মো. মাসুদ
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ১০:৩০ এএম
গণিত শেখার প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাথট্রনিক্স’ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা গণিত শেখার প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাথট্রনিক্স’ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তাদের স্বপ্ন এখন বিশ্বজয়ের।
বাংলাদেশের শিক্ষা প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ে ফিনল্যান্ডভিত্তিক সেবামূলক সংস্থা ‘হান্ড্রেড অ্যান্ড এডটেক হাব’ গবেষণা করে ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের ১৬৮টি প্ল্যাটফর্ম থেকে শীর্ষ ১৫টি প্ল্যাটফর্মকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে গণিত শেখার প্ল্যাটফর্ম ‘ম্যাথট্রনিক্স’ স্থান করে নেয়। তা ছাড়া সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইইই বিভাগে আন্তঃবিভাগ স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নও হয় ম্যাথট্রনিক্স।
আলভি আহমেদ ও বৃষ্টি ফারজানা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় গণিত পড়ানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। বিভিন্ন কোচিংয়ে গণিত পড়াতেন তারা। কোচিংয়ে ক্লাস নিতে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান বা অন্যান্য বিষয়ের মতো গণিতের জন্যও নির্ধারিতসংখ্যক ক্লাস রাখা হয়েছে। এত কম সময়ে ভালোভাবে গণিত বোধগম্য না হওয়ায় অভিভাবকরা বিপাকে পড়েন। বাধ্য হন আলাদা গণিতের শিক্ষক রখতে। যার জন্য আলাদা খরচ গুনতে হয় অভিভাবকদের। অনেক অভিভাবক বাড়তি খরচ করতে অপারগ।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা সাধারণ গণিতের ফর্মুলা মুখস্থ করে অঙ্ক করেন। কিন্তু সেটাকে যদি বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে পড়ানো হয় তাহলে খুব সহজেই শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হবে। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। অভিভাবকদের আলাদা গণিত শিক্ষক রাখার কষ্ট দূর এবং শিক্ষার্থীরা যেন আনন্দের সঙ্গে ম্যাথ শিখতে আগ্রহী হয় এমন একটি চিন্তা থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে ম্যাথট্রনিক্স। এ যাত্রায় আলভি ও বৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হন একই বিভাগের বাকি তিন সহপাঠী। তারা হলেন জ্যোতি চাকমা, আরমান হোসাইন ও সৈয়দ মমশাদ আহম্মদ। আগে থেকেই ওয়েবসাইটের কাজ জানতেন জ্যোতি। আরমান থ্রি ডি অ্যানিমেশনের কাজ করছিলেন। এ যেন শাপে বর। সবাই মিলে নেমে পড়েন ম্যাথট্রনিক্সের মহাযজ্ঞে।
ম্যাথট্রনিক্সের নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। যেখানে তাদের যাবতীয় কনটেন্ট আপলোড করা হয়। এ ছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব ও লিংকডিনে আলাদা প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ইউটিউবে ম্যাথট্রনিক্স ১ লাখ ২৬ হাজার সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। তাদের উদ্ভাবনী পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে অ্যানিমেটেড গল্পে গণিত শেখার মনোমুগ্ধকর সিরিজ, যেখানে শিক্ষার্থীরা গণিতের বাস্তবধর্মী প্রয়োগ দেখতে পায়। তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন প্রায় ১ লখের বেশি শিক্ষার্থী গণিত শিখছে।
প্ল্যাটফর্মটির সহপ্রতিষ্ঠাতা বৃষ্টি ফারজানা বলেন, ‘আমরা সচরাচর নিয়মে ম্যাথ শিখি। শিক্ষার্থীরা জানেই না এটা বাস্তবিক জীবনে কীভাবে করে বা করবে। আমরা শিক্ষার্থীদের চিন্তার জগৎটার প্রসার ঘটাতে চাই। একটা বিষয় যখন অ্যানিমেশনের সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করব, তখন সে খুব সহজেই গ্রহণ করবে। এর মাধ্যমে তার ভেতরের ভয়টাও কেটে যাবে। আমরা থ্রি ডি অ্যানিমেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ম্যাথের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করছি।’
সম্প্রতি ক্যালকুলাস টিউটর নামে একটি বইও লঞ্চ করে ম্যাথট্রনিক্স। পুরো বইটাই ক্যালকুলাস ম্যাথের ওপর ভিত্তি করে বানানো। বইটিতে আলোচিত টপিকগুলোর ভিডিও লেকচারও ইউটিউবে আপলোড করছে ম্যাথট্রনিক্স।
প্ল্যাটফর্মটির আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা আলভি আহমেদ বলেন, ‘যখন একজন শিক্ষার্থী ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে তখন ক্যালকুলাস ম্যাথের ওপর দক্ষতা থাকা আবশ্যক। তা ছাড়া ফিজিক্স বোঝার জন্য এটার বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীরা সাধারণ বইয়ের অনেক চ্যাপ্টার মিস করে; যা তাদের পরীক্ষার হলে কনফিডেন্স কমিয়ে দেয়। বইটির মাধ্যমে আমরা শিক্ষার্থীদের ভীতি দূর করার চেষ্টা করেছি। তা ছাড়া খুব স্বল্পমূল্যে একজন শিক্ষার্থী টপিকগুলো জানার পাশাপাশি এর ভিডিও লেকচারও ইউটিউবে পাচ্ছে।’
এসএসসি, এইচএসসি ও অ্যাডমিশন টেস্টের ম্যাথের সব কোর্স নিয়ে কাজ করছে ম্যাথট্রনিক্স। স্কুল পর্যায়ের সিলেবাস চেঞ্জ হওয়ার দরুন আপাতত এটার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে ‘জিআরই’ কোর্স চালুর পরিকল্পনা আছে প্রতিষ্ঠাতাদের। সাধারণ বইয়ে যেসব চিত্র থাকে তা অধিকাংশের বোধগম্য হয় না। সেই সমস্যা সমাধানেও কাজ করবে ম্যাথট্রনিক্স। তারা এমন একটি অ্যাপস তৈরির কাজ করছে যার সাহায্যে অতি সহজেই চিত্রটি শিক্ষার্থীদের বোধগম্য হবে। অ্যাপসে এমন একটি ফিচার থাকবে যেটি স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গে চিত্রের থ্রিডি ভিজুয়ালেশন করে দেবে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ম্যাথ নিয়ে কাজ করার প্রচেষ্টা আছে তাদের। অদূর ভবিষ্যতে তৈরি করা হবে ম্যাথের গ্লোবাল কমিউনিটি। প্ল্যাটফর্মটির সহপ্রতিষ্ঠাতা আলভি আহমেদ বলেন, ‘আমরা যদি কনটেন্টগুলো ইংরেজিতে তৈরি করি তাহলে দেশের বাইরের অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে পারব। যার মাধ্যমে গ্লোবালি একটি কমিউনিটি তৈরি হবে; যেখানে ডেডিকেটেড একটা ম্যাথ প্ল্যাটফর্ম থাকবে।’