× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কর্মজীবী মা

কোথায় থাকবে আমার সন্তান

আসমাউল হুসনা

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৬:০০ পিএম

ডে কেয়ার সেন্টারে খেলায় মশগুল শিশুরা	ছবি : কেয়ার ফর চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট

ডে কেয়ার সেন্টারে খেলায় মশগুল শিশুরা ছবি : কেয়ার ফর চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট

বর্তমান সময়ের শহরবাসী কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সন্তানদের দেখভালের বিষয়ে থাকেন চিন্তিত। ছোট পরিবারগুলোই এ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী। শিশুর যত্ন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা ডে কেয়ার সেন্টার। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বেসরকারি উদ্যোগ নিয়েও নেই যথাযথ প্রচার। এ বিষয়ে বিস্তারিত...

কেস স্টাডি-১

সাড়ে তিন বছর বয়সি আরাফ, পরিবারের সঙ্গে থাকে নারায়ণগঞ্জে। তার বাবা রিকশাচালক, মা গৃহপরিচারিকা। জীবিকার তাগিদে সকাল হতে না হতেই তারা বেরিয়ে যান নিজ নিজ কাজে। ছোটবেলা থেকে আরাফের দেখাশোনা খালার দায়িত্বে থাকলেও তার বিয়ে হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে হয় বাবা-মাকে। কিছুদিন প্রতিবেশীদের দায়িত্বে ছিল সে, কিন্তু তা-ও নিরাপদ ছিল না। ছোট আরাফকে দেখভাল করার মতো কেউই ছিল না বাসায়। এমনিতেই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার; নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা, তার ওপর কাজে না গেলে সংসারের উপার্জন হবে না। আরাফের বাবা-মায়ের পক্ষে কাজ ছেড়ে দেওয়া অথবা তাকে দেখাশোনার জন্য কাউকে রাখাও সম্ভব ছিল না। এমন সংকটাপন্ন সময়ে একজন পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে খোঁজ পান শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের। জেলা মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতাধীন এ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটির মাসিক বেতন মাত্র ১০০ টাকা হওয়ায় তাদের খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রটি। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও বিকালের নাশতা সেখানেই করে আরাফ। এ ছাড়া আছে খেলাধুলার সুযোগ। খাবার ও নিরাপত্তার কোনো সমস্যা না থাকায় আরাফের বাবা-মাও নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন। বিকালে কাজ শেষে মা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।

কেস স্টাডি-২

দুটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন গুলশানের মামুন-নাসিমা দম্পতি। মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে তাদের সন্তান নাফিজার দেখাশোনা নিয়ে পড়েন বিড়ম্বনায়। ছোট শিশুটিকে দেখার মতো পরিবারে কেউ ছিল না। তাই একজন গৃহকর্মী নিয়োগ দেন বাচ্চার দেখাশোনার জন্য। কিছুদিন পর সেই গৃহকর্মী টাকা-স্বর্ণালংকার চুরি করে পালিয়ে যায়। আবারও একজনকে পেলেও ফল আগের চেয়ে ভিন্ন ছিল না। মামুন-নাসিমা তখন চাইল্ড ডে কেয়ার সেন্টারের খোঁজ করতে থাকেন। বেশ কয়েকটি ঘুরে পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন দীর্ঘদিন। এদিকে অফিস থেকে ঘন ঘন ছুটি নেওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। নাফিজার যখন দুই বছর বয়স, বাবা-মা আর কোনো উপায় না পেয়ে সিদ্ধান্ত নেন তাকে ডে কেয়ার সেন্টারে রাখবেন। গুলশানের একটি বেসরকারি ডে কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করে দেন নাফিজাকে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সেখানেই থাকে সে। এখন নাফিজার বয়স চার বছর। এ দুই বছরে নাফিজার নিরাপত্তা নিয়ে একদমই ভাবতে হয়নি। সময়মতো খাওয়াদাওয়ার পাশাপাশি প্রি-স্কুলিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে সেখানে। এ ছাড়া ডে কেয়ার সেন্টারটিতে রয়েছে একজন স্বাস্থ্যকর্মী, যিনি সবার সুস্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখেন।

কেস স্টাডি-৩

রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা উম্মে সালমা। ছয় বছর বয়সি কন্যাসন্তানের মা সালমার ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে ক্যারিয়ার গড়ার। অনার্স পড়ার সময় বিয়ে, তার পরই সন্তান। এর মাঝে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারলেও চাকরির জন্য বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তার। চাকরি করলে দিনের বেশিরভাগ সময় কাজ ও অফিস নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে। বাইরে গেলে সংসার কে সামলাবে আর সন্তানের দেখাশোনাই বা করবে কে। সন্তানের কথা ভেবে ভুলেই গেলেন নিজের স্বপ্নের কথা। সন্তান বড় হলেও এখন আর ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবার সাহস পান না।

আমাদের সমাজে সন্তানের কথা ভেবে নিজের স্বপ্ন উৎসর্গ করা মায়েদের এমন অনেক গল্পই আছে। একটা সময় ছিল যখন নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করার কথা ভাবতেই পারতেন না। সে সময় বদলেছে, বর্তমানে নারীরাও বিভিন্ন পেশায় কর্মজীবন গড়ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে হয়েছে ৪২ দশমিক ৬৮ শতাংশ, যা পাঁচ বছর আগে ছিল ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ। আর শহরের কথা যদি বলি, দেশের শহরাঞ্চলে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজে সংসার ও সন্তান সামলানোর গুরুদায়িত্ব বর্তায় নারীর ওপর। একদিকে নিজের কাজ,  অন্যদিকে সংসারÑ দুটোই নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারীরা অনেক সময় সংসার ও সন্তান সামলানোর জন্য নির্ভরশীল হন গৃহকর্মীর ওপর। গৃহকর্মীর দ্বারা সন্তান অত্যাচারিত হয়, এমন তথ্যও আছে। বিশেষ করে কন্যাসন্তানের জন্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন বাবা-মা।

কর্মজীবী মায়েরা সারা দিন অফিস সামলে বাড়ি এসে ঘরের কাজ ও সন্তানের পড়াশোনা সব একা হাতে সামলাতে হয়। অফিস, বাড়ি, সন্তান মিলিয়ে একটা পর্যায়ে হাঁপিয়ে ওঠে জীবন। এজন্য আছে একটাই উপায়, ডে কেয়ার সেন্টার।

কর্মজীবী বাবা-মায়েদের জীবন সহজ ও সন্তানের লালনপালন নিশ্চিত করতে ১৯৯১ সালে সর্বপ্রথম ডে কেয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১৯ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০টি ডে কেয়ার সেন্টার রয়েছে; যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

নারীদের কর্মজীবন আরও সহজ করতে জেলা পর্যায়ে ৬০টি ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে কর্মজীবী মায়েদের শিশুরা (ছয় মাস থেকে ছয় বছর) নিরাপদ দিবাকালীন সেবা দেওয়া হবে। প্রতিটি ডে কেয়ারে ৫০ থেকে ৮০টি শিশু থাকবে। শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়াও শিশুর জন্য ডে কেয়ার সেন্টারে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। 

সরকারি মাধ্যমে এ সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। রাজধানীসহ অন্যান্য জেলায় বেসরকারি যত ডে কেয়ার সেন্টার আছে, তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানও নেই। সরকারি ডে কেয়ারের তুলনায় বেসরকারি মাধ্যমেই ভরসা বেশি অভিভাবকদের।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সুপার কিডস ডে কেয়ার সেন্টারে কাজ করেন আজুবা পারভিন। তিনি বলেন, ‘কর্মজীবী বাবা-মায়েদের জীবন সহজ করতে ও শিশুদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয় সেন্টারটি। এখানে শিশুদের খাবারসহ সারা দিনের প্রয়োজনীয় সব সেবা প্রদান করা হয়। ছয় মাস থেকে ১২ বছর পর্যন্ত শিশুদের রাখার ব্যবস্থা আছে। খেলাধুলা, পড়াশোনাসহ বিনোদনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

দুঃখের বিষয় হলো, এখনও অনেক বাবা-মায়ের ডে কেয়ার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক সময়ই তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন। ডে কেয়ার সেন্টার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়েও তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। প্রতিষ্ঠানের কথা শুনে ভাড়া বাড়িয়ে দেন কয়েক গুণ। অন্যদিকে অনেক বাবা-মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক খরচগুলো সম্পর্কেও ধারণা নেই। রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি ডে কেয়ার সেন্টারের পরিবেশ সম্পর্কে খোঁজ নিতে গেলে কর্তৃপক্ষ তা এড়িয়ে যায়।

কর্মজীবী বাবা-মায়ের শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টারের গুরুত্ব সম্পর্কে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, ‘একটি শিশুর স্বাভাবিকভাবে বড় হতে প্রয়োজন বড়দের সংস্পর্শ। দিন দিন আমাদের পরিবারগুলো ছোট হয় আসছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে ব্যস্ততা। নেই খেলাধুলার যথেষ্ট সুযোগও। এক্ষেত্রে ডে কেয়ার সেন্টারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন বয়সের একাধিক শিশু একসঙ্গে বেড়ে ওঠায় তাদের মস্তিষ্ক বিকাশ ঘটার সুযোগ থাকে। বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে হয় বলে শিশুদের জড়তা কেটে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।’

মেখলা সরকার আরও বলেন, ‘ডে কেয়ার সেন্টার কর্মজীবী মায়েদের জীবন করেছে সহজ। অনেক সময় বাচ্চা গৃহকর্মীর কাছে রেখে অফিসে গেলেও নানানরকম দুশ্চিন্তা তার মনে ঘুরপাক খায়। বাড়ি এসে তার পড়াশোনাসহ বিভিন্ন বিষয় দেখতে হয়। যার প্রভাব পড়ে মা ও সন্তানের সম্পর্কে। সারা দিন বাসায় বাচ্চাটি একাকিত্বে ভোগে। আর ডে কেয়ার সেন্টার শিশুদের কিছু দায়িত্ব পালন করে বলে বাসায় এসে তাদের খুব একটা কষ্ট করতে হয় না।’


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা