মাহফুজ সালেকীন বর্ষণ
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১২:৩৩ পিএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১৮:১৯ পিএম
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরা এশিয়ার অন্যতম সুন্দর দেশ শ্রীলঙ্কা
সিংহল দ্বীপ বা শ্রীলঙ্কাকে বলা হয় 'ভারত মহাসাগরের মুক্তা'। দেশটি ভ্রমণে গেলে এই উপমাকে মোটেও বাড়াবাড়ি বলে মনে হবে না। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ভরা দেশটি এশিয়ার অন্যতম সুন্দর দেশ। কলম্বো, ক্যান্ডি, এল্লা, গল, সিগিরিয়াসহ ১০ দিনের শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ও ছবি পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন মাহফুজ সালেকীন বর্ষণ
কলম্বো কড়চা
কলম্বো থেকে ক্যান্ডিগামী উদরাতা মানিয়েকে এক্সপ্রেসের তৃতীয় শ্রেণির রিজার্ভেশন কামরায় বসে লিখছি। বাইরে দারুণ বৃষ্টি। ২০১৯ সাল থেকে আমাদের বন্ধুদের পরিকল্পনা ছিল শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের। মহামারি আর ব্যক্তিগত দুর্দশার ঘনঘটায় ক্লান্ত জীবনে সময় আর মিলছিল না! এবার তাই হুটহাট সিদ্ধান্তে চলে এলাম রাবণের দ্বীপে। আগের দিন সকালে ছিল চেন্নাই থেকে কলম্বোর ফ্লাইট। শ্রীলঙ্কান যাত্রীদের অনেকেরই বিশাল সব ব্যাগ নিয়ে ‘বন্ধু তুই লোকাল বাসের’ মতো কলরোলে সোয়া ১ ঘণ্টা পর বন্দরনায়েকে বিমানবন্দরে অবতরণ।

ভাগ্যের কী ফের! ইমিগ্রেশন পেরিয়ে ব্যাগেজ ক্লেইম করতে গিয়েই হতভম্ব! সপত্নীক দাঁড়িয়ে আছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেটধারী শৈশবের এই নায়কের সঙ্গে সেলফি-পর্ব শেষে সিম আর ডলার ভাঙিয়ে বেরিয়ে পড়লাম এয়ারপোর্ট থেকে। ট্যাক্সি নিলে গুনতে হবে চার থেকে পাঁচ হাজার শ্রীলঙ্কান মুদ্রা। তাই আমাদের মতো বাজেট ট্রাভেলারদের বাসই ভরসা। এয়ারপোর্ট পুলিশ ও আর্মিদের দেখানো পথে বাসে চড়ে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে শহরের প্রাণকেন্দ্র পেট্টাহতে আসতে ভাড়া পড়ল তিনজনের ৭৫০ এলকেআর। পেট্টাহতে নেমে হাঁটা দূরত্বে আমাদের হোটেল। চেকইন করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম শহরটা ঘুরে দেখতে। গল ফেস গ্রিন বিচ কলম্বো বন্দরকে একপাশে রেখে দীর্ঘ ওয়াকওয়ে ধরে এগিয়ে গেছে।

ওল্ড পার্লামেন্ট ভবন ও প্রেসিডেন্টের অফিস পেরিয়ে হেঁটেই এগোচ্ছি আমরা। পাথুরে ও তীব্র গতিতে আছড়ে পড়া থাকা ঢেউয়ের কারণে বিচে নামা নিষেধ, তবে জনসাধারণের জন্য আছে বেশ কিছু ভিউপয়েন্ট। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে সমুদ্রের পাশ দিয়ে হাঁটছি আমরা, বাসভর্তি করে স্কুলের বাচ্চাদের বেড়াতে নিয়ে এসেছেন শিক্ষকরা, আকাশে উড়ছে কয়েকটা রঙিন ঘুড়ি, বেঞ্চে ছাতা মাথায় গল্প করছে কাপলরা, চমৎকার একটা বিকাল!
বিচ থেকে বাসে চেপে আবার পেট্টাহ। সেখানে শেষ বিকালের লালচে আভায় শতবর্ষী বিখ্যাত জামিউল আলফার মসজিদ ঘুরে পাশেই এক রেস্তোরাঁয় উদরপূর্তি সারলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা ভর করেছে কলম্বোতে। আমাদের চকবাজারের মতোই পরিবেশ এখানে। বিভিন্ন গলিজুড়ে সারিবদ্ধ দোকান, কোলাহল, মানুষের ভিড়। তবে বেশ পরিষ্কার। লোটাস টাওয়ারের রঙিন আলোর রোশনাইতে মুগ্ধ হয়ে ফিরলাম হোস্টেলে। ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো এই ৩৫১ মিটার উচ্চতার টাওয়ারটি বিশ্বে ১৯তম, দেখতেও দৃষ্টিনন্দন! নানা দেশের ট্রাভেলারদের সঙ্গে আড্ডা চলল রাতভর। বাইরে বেরোনোর উপায় নেই, মুষলধারে বৃষ্টি। প্রায় মধ্যরাতে বৃষ্টি থামলে দ্রুত খেয়েদেয়ে আবার ফিরলাম হোস্টেলে। আজ খুব সকালে বের হয়ে ধরতে হয়েছে ক্যান্ডির ট্রেন। আড়াই ঘণ্টার যাত্রায় বেশ গল্প হচ্ছে সহযাত্রী লঙ্কান প্রকৌশলী ফারহান, তার স্ত্রী ও দুই মায়াবী কন্যার সঙ্গে।
ক্যান্ডি কথন
৮ অক্টোবরের সকাল। বেরিয়ে পড়েছি প্রাচীন সিংহ রাজ্য সিগিরিয়ার উদ্দেশে। গতকাল মানে ৭ অক্টোবর, কলম্বো থেকে ক্যান্ডির ট্রেন থেকে নামতেই টুকটুকওয়ালাদের হাঁকডাক। ৩৫০ লঙ্কান রুপিতে টুকটুক ধরে সোজা গেস্ট লজ। পাহাড়ি রাস্তায় বেশ সুন্দর সেই লজে দুরাতে আমাদের ভাড়া পড়েছে ১৮০০ টাকা, জনপ্রতি ৬০০ টাকা।
চেকইন করে ফ্রেশ হয়ে সোজা বাস ধরে চলে এসেছি ক্যান্ডির প্রাণকেন্দ্রে। একটা কনসার্ট হচ্ছে। সেদিকে না গিয়ে আগে পেটপুজো। খাওয়ার পর্ব শেষে অল্প হাঁটতেই মালাবার স্ট্রিটে দুশো পেরোনো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের কুইন্স হোটেল। ব্রিটিশরা ক্যান্ডি রাজাকে হারানোর পর বেশ কিছুদিন সিলনের গভর্নরের বাসভবন ছিল এটি। এরপর ১৮৬৯ সালে কুইন্স হোটেল নামে থিতু হয়। নিচতলার পুরোটা জুড়েই নানা ধরনের দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ। আর ঠিক সামনেই ক্যান্ডি লেক।

পাহাড়ের ঢালে ছিমছাম গোছানো শহর ক্যান্ডি। রেস্তোরাঁ, পানশালা, দোকান, বাড়িঘর কিংবা রাস্তাঘাট সবকিছুতেই উপনিবেশ আমলের ছোঁয়া। হঠাৎ করে ভ্রম লাগে যেন কয়েক দশক আগে ফিরে গেছি। ক্যান্ডি লেকের তীরে বেশ বড় এলাকাজুড়ে ১৫৯৫ সালে নির্মিত টেম্পল অব টুথ শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ এই মন্দিরে গৌতম বুদ্ধের দাঁত সংরক্ষিত আছে- এমনটাই প্রচলিত বিশ্বাস। উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলোর অন্যতম এই মন্দিরে প্রবেশ করতে গেলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শরীর ঢেকে রাখা বাঞ্ছনীয়। টেম্পল অব টুথ দর্শন শেষে আমাদের পরের গন্তব্য বাহিরাওয়াকান্দা মন্দির। পাহাড়ের ওপর থেকে ৮৮ ফুট উঁচু সদ্য নির্বাণ প্রাপ্ত বুদ্ধ যেন পুরো ক্যান্ডি শহরকে দেখছেন নির্বাক হয়ে! ধ্যানমুদ্রায় নির্মিত এই বৌদ্ধ মূর্তিরের যত কাছে যাবেন, যেদিক থেকেই তাকাবেন, মনে হবে শুভ্র চাদরে থাকা বুদ্ধ আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে! অদ্ভুত সুন্দর!

শেষ বিকালে মন্দির থেকে ফিরে নাশতা সারলাম ভিন্টেজ ক্যাফে ‘দ্য বেক হাউসে’। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে দিনজুড়েই। তারপর আশপাশের রাস্তা, অলিগলিতে হেঁটে আর টুকটাক স্যুভেনির কিনে মুসলিম হোটেলেই নৈশভোজ। উপায়ও নেই। ক্যান্ডি কেন, পুরো শ্রীলঙ্কাই রাত ৮টার পর থেকেই নীরব হয়ে যায় নতুন ভোরের গল্প লিখতে! শহরবাসীকে তাই বিরক্ত না করে ৯টার দিকে ফিরেছি হোটেলে।
সিংহ সাম্রাজ্যে
৮ অক্টোবর বেলা ১১টা। বাস সিগিরিয়াতে থামতেই বিপত্তি। নিরাপত্তারক্ষীর কাছে জানা গেল, বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টের মূল কপি ছাড়া প্রবেশাধিকার নেই। ডিজিটাল ভার্সন দিয়েও কাজ হবে না। কিন্তু সাধের পাসপোর্টখানা যে ভুল করে ক্যান্ডির লজেই রেখে এসেছি। তাই মন খারাপ করে এক রোড সাইড সরাইখানায় বসে নুডলস আর ফ্রাইড রাইস খাচ্ছি। তখনই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ঘণ্টাখানেক পর যখন বৃষ্টি থেমেছে, তখন পিদুরাঙ্গালার দিকে এগোলাম অটোতে করে। একই ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে অবস্থিত পিদুরাঙ্গালা রক উচ্চতায় সিগিরিয়ার চেয়ে কেবল ১ মিটার ছোট। এখান থেকেই লায়ন রকের সবচেয়ে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।
প্রবেশমূল্য ১০০০ লঙ্কান রুপি, সিগিরিয়াতে যেটা সার্ক নাগরিকদের জন্য ১৫ ডলার (৪৮০০ লঙ্কান রুপি)। উঠতে নামতে সব মিলিয়ে ১ ঘণ্টার বেশি লাগলেও বড় বড় পাথরের চাঁই আর উঁচু পাহাড়ি পথ বাইতে হয় বলে কিছুটা কষ্টকর। তবে মোটামুটি ফিটনেস থাকলে তেমন সমস্যা হবে না।

‘সিগিরিয়া’ প্রাচীন স্থাপত্যকলার এক অদ্ভুত সুন্দর নিদর্শন, একটা আশ্চর্য বটে! হাজার ফুট উঁচু বিশালকায় এক পাথর, তার ওপরেই তৈরি হয়েছিল রাজা কশ্যপের নতুন প্রাসাদ ও দুর্গ। এই পাথরকে ঘিরে খনন করা হয়েছিল বিশাল সব পরিখা। পরিখা পেরিয়ে পৌঁছানো যেত পাথরের গোড়ায়। পাথর খোদাই করে বানানো হাজার ফুটের সিঁড়ি আর সঙ্গে ছিল বিশাল এক সিংহ তোরণ! বাকি অংশ কালের পরিক্রমায় ধ্বংস হলেও সিংহের দুখানা থাবা আজও টিকে আছে! রাজ পরিবারের মনোরম প্রাসাদ, প্রমোদোদ্যান, ফলের বাগান, দেয়ালে আঁকা অনিন্দ্য সুন্দর চিত্রকর্ম তো ছিলই, সঙ্গে পানির জন্য অত্যাধুনিক পুকুর ও ফোয়ারা। যেন পুরো স্বর্গীয় উদ্যান! আ ইডেন অন দ্য রক! ইতিহাসের পরিক্রমায় একসময় সিগিরিয়া পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হয়। বিশালকায় বন পুরো অঞ্চল ঢেকে ফেলে। বহু বছর পর ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ আর্মির মেজর জোনাথান ফর্বেস পোল্লোনোরুয়ার সফর শেষে ঘোড়ায় চড়ে ফেরার পথে হঠাৎ সন্ধান পান লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা প্রাচীন এই নগরীর। ১৯৮২ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায় শ্রীলঙ্কার এই অষ্টম আশ্চর্য। পিদুরাঙ্গালা থেকে নেমে আবার বাসে করে ফেরা, বৃষ্টির রাতে বাস নষ্ট, তারপর আরেক বাস ধরে ক্যান্ডি ফিরে দারুণ এক ঘুম! কালকে খুব সকালে উঠে ধরতে হবে এল্লার ট্রেন! তাই অ্যাডভেঞ্চারের সমাপ্তি আজকের মতো!
নীল ট্রেনে
লিটল অ্যাডামস পিক থেকে যখন নামছি, তখনই ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছে আশপাশ। এল্লা শহর থেকে খুব কাছেই শতাব্দী প্রাচীন নাইন আর্চ ব্রিজ যাওয়ার রাস্তা শুরু। দুপাশে বন, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠোপথ। মিনিট ১৫ হাঁটার পরই নজরে এলো নাইন আর্চ ব্রিজের একটা ভিউপয়েন্ট। সেখানে দাঁড়িয়ে মাত্র ছবি তোলা শুরু করব, তখনই হাজির স্প্যানিশ জুটি অ্যালেক্স-তানিয়া। গতকাল ক্যান্ডি থেকে এল্লার ট্রেনে পরিচয় হয়েছে ওদের সঙ্গে। ছবি তুলে রেললাইনে নামতেই পেছন থেকে ‘হ্যাল্লো মাই ফ্রেন্ড’ বলে পিঠ চাপড়ে দিয়েছে তরুণ তুর্কি কারানিস। একই ট্রেনে ওর সঙ্গে দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছে আমাদের।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ স্থাপত্যের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এই রেলব্রিজের নিচে দুপাশে চা-বাগান, তার দুপাশে বন। কিছুক্ষণ পরই ট্রেনের হুইসেল। মুগ্ধ নয়নে ব্রিজের ওপর ট্রেন পেরোতে দেখা, তারপর ডাব দিয়ে পিপাসা মিটিয়ে পরের গন্তব্য লিটল অ্যাডামস পিক। প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ ট্রেক করে পিকে উঠতে হয়। পথে পড়বে ‘নাইন্টি এইট একর রিসোর্ট’ আর ফ্লায়িং রাভানা অ্যাডভেঞ্চার পার্ক, যেখানে দেখা মিলবে জিপলাইন, অ্যাবসেইলিং, র্যাপেলিংসহ দারুণ সব অ্যাক্টিভিটি। ‘ওয়েল মার্কড’ এই ট্রেইলে উঠতে-নামতে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। ১১৪১ মিটার উচ্চতার লিটল অ্যাডামস পিকের চারপাশ সবুজের মহাসমারোহ। আরেক বিখ্যাত পিক ‘এল্লা রক’ দেখা যায় পরিষ্কারভাবেই।

গতকাল সাতসকালে তড়িঘড়ি করে ক্যান্ডির লজ থেকে বেরিয়েই টুকটুক ধরে স্টেশন, ৬০০ লঙ্কান রুপিতে রিজার্ভেশনহীন কামরার টিকিট কেটে সেই আকাঙ্ক্ষিত নীল ট্রেনের অপেক্ষা! ট্রেন আসতেই জোর ছুট। যে আগে দখল করতে পারে, সিট তারই। নিরুপায় হয়ে উপমহাদেশীয় কায়দায় তিনটা সিট ব্যাগপেটরাসমেত দখল করে তবেই স্বস্তি! তারপর ৭ ঘণ্টার সেই স্বর্গীয় সফর! একপাশে পাহাড়-টিলা আর অন্যপাশে চা-বাগান বা বিশাল সব গাছে ভরা জঙ্গল। ট্রেন চলছে বনের ভেতর দিয়ে, কখনোবা পাহাড়ি টানেল দিয়ে। মাঝেমধ্যে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম চোখে পড়ছে। আর চমৎকার নির্মল আকাশ! বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ট্রেনযাত্রার একটা বলে খ্যাত এই সফরটায় স্পেন আর তুর্কি বন্ধুদের কথা তো বলেছি আগেই, আরও গল্প হয়েছে ইরান, চেকিয়া, জার্মানি আর ব্রিটেন থেকে আগত পর্যটক দলের সঙ্গে। সন্ধ্যায় ছোট্ট আলোকোজ্জ্বল শহর এল্লার এক ক্যাফেতে গল্প করছি। এল্লা শহরে আজ শেষ রাত। চার দিনের পাহাড়ি-পর্ব শেষে আগামীকাল ছুটব সমুদ্র ছুঁতে। রাবণ দ্বীপের বাকি কটাদিন কাটবে সমুদ্রের সান্নিধ্যে।

মিরিসা হয়ে গল
এল্লা থেকে বাসে করে মাতারায় নেমে টুকটুক ধরে মিরিসা। প্রতিদিন বিকালেই সৈকতে ঝাঁপাঝাঁপির পর মিরিসা আর গলের প্রতিটি রাতই আমাদের কেটেছে পা ছোঁয়ালেই সমুদ্রের পানি এসে ভিজিয়ে দেবে, এমন সব ডেরায়। সাগর পারে ছোট্ট একটা টিলা। পুরোটা জুড়ে কেবল নারকেল গাছের সারি। তিনদিক দিয়ে আছড়ে পড়ছে সাগরের পানি। ইনস্টাগ্রামের রঙিন দুনিয়া মাতিয়ে ফেলা এই জায়গাটা পরিচিত ‘কোকোনাট ট্রি হিল’ নামে। প্যারট রক, সিক্রেট বিচ, মিরিসা বিচ ঘুরে দারুণ সুস্বাদু রেড স্ন্যাপারের বারবিকিউ খেয়ে বিকালে চলে এলাম আমাদের যাত্রার শেষ শহর গলে।

১৫৮৮ সালে পর্তুগিজদের গড়া গল দুর্গকে সতেরো ও আঠারো শতকে সুরক্ষিত ও বিস্তৃত করে ডাচরা। আর সবশেষে ব্রিটিশ আমলেও সংরক্ষিত হয় ৪৩৫ বছর পুরোনো এই দুর্গ। ২০০৪ সালের সুনামিতেও দুর্গের উঁচু ও পুরু দেয়ালের জন্য বেঁচে যায় ইউনেস্কোর এই বিশ্ব ঐতিহ্য। সমুদ্রকে পাশে রেখে চার্চ, মসজিদ, লাইটহাউস, ক্লকটাওয়ার, হোটেল, স্যুভেনির শপ, ক্যাফে, রেস্তোরাঁর সন্নিবেশে চমৎকার সুন্দর এই গল ফোর্ট এলাকা।
ডালাওয়েলা বিচে প্রায় সূর্যাস্তের সময়ে কোকোনাট ট্রি সুইং যখন করছি, নিচে সাগর, ওপরে আকাশ, মনে হচ্ছিল, মুক্ত স্বাধীন পাখির মতো ভাসছি! এরপর আবার সমুদ্রস্নান, তারপর সাগরের তীরঘেঁষা অদ্ভুত সুন্দর ট্রেনযাত্রায় কলম্বো আর ঘরে ফেরার গল্প!