শূন্য সাগর
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৩১ পিএম
জুকো ভ্যালিতে যাওয়ার পথে নজরে আসে মনোমুগ্ধকর কোহিমা গ্রামের দৃশ্য ছবি : লেখক
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪৫২ মিটার ওপরে অবস্থিত এই ভ্যালি, যা তার প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জন্য বিখ্যাত। শোনা যায় এই ভ্যালিতে যে ফুল ফোটে তা নাকি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। লিখেছেন শূন্য সাগর
ছবির মতো সুন্দর জুকো ভ্যালি নাগাল্যান্ডে অবস্থিত এক মনোহারী অঞ্চল। অঞ্চল না বলে উপত্যকা বলাই ভালো। রঙবেরঙের ফুলেল কার্পেটে ঢেকে থাকা এই উপত্যকার মূল সৌন্দর্য। প্রকৃতির মাঝে নির্জনতার সন্ধানে ঘুরে আসতে চাইলে দেখে আসুন নাগাল্যান্ড ও মণিপুরের সীমান্তে অবস্থিত জুকো উপত্যকা। ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এই ভ্যালি, মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের সীমানাজুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪৫২ মিটার ওপরে অবস্থিত এই ভ্যালি, যা তার প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জন্য বিখ্যাত।
শোনা যায় এই ভ্যালিতে যে ফুল ফোটে তা নাকি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তবে সে ফুল সারা বছর থাকে না, শুধু বর্ষার সময়েই দেখা যায়। জনশ্রুতি আছে, জুকো শব্দটি মূলত আংগামীদের ভিশেমা উপভাষা থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রাণহীন এবং নীরস। ভিশেমাদের পূর্বপুরুষরা নতুন গ্রাম তথা বাসস্থানের গোড়াপত্তনের লক্ষ্যে জুকো ভ্যালিতে পাড়ি জমায়, কিন্তু শীতল আবহাওয়া ও চাষাবাদের অনুপযোগী হওয়ায় তাদের ভাষ্য ছিল এই যে, এই ভ্যালি খুবই সুন্দর কিন্তু প্রাণহীন এবং নীরস। ভ্যালির মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ‘জুকো’ আর ‘জাফকু’ নামে দুটি ছোটো পাহাড়ি ঝিরি, যদিও এ দুটি ঝিরিকে নদীও বলে থাকে স্থানীয়রা।
জুকো ভ্যালি ট্রিপে যা দেখা যাবে
আগরতলা, বদরপুর, লামডিং, ডিমাপুর, কোহিমা, ভিসুমা। জুকো ভ্যালিতে যাওয়ার জন্য আপনাকে প্রথমেই যেতে হবে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা। সেখান থেকে বাসে বা ট্যাক্সিতে করে জাকামা বা ভিশেমা গিয়ে ট্রেকিং শুরু। জাকামা ও ভিশেমা ছাড়াও জুকো ভ্যালি যাওয়ার জন্য সম্প্রতি মণিপুরের সেনাপতি থেকেও ট্রেকিং করে যাওয়ার রাস্তা আবিষ্কার করেছে মণিপুর সরকার। তবে ভ্যালিতে যাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট ভিশেমা। এই পথে কষ্ট কম কিন্তু বেশ সময় লেগে যায়। আর জাকামা দিয়ে সময় কম লাগলেও একদম খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়, এজন্য কষ্ট বেশি হয়। তবে শর্টকাটের জন্য স্থানীয়রা এই পথ বেশি ব্যবহার করে।

যেই পথ দিয়েই যান না কেন, পথে পড়বে বিশাল বিশাল উচ্চতার শতবর্ষী গাছ আর ঘন জঙ্গল, পাখির কলকাকলি, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নিস্তব্ধতায় যে অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা হবে, তা আপনাকে শিহরন জাগাবেই। জাকামা বেস পয়েন্ট থেকে ট্রেকিং করে চূড়ায় পৌঁছাতে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা লেগে যায় ব্যক্তিভেদে। আর ভিশেমা থেকেও প্রায় ৪-৬ ঘণ্টা লেগে যায়। জুকো ভ্যালির চূড়ায় রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে তাঁবু এবং গেস্টহাউসের ব্যবস্থা আর খাবার হিসেবে ম্যাগি নুডুলস ও ভেজ খাবারের ব্যবস্থা আছে। সোয়া ৫টায় আমরা ডিমাপুর নেমে গেলাম। নেমেই পুলিশ স্টেশন খুঁজতে শুরু করলাম। একটু হাঁটতেই স্টেশনের মধ্যেই পেয়ে গেলাম। প্রথম টার্গেট kohima War Cemetary-তে যাব।

ম্যাপ ধরে আমরা ওয়্যার সিমেট্রিতে পৌঁছে যাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত প্রায় ১৪২০ জনকে সমাহিত করা হয় এখানে। জায়গাটা সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, শান্ত ও অনেক স্নিগ্ধ। শহরের মধ্যে দেখার মতো আছে একটি ক্যাথেড্রাল চার্চ আর বাইরে আছে কোহিমা গ্রাম। দূর থেকেই গ্রামটা অনেক সুন্দর লাগতে ছিল। গাড়ি থেকে নেমেই সামনাসামনি দেখে আরও ভালো লাগতে শুরু করল। কীভাবে এত শান্ত, স্নিগ্ধ, পরিষ্কার হতে পারে একটি গ্রাম। একদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। হেঁটে যতই আগাচ্ছি, আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠছি। আমাদের বাম পাশের পাহাড়ের ঢাল ধরে অনেকগুলো বাসা এরপরে একটা ভ্যালি। সেখানে ধাপে ধাপে চাষ করা পাকা ধানের ক্ষেতগুলো দেখতে কী যে সুন্দর লাগতে ছিল বলে বোঝানো সম্ভব না। ভিডিও বা ছবিতে দেখে নেবেন। একটা স্থানে একটু বসলাম, ছবি তুললাম।
আমার দেখা এক অদ্ভুত রকমের পাহাড়, যেমনটা আগে আর কোথাও দেখিনি, চোখে পড়েনি। শুরুতে একটা ঘাস-লতাপাতা দিয়ে আবৃত পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা নিচে নেমে, একটা ছোট্ট খাঁড়ি পার হয়ে অন্য একটি পাহাড়ে হাঁটা শুরু করেছিলাম। তখনই, ঠিক তখনই এত দিন ধরে অন্যের ছবিতে আর গুগলে দেখা অদ্ভুত মোহাচ্ছন্নতায় মোড়ানো সবুজের ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ঢেউ দেখতে পেলাম! প্রথম দেখাতেই মুগ্ধতা আমার গতি থামিয়ে দিল। ছবির সঙ্গে বাস্তবের এমন চমৎকার মিল পেয়ে কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম ঝটপট। এরপর অবাক চোখে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কিছু সময় তাকিয়ে ছিলাম সেদিকে। আর ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত সুখানুভূতিতে আচ্ছন্ন হলাম। মনে হলো, এই পাহাড়ের রিজ লাইন ধরে অনন্তকাল বুঝি হেঁটে যাওয়া যাবে ক্লান্তিহীন।

আবারও হাঁটা শুরু করলাম। কিছু সময় হেঁটে আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর পুরো পাহাড়ের ঢেউ খেলানো সবুজ সারির প্রায় পুরো ভিউ দৃষ্টিসীমায় ধরা দিল। ব্যাকপ্যাক রেখে সেখানে বসে পড়লাম। সেই পাহাড়ের সবুজ ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রাণভরে উপভোগ করতে থাকলাম দৃশ্য। তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, এই ট্রেইলের পুরোটা পথই এমন সবুজ ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সারি দিয়ে সাজানো। তাই বসে বসে দেখছিলাম, দূরে, ঢেউ খেলানো সবুজের মাঝে, পাহাড়ের ঠিক মাঝখানে মাথার সিঁথির মতো আঁকাবাঁকা একটা লাইন চলে গেছে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। তখনও বুঝতে পারিনি যে ওটাই আমাদের পুরো ট্রেকের পাহাড়ের ট্রেইল। অথচ তেমনই একটা ট্রেইলে দাঁড়িয়ে আছি!
যখন ওই পাহাড় ছাড়িয়ে একটু আগে ছবি তুলে রাখা পাহাড়ের ট্রেইলে গিয়ে পৌঁছালাম, পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, যে ছবি একটু আগে তুলেছি, যে পাহাড়ের ট্রেইল দূর থেকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি, সেই একই পাহাড়ের সারি! একই রকম ট্রেইল আর একই রকম সবুজের ঢেউ খেলানো পাহাড়েই হেঁটে এসেছি। পেছনে সেই একই দৃশ্য সামনের মতো হুবহু! বুঝলাম, পাহাড়ের মাঝের ওই সরু রেখাটাই আসলে আমাদের ট্রেক রুট, পাহাড়ের মূল ট্রেইল। এটা দেখা, বোঝা আর উপলব্ধি করার পর মুগ্ধতা আরও বেড়ে গেল। বিস্ময়ে আরও বেশি সুখে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। ট্রেইল ধরে ভীষণ আনন্দ নিয়ে আরেকটা অদ্ভুত রকম সন্তুষ্টির রেশ প্রাণে জড়িয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করলাম। কোনো রকম ক্লান্তি, হাঁপিয়ে ওঠা কিংবা কষ্ট ছাড়া!
যেতে চাইলে
নাগাল্যান্ডের জুকো ভ্যালি ট্রেকে এই সুখপাহাড়ের অবস্থান। সেখানে যাওয়ার নানা উপায় আছে। এয়ারে কলকাতা বা গুয়াহাটি থেকে ডিমাপুর অথবা আগরতলা বা গুয়াহাটি থেমে ট্রেনে ডিমাপুর। সেখান থেকে বাস বা জিপে করে নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা। সেখান থেকে আরও ২৫ কিলোমিটার দূরের জুকো ট্রেক পয়েন্টে গাড়ি বা জিপে যেতে হবে। রেজিস্ট্রেশন করে জুকো ট্রেইলে চলা শুরু করতে হয়। শুরুর চড়াই শেষ করে ভিউ পয়েন্ট থেকে মূল ট্রেইলে হাঁটতে শুরু করলেই পাওয়া যাবে জুকো ভ্যালি।