শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৩:১৫ পিএম
পৌষের হিমজড়ানো ভোরে পিঠাপুলির মধুময় আয়োজনের দৃশ্য সূচিশিল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী সংগ্রহ ও ছবি: লেখক
পৌষের শেষ দিন পালিত হয় পৌষপার্বণ। এ সময়ে বাংলার ঘরে ঘরে শোনা যেত ঢেঁকিতে চাল কোটার শব্দ। গ্রামের নারীরা বানাতেন সুস্বাদু নানাবিধ পিঠা। পৌষ আর পিঠাকে তাই সমার্থক বলা চলে। পৌষ পরবের পিঠা নিয়ে বিশেষ লেখা...
পৌষের বেলা শেষ। চারদিকে সমাগত সংক্রান্তির সুঘ্রাণ। ঘরে ঘরে উঠে গেছে নতুন ধান। গাছে গাছে জমছে খেজুরের রস। সে রসে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু গুড়। পৌষের হিমজড়ানো ভোরে তাই পিঠাপুলির মধুময় আয়োজন। নলেন গুড় আর নতুন চালের ধোঁয়াওঠা গরম পিঠার ঘ্রাণে গৃহস্থবাড়ি মাতোয়ারা। সঙ্গে পৌষের গানের আমুদে সুর- ‘পিঠা চিঁড়া ঘর ভরা, গোলা ভরা ধানে, নতুন গুড়ের মিষ্টি দিলাম পৌষপার্বণে’।

পৌষের শেষ দিন পালিত হয় পৌষপার্বণ। পৌষসংক্রান্তিতে সূর্য ধনু রাশি থেকে মকরে সঞ্চারিত হয়। তাই এ দিনটি পঞ্জিকায় ‘মকরসংক্রান্তি’ বা ‘উত্তরায়ণ-সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এ দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশে তিল ও খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে উৎপন্ন চাল থেকে তৈরি পিঠার অর্ঘ্য প্রদান করে। লোকবিশ্বাস, এদিন তিল না খেলে দিন বাড়ে না অর্থাৎ সূর্যের মকরযাত্রা সংঘটিত হয় না। এ কারণে পৌষসংক্রান্তির অন্য নাম তিলুয়াসংক্রান্তি বা পিঠাসংক্রান্তি। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ফসলি উৎসব হিসেবে পরিচিত। কোথাও তিন থেকে চার দিন চলে এ উৎসব। মহাকাব্য মহাভারতেও এ দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন উৎসবের একটি রূপ অদ্যাবধি পিঠাপার্বণের আকারে বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রচলিত। ভোজনবিলাসী বাঙালির চিরায়ত উৎসব এ পিঠাপার্বণ। পৌষ আর পিঠা তাই সমার্থক বলা চলে।
পরব শুরুর আগেভাগেই গৃহকর্তার হাতে ওঠে বাড়তি খরচের ফর্দ। টোনাটুনির পিঠা খাওয়ার গল্পের মতোই চাই চাল-তেল-গুড়। গৃহকর্তাও সব সামলে সময়মতো জোগান দেন পিঠাপুলির রসদ। বাড়ি বাড়ি গুঁড়ি কোটার ধুম লাগে। একসময় পৌষের এ পিঠাপার্বণ গ্রামবাংলায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করত। দু-চার দিন আগেই লেপেমুছে ঢেঁকিশালা প্রস্তুত করা হতো। তারপর রাতভর গুঁড়ি কোটা। পালা দিয়ে এ বাড়ি-ও বাড়ির লোকজন আসত গুঁড়ি কুটতে। ধাপুরধুপুর শব্দে ছুটি নেয় রাতের ঘুম। পৌষপিঠার গুঁড়ি কোটা যেন সুখের যন্ত্রণা! এ প্রসঙ্গে বলা যায় ‘পথের পাঁচালি’র ইন্দির ঠাকরুণের কথা- ‘পৌষ-পার্বণের দিন ঐ ঢেঁকিশালে একমণ চাল কোটা হইত-পৌষ-পিঠার জন্য- চোখ বুজিয়া ভাবিলেই ইন্দির ঠাকরুণ সেসব এখনও দেখিতে পায় যে!’ কালের আবর্তে ঢেঁকি বিলুপ্তপ্রায়। মেশিনে কোটা গুঁড়ি কিংবা আটা-ময়দাতেই চলে পিঠা তৈরি। তবে এখনও কোথাও স্মৃতি হয়ে টিকে থাকা ঢেঁকিঘর পৌষসংক্রান্তি এলে জেগে ওঠে। ঢেঁকির শব্দতালে গৃহবধূর মনে জাগে ভাওয়াইয়া গান- ‘মনটায় মোর পিঠা খাবার চায়’।

পৌষসংক্রান্তির আগের রাতেই শুরু হয় পিঠা তৈরির তোড়জোড়। দাদি-নানিদের সঙ্গে পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন মা, কাকি, মাসিরা। বাড়ির মেয়েরাও দারুণ সঙ্গ দেয় তাতে। একান্তবর্তী বাড়ির হেঁশেলে আনন্দের হাট শুরু হয়। কেউ বড় কোরানি নিয়ে বারকোশ ভর্তি করে নারকেল কুরতে বসে। তারপর সেই নারকেল, পাটালি দিয়ে জ্বাল দেওয়া এক মস্ত কাজ। কেউ উনুনের সামনে বসে ক্ষীর জ্বাল দিচ্ছে, কেউ নারকেলের পুর ভরে পুলি গড়ছে। কাব্যকথায়- ‘সারি সারি হাঁড়ি হাঁড়ি কাঁড়ি করে তোলে/কেহ বা পিটুলি মাখে কেহ কাঁই গোলে।’ ছোট ছেলেমেয়েরা উনুনের পাশে ঘুরঘুর করতে থাকে। চলে পিঠা নিয়ে কাড়াকাড়ি। সঙ্গে মায়ের বকুনি শিশুমনে বাড়ায় উল্লাস। সে এক মনোরম দৃশ্য! কালিমাখা চুলা, অনুজ্জ্বল আলো সব মিলিয়ে আধো-আন্ধার রান্নাঘর যেন সুফিয়া কামালের ‘পল্লী মায়ের কোল’।
মা-দিদিমার হাতে তৈরি হয় একের পর এক সুস্বাদু, কঠিন সব পদ। স্তরে স্তরে সাজানো হয় বাহারি পিঠা। এ যেন ‘উড়ি চেলে গুঁড়ি কুটি সাজাইল পিঠা’। এভাবে রাত জেগে চলে পিঠা তৈরি ও পিঠা খাওয়া। পাড়াপড়শি ও কুটুমের জন্য তুলে রাখতেও ভুল করেন না গৃহকর্ত্রী। সংক্রান্তির শীতভোরে স্নান সেরে শুরু হয় ভেড়ার ঘর পোড়ানো ও আগুন পোহানোর পালা। তারপর পাড়ার ঘরে ঘরে পিঠার স্বাদ নেওয়া। কে কতরকম পিঠা বানাল, কার পিঠার স্বাদ কেমন হলো তা পরখ না করলে চলে? তাই এদিন ঘরে ঘরে হাজির হয় পাড়াবেড়ানো বুড়ি। ভেদ ভুলে এক হয় শিশু-কিশোরের দল। নতুন কুটুমের পাতে পিঠা তুলে দিতে দিতে নারীমনে জাগে গান- ‘আইসো আইসো আইসো কুটুম, লজ্জা কোরো না, আরও আছে খাওয়ার বাকি, উইঠ্যা পোড়ো না’। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘পৌষ পার্বণে’ কবিতার বর্ণনায় তা আরও প্রদীপ্ত-
‘বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ, কুটুম্বের মেলা।/হায় হায় দেশাচার, ধন্য তোর খেলা।’

প্রাচীনকালে পিঠাকে মিষ্টান্নের মধ্যেই ধরা হতো। ‘পিঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ থেকে। আবার ‘পিষ্টক’ এসেছে ‘পিষ্ট’ শব্দ থেকে। পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে লিখেছেন, ‘পিঠা হলো চালের গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ।’ পিঠা তৈরির সাধারণ উপাদান হচ্ছে চালের গুঁড়া, ময়দা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেল। অনেক সময় কিছু কিছু পিঠায় মাংস ও সবজি ব্যবহৃত হয়, যেমন সবজি পুলি, সবজি ভাপা, ঝাল কিংবা মাংস পাটিসাপটা। কোনো কোনো সময় কাঁঠাল, তাল, নারকেল, কলা ইত্যাদি ফল দিয়েও পিঠা বানানো হয়। ওইসব পিঠায় ব্যবহৃত ফলের নামেই এ নামকরণ। পাতায় মুড়িয়ে এক ধরনের বিশেষ পিঠা তৈরি হয়, যাকে পাতাপিঠা বলা হয়। আবার অঞ্চলভেদে পিঠার নামের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। বাংলা ভাষায় লেখা রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং মৈমনসিংহ গীতিকার কাজলরেখা প্রভৃতি কাব্যে পিঠার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিজয়গুপ্ত রচিত মনসামঙ্গলকাব্যে বণিকসুন্দরী যে বিশাল রন্ধনকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন, তার মধ্যেও নানা প্রকারের পিঠার উল্লেখ ছিল। ‘মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস/দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়স/দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ/রন্ধন করিয়া হৈল হরষিত মন।’ মনসামঙ্গলকাব্যে দ্বিজ বংশীদাসের লেখায় সনকার রান্না করা স্বাদু সব পদের মধ্যেও পিঠা বাদ যায়নি। ‘কত যত ব্যঞ্জন যে নাহি লেখা জোখা/পরমান্ন পিষ্টক যে রান্ধিছে সনকা/ঘৃত পোয়া চন্দ্রকাইট আর দুগ্ধপুলি/আইল বড়া ভাজিলেক ঘৃতের মিশালি/। জাতি পুলি ক্ষীর পুলি চিতলোটি আর/মনোহরা রান্ধিলেক অনেক প্রকার।’

কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার গ্রন্থে খুল্লনা চণ্ডীদেবীর আশীর্বাদ লাভ করে স্বামীর তৃপ্তির উদ্দেশ্যে সর্বমঙ্গলা স্মরণ করে যা যা রেঁধেছিলেন তার মধ্যেও পিঠার উল্লেখ আছে। ‘কলা বড়া মুগ সাউলি ক্ষীরমোন্না ক্ষীরপুলি/নানা পিঠা রান্ধে অবশেষে।’ মৈমনসিংহ গীতিকায় যুক্ত রূপকথা কাজলরেখাতেও চন্দ্রপুলি আর রসালো চই চপরি পোয়া দিয়ে সুবর্ণের থালা সাজানোর উল্লেখ মেলে। যেমন ‘নানা জাতি পিঠা করে গন্ধে আমোদিত/চন্দ্রপুলি করে কন্যা চন্দ্রে আকিরত/চই চপরি পোয়া সুরস রসাল/তা দিয়া সাজাইল কন্যা সুবর্ণের থাল/ক্ষীর পুলি করে কন্যা ক্ষীরেতে ভরিয়া/রসাল করিল তায় চিনির ভাজ দিয়া।’
পৌষপার্বণে তৈরি করা হয় এমন উল্লেখযোগ্য পিঠা হলো ভাপা, চিতই, দুধচিতই, কুলি, তেলের পিঠা, মালপোয়া, সমুচা, ফুলপিঠা বা নকশিপিঠা, ঝুরিপিঠা, চুইপিঠা, তালের বড়া, পাটিসাপটা, ছানার মালপোয়া, ম্যারা পিঠা, বিস্কুট পিঠা, সাবুর পিঠা, সুজির পিঠা, চন্দ্রপুলি, জামাইপিঠা, নারকেল পিঠা, ক্ষীরসা ভাপা ইত্যাদি। এসব পিঠার নকশাগুলো খুব আকর্ষণীয়। নকশিপিঠা বাঙালি নারীমানসের ফসল। পিঠার গায়ে বিভিন্ন ধরনের নকশা আঁকা হয়। পিঠাকে যখন এমনি নানা নকশায় রূপ দেওয়া হয় তখন তাকে বলে নকশিপিঠা। গ্রামের নারীদের শিল্পনৈপুণ্যের স্মারকরূপেও পৌষপার্বণের এসব পিঠা বিবেচিত হয়।
পৌষ আসে, পৌষ যায়। রেখে যায় পিঠাপুলির ঘ্রাণ। কোনো এক মাঘের সন্ধ্যায় চায়ের পর্বে স্মৃতি জাগায় বয়ামে তুলে রাখা মায়ের হাতের নাড়ু কিংবা বাসি পিঠা। বাসি খাও, ভাজা খাও, তার কত সুখ। পিঠা থাক, পার্বণ থাক, অমলিন হয়ে থাক পৌষের দিনগুলো। তাই বলি, ‘বাহান্ন পেটটি হয়ো, ঘরে বসে পিঠে খেয়ো/এমন সোনার পৌষ জন্ম জন্ম হয়ো।’