তানিয়া আক্তার
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৪৮ পিএম
দেশের ৬০ লাখের বেশি মানুষ কর্মরত রিটেইল বা খুচরা খাতে
বাবা-মা, এক ভাই ও এক বোন নিয়ে ছিল খুলনার রুমানা খাতুনের জীবন। শৈশব থেকেই দেখেছেন পরিবারের আর্থিক টানাপড়েন। রুমানার বাবা যখন তাদের ছেড়ে চলে যান, অর্থনৈতিকভাবে আরও অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় পরিবারটি।
জীবনযাপনের খরচ নির্বাহে মায়ের সঙ্গে রুমানারা একটি খাদ্য প্রস্তুতকারী কারখানায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু লেখাপড়ার স্বপ্ন থেকে পিছপা হননি রুমানা। চালিয়ে যান পড়াশোনা। এসএসসি পরীক্ষার পর পরিবার থেকে যখন লেখাপড়া বন্ধ করার চাপ আসে, দমে যাননি রুমানা। বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে এবং শিক্ষকদের সহায়তায় পার হন উচ্চ মাধ্যমিকের ধাপ। এরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন শুরু করেন। অভিজ্ঞতা না থাকায় কোথাও চাকরি হচ্ছিল না। তখন একটি ফ্যাশন হাউসে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও সেখানেও থিতু হতে পারেননি রুমানা। হতাশার এই সময়ে আলোর দেখা মেলে ব্র্যাকের একটি প্রশিক্ষণে। প্রতিষ্ঠানটির স্কিলস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (এসডিপি) অধীনে খুচরা খাত তথা রিটেইল সেক্টর বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি রুমানাকে। বর্তমানে তিনি প্রসাধনী ব্র্যান্ড ‘গোল্ডেন রোজ’-এ কাজ করছেন বিক্রয়কর্মী হিসেবে। এ প্রশিক্ষণ ও চাকরি তার আর্থিক স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
সিলেটের তরুণী বাবলি বেগমের জীবনসংগ্রামের গল্প আরও কঠিন। ২০১৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে পুরো পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। ফলে বাধ্য হয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে চাকরি নেন একটি এনজিওতে। সেই প্রতিষ্ঠানও বন্ধ হয়ে গেলে বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠালাভের চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু অপর্যাপ্ত মূলধন ও যথাযথ প্রশক্ষণের অভাবে সফল হতে পারছিলেন না। মানসিকভাবে যখন ভেঙে পড়েছিলেন তখন বাবলিকে পথ দেখায় ব্র্যাকের খুচরা খাত বিষয়ক প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাবলি হয়েছেন আত্মবিশ্বাসী। এখন নিজেই একটি দোকান চালান, যার মাধ্যমে হয়েছেন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন দেখতেও এখন নেই মানা।
২০২০ সালে খুচরা বিক্রি বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে ব্র্যাক। দুই মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি বেকার বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি চাকরি পেয়েছেন।

একইভাবে খুচরা খাতে (রিটেইল সেক্টর) প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন খাগড়াছড়ির মেয়ে শামীমা পারভীন। ঢাকায় এসে চাকরির খোঁজে সিভি জমা আর ইন্টারভিউ দিতে দিতে যখন হয়রান, তখন খোঁজ পান ব্র্যাকের এ প্রশিক্ষণের। কালবিলম্ব না করে যোগ দেন। দুই মাস এখান থেকে বিক্রয়কর্মী হিসেবে প্রশিক্ষণে শিখেছেন নানা বিষয়; যা তাকে করে তুলেছে দারুণ আত্মবিশ্বাসী। শামীমা বর্তমানে কাজ করছেন ‘আর্টিসান’ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে।
আশিকুর রহমান সানীর গল্পও ভিন্ন কিছু নয়। স্বপ্ন দেখতেন ক্রিকেটার হওয়ার। রাতদিন ব্যাটবল নিয়ে সময় কাটত তার। কিন্তু অসুস্থতার কারণে ক্রিকেট ছাড়তে হয়। এর মধ্যে বিশ্বজুড়ে হানা দেয় কোভিড মহামারি। সানীর বাবা চাকরি হারান। আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ে গোটা পরিবার। বিভিন্ন জায়গায় কাজের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে প্রশিক্ষণ নেন ব্র্যাকের কর্মসংস্থান প্রোগ্রামে। সফল প্রশিক্ষণ শেষে সানী এখন দেশসেরা একটি চেইনশপের আউটলেটের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে খুচরা খাত অন্যতম। দেশের ৬০ লাখের বেশি মানুষ এ খাতে কর্মরত। এ খাতে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ব্র্যাক। এটি বাংলাদেশের প্রথম খুচরা বিক্রয় প্রশিক্ষণ মডিউল, যা সরকারের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এতে গত তিন বছরে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ৫ হাজার ৪০০ জন; যার ৬০ শতাংশ নারী এবং ৬ শতাংশ প্রতিবন্ধী।
ব্র্যাকের এ প্রশিক্ষণে স্বাবলম্বী আবিদা সুলতানা, মনিকা আক্তার বন্যা, ইমন রানা, জুঁই আক্তারসহ হাজারো তরুণ-তরুণীর জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই রকম। তাদের কর্মমুখী করে তোলার মাধ্যমে জীবনে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেওয়ার পাশাপাশি স্বপ্নের পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করছে ব্র্যাকের খুচরা খাতের এ প্রশিক্ষণ।