বিজয় স্মারক : যশোর
হোসনে আরা হ্যাপি
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৫:৩৭ পিএম
আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৬:১৩ পিএম
যশোরের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘বিজয়-৭১’ এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে শহরের পালবাড়ি মোড়ে
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বিজয়ের এই মাসে থাকছে দেশজুড়ে বিজয়ের স্মারক নিয়ে আয়োজন। যে কেউ ঘুরে আসতে পারেন এসব ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো থেকে। আজ রইল যশোর জেলার উল্লেখযোগ্য বিজয়ের স্মারক নিয়ে দ্বিতীয় পর্ব।
মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত ডিজিটাল শহর যশোর। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সম্মিলিত আক্রমণে টিকতে না পেরে যশোর সেনানিবাস থেকে খুলনায় পালিয়ে যায় পাক সেনারা। বিজয়ের মাটিতে উড়ানো হয় প্রথম পতাকা। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র ও কলেজ প্রাঙ্গণে স্থাপিত হয়েছে ভাস্কর্য ও ম্যুরাল।
পালবাড়ি মোড়ে ‘বিজয়-৭১’ ভাস্কর্য
পালবাড়ি মোড় এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে শহরের সবচেয়ে বড় ভাস্কর্যটি। বিজয়ের অনেক বছর পর নির্মাণ হলেও, স্মৃতির অমরতা প্রকাশ করা হয়েছে ভাস্কর্যে। বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উড়িয়ে এগিয়ে চলছেন মুক্তিযোদ্ধা। শক্ত মুষ্টিতে পতাকার ঝান্ডা গভীর মমতায় বুকের সঙ্গে আলিঙ্গন। ডান কাঁধে তার ঝোলানো রাইফেল। তারই বাঁ পাশে রাইফেল হাতে আরেক মুক্তিযোদ্ধা। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা গর্বিত সেই যোদ্ধার চোখ আকাশপানে। পাশেই রাইফেল ও হেলমেট উঁচিয়ে উল্লসিত আরও দুই মুক্তিযোদ্ধা। তাদের একজনের খালি পা, পরনে লুঙ্গি। ত্রিভুজ আকৃতির বেদির ওপর ভাস্কর্যের আরেক দিকে দুহাতে শান্তির পায়রা উড়িয়ে যুদ্ধ শেষে আগামী দিনের শান্তির বার্তা আকাশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এক নারী। এই উল্লাসে তাদের সঙ্গে শরিক গুলতি হাতে এক দুরন্ত কিশোরও। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘বিজয়-৭১’ এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে শহরের পালবাড়ি মোড়ে। যশোরের এস এম সুলতান আর্ট কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ খন্দকার বদরুল আলম নান্নুর হাতের পরশে ভাস্কর্যটি এখনও ছড়াচ্ছে দীপ্তি।

স্বাধীনতার মুক্ত মঞ্চ
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর যশোর টাউন হল ময়দানে স্বাধীন বাংলার অস্থায়ী সরকারের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। হানাদার মুক্ত বাংলার প্রথম এ জনসভায় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বক্তব্য রাখেন। যে মঞ্চে এই জনসভা হয়েছিল সেটি ঐতিহাসিক স্বাধীনতা উন্মুক্ত মঞ্চ হিসেবে পরিচিত।

চেতনায় চিরঞ্জীব
সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয় কলেজে স্থাপিত হয়েছে ‘চেতনায় চিরঞ্জীব’। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে কলেজ থেকে অংশ নেওয়া শিক্ষক, শিক্ষার্থীর যারা যুদ্ধে শহীদ হয় তাদের স্মৃতিতে নির্মাণ হয় এই ভাস্কর্যটি। ভাস্কর্যটি চারুপীঠের অধ্যক্ষ মাহবুব শামীম নির্মাণ করেন।

যশোরের বধ্যভূমি
দেশের অন্যতম বধ্যভূমি যশোরের শঙ্করপুর হাঁস-মুরগির খামার। এ হাঁস-মুরগির খামারটি আইয়ুব খানের শাসন আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বধ্যভূমিতে একাত্তরে বিহারিরা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। স্বাধীনতার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী এখান থেকে কয়েক ট্রাক হাড়-কঙ্কাল সরিয়ে নিয়ে গেছে। ১৯৯২ সালে স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা এই বধ্যভূমির পাশে একটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তি নির্মাণ করে।

যবিপ্রবিতে অদম্য ১৯৭১
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য হচ্ছে ‘অদম্য ১৯৭১’। সংক্ষেপে 'অদম্য ৭১' নামে সকলের নিকট সুপরিচিত। সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভাস্কর্যটি শিল্পী মোজাই জীবন সফরি নির্মাণ করেন এবং ২০১৩ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তথ্যমতে, ভাস্কর্যটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ও একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরছেন। ভাস্কর্যটির কম্পাউন্ডের দৈর্ঘ্য ২৬ ফুট। ২৬ ফুট কম্পাউন্ডের দৈর্ঘ্য দ্বারা মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চকে বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া ভাস্কর্যটির বেদিসহ মোট উচ্চতা ২১ ফুট । ২১ ফুট দ্বারা মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে বোঝানো হয়েছে। বেদিসহ দণ্ডয়মান ফিগারের উচ্চতা ১৬ ফুট । এর দ্বারা ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসকে বোঝানো হয়েছে।