সম্ভাবনা
আশিকুর রহমান
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৪৫ পিএম
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রাচির সদস্যরা
২০২২ সালের আগস্ট। রাজধানীর টেকনিক্যাল এলাকায় এক মর্মঘাতী ঘটনার সম্মুখীন হন শাওন ও হিমেল। এক পথচারী তাদের সামনে বুকে হাত দিয়ে পড়ে যান। ন্যাশনাল ইমারজেন্সি সার্ভিস ৯৯৯-এ ফোন করলে ফোনের ওপাশ থেকে নানাবিধ জিজ্ঞাসাবাদ করে কালবিলম্ব করতে থাকে।
প্রচুর মানুষ জড়ো হয়ে গেলেও কেউ কোনো সাহায্য করতে পারছিল না। ১৫ মিনিটের মাথায় অসুস্থ পথচারীটি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে মারা যান। ইতোমধ্যে পুলিশ এসে মরদেহ সংগ্রহ করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা যায়, লোকটি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। চোখের সামনে এ ধরনের অপ্রত্যাশিত হৃদয়বিদারক মৃত্যু দেখে কিছু করতে না পারায় বিমর্ষ হয়ে পড়েন ওই দুই বিজ্ঞানপ্রিয় সদস্য। তারা একটি জরিপ শুরু করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে একজন পর্যবেক্ষকের দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আর কী করার সুযোগ থাকে? বিশেষভাবে ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুটি কাজ করা যেত- ১. দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করা; ২. অ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত রোগীকে শুইয়ে নয়, শক্ত কিছুর সঙ্গে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা।
দুটির জন্যই উপস্থিত লোকজনের অন্তত একজনের মানসিক প্রস্তুতি ও প্রাথমিক চিকিৎসায় দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা ছিল। জড়ো হওয়া একজন ব্যক্তিও যদি এ পদ্ধতি জানতেন, হয়তো পথচারীটি এভাবে মারা যেতেন না। এ ভাবনা থেকেই বিজ্ঞানপ্রিয়’র আরেক সদস্য তৌহিদুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বস্তি অঞ্চলে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। শুরু হয় ‘প্রজেক্ট প্রাচি’। প্রাচি শব্দটি মূলত ‘প্রাথমিক চিকিৎসা’র সংক্ষেপণ। প্রাথমিক চিকিৎসা হলো সামান্য বা গুরুতর অসুস্থতা বা আঘাতজনিত যেকোনো ব্যক্তিকে জীবন রক্ষা করতে, অবস্থার অবনতি থেকে বাঁচতে তাৎক্ষণিক সহায়তা। এর মধ্যে পেশাদার চিকিৎসাসহায়তা পাওয়ার আগে রয়েছে ছোটখাটো অবস্থার চিকিৎসা দেওয়া, প্লাস্টার বা ব্যান্ডেজ করা, একজন আহত রোগীর রক্তপাত বন্ধ করার উপায় প্রয়োগ করে জীবন বাঁচানো। প্রাথমিক চিকিৎসা সাধারণত এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কেউ করে থাকেন। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১০ ভাগ প্রতি ছয় মাসে একবার গুরুতর ইনজুরির শিকার হয়। যার মধ্যে ৯৮.৩ ভাগ আহত ব্যক্তিই সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে ভুক্তভোগী হয়ে থাকে।
ঢাকায় প্রায় ১ হাজার ২৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যদি ‘প্রজেক্ট প্রাচি’ সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে চালু করা যায় তবে শিক্ষার্থীরা নিজের পাশাপাশি তার পরিবারকেও অনাকাঙ্ক্ষিত গুরুতর পরিস্থিতি থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে। গড়ে উঠবে একটি আত্মসচেতন প্রজন্ম। বিজ্ঞানপ্রিয়-এর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ শাওন মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে দু-তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ ৩০০ শিক্ষার্থীকে ফার্স্ট-এইড প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। সে হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রাথমিক চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, তথা ২৫ হাজার পরিবার গুরুতর অসুস্থতাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এগিয়ে থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশিক্ষণ কারা দেবেন?
যেহেতু ফার্স্ট-এইড একটি প্রায়োগিক বিষয়, সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষককে অবশ্যই সুদক্ষ ও প্রত্যয়িত হতে হবে। এ প্রসঙ্গে শাওন বলেন, ‘ফার্স্ট-এইডের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্টিফিকেটধারী ছাড়া কারও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। বর্তমানে আমাদের একটি প্রশিক্ষক টিম রয়েছে, যেখানে দুজন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, একজন চিকিৎসক এবং একজন নার্স রয়েছেন। আমরা পর্যায়ক্রমে দক্ষ প্রশিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’ শুরুতেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম না থাকায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সঙ্গে যোগাযোগ করে টিম বিজ্ঞানপ্রিয়। প্রাচির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি গার্লস স্কুলে যুব রেড ক্রিসেন্টের এ আয়োজনে পাশে থেকে পূর্ণ সহযোগিতা করে টিম বিজ্ঞানপ্রিয়। তিন দিনব্যাপী মোট ১৮ ঘণ্টা চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
এ সময় শিক্ষার্থীদের ভিআর সিমুলেশনের মাধ্যমে ‘ভার্চুয়াল ফার্স্ট-এইড’ কার্যক্রম পরিচালনা করে বিজ্ঞানপ্রিয়। এ প্রসঙ্গে শাওন বলেন, ‘রেড ক্রিসেন্ট একই প্রশিক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে এলেও তাদের উদ্দেশ্য এবং প্রজেক্ট প্রাচির মোটিভ ও মেথডোলজি সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা এ প্রশিক্ষণে ভার্চুয়াল সিমুলেশন যুক্ত করেছি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) যুক্ত করেছি, যা নিয়ে আমাদের টিম এখনও কাজ করে যাচ্ছে।’