঘল টাঁকশালে পাঠিয়ে মুদ্রা প্রস্তুত করে নিত। তারও পরে ব্রিটিশরা সমকালীন মুঘল শাসকের প্রচলিত মুদ্রার আদলে হুবহু জাল মুদ্রা প্রস্তুত শুরু করে। একপর্যায়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৭১৭ সালে সম্রাট ফররুখশিয়ারের কাছ থেকে মুঘল মুদ্রার অনুকরণে বোম্বে থেকে মুদ্রা তৈরির অনুমতি লাভ করে। অনুরূপভাবে ১৭৪২ সালে কোম্পানি মাদ্রাজ টাঁকশাল থেকে ‘আর্কট’ টাঁকশাল নামে মুদ্রা জারির অনুমতি পায়। তবে ১৭৫৯ সাল পর্যন্ত কোম্পানি বাংলার কোনো টাঁকশাল থেকে মুদ্রা জারির অনুমতি পায়নি। ১৭৬৪ সালে কোম্পানি বাংলার শাসনভার গ্রহণের পাশাপাশি মুদ্রা মুদ্রণের অধিকারও তুলে নেয় নিজ হাতে। কলকাতার টাঁকশাল থেকে ‘মুর্শিদাবাদ’ টাঁকশালের নামে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের নামে জারি করা অনেক মুদ্রা পাওয়া গেছে। ১৮৩৫ সালে মুঘল মুদ্রার ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় থেকে কোম্পানি মুঘল সম্রাটের নাম বাদ দিয়ে সারা ভারতের জন্য ইংরেজি মুদ্রার প্রচলন করে। এ মুদ্রার মুখ্য দিকে রাজা চতুর্থ উইলিয়ামের খালি মাথা এবং ইংরেজিতে WILLIAM IIII এবং গৌণ দিকে EAST INDIA COMPANY লিপিভাষ্য, মুদ্রার মূল্যমান এবং জারির বছর উল্লেখ থাকত। ১৮৫৮ সালে সিপাহি বিদ্রোহের ফলে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে রানী ভিক্টোরিয়া ভারত শাসনের কর্তৃত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় তার মুকুট পরিহিত আবক্ষ চিত্র শোভিত এবং QUEEN VICTORIA মুদ্রিত মুদ্রার প্রচলন করা হয়। ১৮৭৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতসম্রাজ্ঞী উপাধি গ্রহণ করেন। তখন থেকে মুদ্রার নকশায় QUEEN-এর পরিবর্তে EMPRESS শব্দ যুক্ত করা হয়। ১৯১১ সালে ব্রিটিশরাজের সিংহাসনে বসেন রাজা পঞ্চম জর্জ। এ বছরই তার নামে মুদ্রা প্রচলন করা হয়। তবে জারিকৃত এ মুদ্রা ভারতীয় মুসলমানদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। কেননা মুদ্রার গৌণ পিঠে অঙ্কিত ক্ষুদ্র হাতির প্রতিকৃতি দেখতে অনেকাংশে শূকরের সদৃশ ছিল। বিক্ষোভ থেকে মুক্তির জন্য মাত্র এক মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান স্পষ্ট হাতি অলংকৃত নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে সৃষ্ট তামার ঘাটতি মোকাবিলার জন্য ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশরা জারি করে নতুন ধরনের মুদ্রা। অনেক পাতলা ও মাঝখানে ছিদ্রযুক্ত এ মুদ্রা তখন স্বাভাবিক মুদ্রার বিকল্প হিসেবে জারি করা হয়। যা ‘ফুটো পয়সা’ নামে পরিচিত ছিল।

পাকিস্তান আমল

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তানি মুদ্রায় ঘটে বড় ধরনের পরিবর্তন। জরুরি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে ১, ২, ৫, ১০ ও ১০০ রুপি মূল্যমানের নোট পাকিস্তানে প্রথম প্রকাশিত হয়। এসব নোটের জলছাপের সাদা অংশের ওপর ইংরেজিতে Government of Pakistan এবং নিচে উর্দুতে ‘হুকুমাত-ই-পাকিস্তান’ লেখা যুক্ত করে ভারতীয় নোটগুলোকে পাকিস্তানি নোটে রূপান্তরিত করা হয়। শুরুতেই পাকিস্তান আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার পূর্ববঙ্গের জনগণের ভাষা উপেক্ষা করা হয় স্বাধীন পাকিস্তানের মুদ্রায়। জরুরি এসব নোট ছাড়াও পরবর্তীকালের কোনো নোটেই বাংলা ভাষার উপস্থিতি ছিল না। পাকিস্তানি মুদ্রায় প্রথম বাংলা ব্যবহার হয় ১৯৪৯ সালের ১ ও ২ রুপির নোটে; তাও শুধু সংখ্যায় মূল্যমান লেখার ক্ষেত্রে। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের পরে ধাতব মুদ্রায় কথায় মূল্যমান লেখার ক্ষেত্রে বাংলার উপস্থিতি দেখা যায়। তবে সমভিত্তিতে ব্যাংক নোটে প্রথম বাংলার ব্যবহার করা হয় ১৯৬৪ সালে ৫০ রুপি নোটে। যেখানে প্রতিশ্রুত বাণী লিখতে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও স্থান পায়।

তা ছাড়া পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-৭১) অর্থ সচিব বা স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নর ব্যাংক নোটে ইংরেজি অথবা উর্দুতে স্বাক্ষর করতেন। শুধু গভর্নর মাহবুবুর রশীদ ছিলেন ব্যতিক্রম। একই নোটে তার বাংলা ও উর্দু স্বাক্ষর পাশাপাশি উপস্থাপিত হয়েছিল। সম্ভবত বাঙালি হওয়ার কারণেই তিনি পূর্ববঙ্গের মানুষের সংবেদনশীলতা উপলব্ধি করে উর্দুর পাশাপাশি বাংলা স্বাক্ষরও ব্যবহার করেছিলেন। কেননা ’৪৭-এর পর থেকে কোনো গভর্নরই একই নোটে একাধিক ভাষায় একাধিক স্বাক্ষর করেননি। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে তাকে গভর্নর পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

তবে মজার ব্যাপার হলো, যে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার জন্য বাঙালিকে রক্ত পর্যন্ত দিতে হয়েছে, যেখানে এতগুলো প্রাণ উৎসর্গের পরও মুদ্রায় সমভিত্তিতে বাংলার স্থান পেতে গড়িয়েছে ১৯৬৪ সাল; সেই বাংলা ভাষা পাকিস্তানের মুদ্রায় দেখা গেছে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত!

অনেকে মনে করেন, ’৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের পরও বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ফেডারেল রাষ্ট্র কায়েম করবে এমন আশা পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী মনে মনে পোষণ করত। এ কারণে ওআইসি সম্মেলনের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। পরে বঙ্গবন্ধুর শর্ত এবং জাতিসংঘ ও কমনওয়েলথের চাপে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে পাকিস্তান সরকার তাদের বাংলা ভাষায় মুদ্রণ করা শেষ মুদ্রাগুলো বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর অগ্রহায়ণের শেষ বিকালে অভ্যুদয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন করে বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালেই কয়েকটি ধাপে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত ১, ৫, ১০ ও ১০০ টাকার কাগুজে নোট বাজারে ছাড়া হয়। মানচিত্র সিরিজের জরুরি নোটগুলো ততটা দৃষ্টিনন্দন না হলেও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেশবাসী তা সাদরে গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা ছিল বাংলাভাষী দেশটির মুদ্রায় সবকিছুই এ দেশের মানুষের মুখের ভাষা তথা বাংলায় লেখা হবে। তবে নোটগুলোয় ইংরেজি আধিক্য এবং অর্থ সচিব ও গভর্নরের ইংরেজি উচ্চারণের স্বাক্ষর নিয়ে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। অসন্তোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে সরকার এক প্রজ্ঞাপনে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, আগামীতে যেসব নোট বাজারে ছাড়া হবে সেসব নোটে সবকিছুই বাংলায় থাকবে। শুধু ওয়ার্ল্ড মানি মার্কেটের জন্য ন্যূনতম ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হবে। পরে সেপ্টেম্বর ’৭২-এ প্রকাশিত নোটেই তার প্রতিফলন ঘটে। জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ন্যূনতম ইংরেজি ব্যবহার করেই ইংল্যান্ডের ব্রাডবারি ছাপাখানা থেকে নোট ছাপিয়ে আনা হয়।

এর পরই দেশজুড়ে শুরু হয় আরেক গুঞ্জন। ভারত টাকা ছাপিয়ে দেওয়ার নামে বাংলাদেশের অর্থনীতি পঙ্গু করতে প্রচুর জাল টাকা বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। ভারত জাল টাকা ছাড়ুক আর না ছাড়ুক, এ কথা সত্য যে, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নোট মুদ্রণের কারণে সে সময় টাকার নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্যের কিছু ঘাটতি থাকায় ব্যাপক হারে বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভবত তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জাল টাকা বাজারে আসার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ফলস্বরূপ তৎকালীন দেশবাংলা সাময়িকী ‘অর্থমন্ত্রীর জন্য দেশবাংলার উপহার’ শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় অর্থমন্ত্রীর ছবি এবং জাল টাকার ছবি দিয়ে খবরও ছাপে! এ অবস্থায় প্রকাশের এক বছরের মাথায় সরকার বাধ্য হয়ে ভারত থেকে ছাপানো মানচিত্র সিরিজের জলছাপবিহীন নোটসমূহ অচলের ঘোষণা দেয়।

যুদ্ধ-পরবর্তী সদ্যস্বাধীন দেশে জনমানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার জীবন্ত প্রতীক; নিরাপত্তা ও ভরসার প্রতীক। এ কারণে জীবদ্দশায়ই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি স্থান পায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত সেসব টাকা বাজারে খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের ন্যক্কারজনক ঘটনার পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে বাজার থেকে ক্রমেই সেসব নোট অদৃশ্য হয়ে যায়।

দীর্ঘ সেনাশাসনের কবল থেকে দেশ মুক্ত হয় ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ সালের ১০ এপ্রিল যমুনা বহুমুখী সেতুর (বর্তমান বঙ্গবন্ধু সেতু) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। যমুনা বহুমুখী সেতুর নকশা এবং নাম উৎকীর্ণ করে ’৯৪ সালেই তৎকালীন সরকার ৫ টাকা মূল্যমানের ধাতব মুদ্রার প্রচলন করে।

এদিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রায় ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো দেশের ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসে ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় বেশ কয়েকটি নোটে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ফেরত আনে। যমুনা বহুমুখী সেতুর নাম পরিবর্তন করে এ সময়ই নামকরণ হয় ‘বঙ্গবন্ধু সেতু’। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন করেন তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় ‘বঙ্গবন্ধু সেতু উদ্বোধন ১৯৯৮’ লিপিভাষ্য উৎকীর্ণ করে ২০ টাকা অভিহিত মূল্যের স্মারক রৌপ্যমুদ্রা এবং ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের স্মারক নিকেল মুদ্রা ইস্যু করা হয়।

২০০১-এ ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। আবারও দেশের শাসনভার গ্রহণ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোট সরকার। এবারও এ সরকার ক্ষমতায় এসে বাজার থেকে পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিযুক্ত টাকাগুলো তুলে নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাজারে ছাড়া টাকার নকশা থেকে শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি বাদ দিয়ে সেখানে স্মৃতিসৌধের প্রমিত ছবি যুক্ত করে (বাকি নকশা হুবহু রেখে) তা বাজারে ছাড়া হয়। পরে ২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সব মুদ্রায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংযোজন করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালে ২, ৫, ১০০, ৫০০ ও ১০০০ টাকায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি যুক্ত করে সিরিজ নোট বের করে। এরপর ২০১২ সালে অবমুক্ত করে ১০, ২০ এবং ৫০ টাকার নোট। ২০১০ সালে ১, ২ ও ৫ টাকার ধাতব মুদ্রায়ও সংযোজন করা হয় জাতির পিতার আবক্ষ প্রতিকৃতি।

রাজনীতি হচ্ছে একটি দেশের এগিয়ে চলার নিয়ামক। কাজেই রাজনীতিবিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো দেশের পক্ষেই এগিয়ে চলা সম্ভব নয়। ঠিক এ কারণেই একটি দেশের কল্যাণের জন্য সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা থাকা আবশ্যক।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা