ভেগানিজম
আহমাদ শামীম
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৩ ১২:১১ পিএম
২০১৬ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল, যদি বিশ্বের সব মানুষ ভেগানধারায় জীবনযাপন শুরু করে তবে ২০৫০ সাল নাগাদ ৮ মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমবে ২ থেকে ৩ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির পরিমাণ কমবে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জীবনধারণ ও জীবনযাপন, এ দুইয়ের সমন্বয় ঘটে লাইফস্টাইল বা জীবন সৌন্দর্যের চর্চায়। আধুনিক যুগে সুস্থ থাকার প্রধান শর্ত হিসেবে মনে করা হয় সুষম খাবারকে। কী খাবেন আর কী খাবেন না তা নিয়ে দেশে দেশে নানান সময়ে চালু হয়েছে নানান মতবাদ। আর এ সবই আমাদের লাইফস্টাইলকে প্রভাবিত করে থাকে।
জীবনচর্চার আরেকটি মতবাদ ‘ভেগান’ বা ‘ভেগানিজম’ বর্তমানে বেশ আলোচিত। খুব সহজে যদি বলি, ভেগানিজম হচ্ছে প্রাণিজ খাবার ও পণ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকার চর্চা। ভেগানিজম নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের খানিক পেছন ফিরে তাকাতে হবে।
খাদ্যে প্রাণিজ আমিষ বর্জন করার চর্চার মাধ্যমে ভেজিটারিয়ান বা নিরামিষাশীরা ইতোমধ্যে পৃথিবীজুড়ে বেশ আলোচিত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের দিকে প্রাণিহত্যার নীতিগত বিরোধিতা করেন পিথাগোরাস। পিথাগোরাস সতর্ক করেছিলেন, প্রাণী ভক্ষণ মানুষের আত্মা ভক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি এর বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ‘মানুষের উচিত আত্মার আত্মীয় হিসেবে সব জীবিত প্রাণীর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো।’ ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ চিন্তক ও শিক্ষাবিদ জেমস পিয়েরোপন্ট গ্রেভস ‘আলকোট হাউস’ নামে একটি আধ্যাত্মিক সংঘ ও বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আলকোট হাউসে প্রথম ভেজিটারিয়ান ডায়েট চর্চা শুরু হয়। তারা ভেজিটারিয়ান শব্দটি শতভাগ উদ্ভিদভিত্তিক খাবার বোঝাতে ব্যবহার করতেন। আলকোট হাউসের একদল সমর্থকের সমন্বয়ে ১৮৪৭ সালে ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম ভেজিটারিয়ান সোসাইটি। যদিও ভারতবর্ষ ও গ্রিসের কিছু অঞ্চলে তারও অনেক আগ থেকেই খাদ্যতালিকায় মাংস ও প্রাণিজ আমিষ বাদ দেওয়ার চর্চা প্রচলিত ছিল।
ভেজিটারিয়ানদের আধুনিক রূপ ভেগানিজম। ভেজিটারিয়ান আর ভেগানের মধ্যকার পার্থক্য খুব সহজে যদি বলি, ভেজিটারিয়ান মানে হচ্ছে নিরামিষাশী আর ভেগান হচ্ছে উদ্ভিদভোজী। ভেগান শব্দটি ডোনাল্ড ওয়াটসন প্রথম ব্যবহার করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রাণী অধিকার সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করতেন। ‘নন ডেইরি ভেজিটারিয়ান’দের বোঝাতে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেন। Vegetarian শব্দের প্রথম তিনটি ও শেষ দুটি বর্ণ নিয়ে Vegan শব্দটি তৈরি। ওয়াটসনের ভাষায়, ‘এটা হচ্ছে ভেজিটারিয়ানের শুরু ও শেষ’। ডোনাল্ড ওয়াটসন ছিলেন ব্রিটিশ ভেগান সোসাইটির সহপ্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫১ সালে এ সোসাইটি ভেগানিজম শব্দটির ব্যাখ্যা করে এভাবে, ‘মানুষের উচিত প্রাণীদের শোষণ না করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা’। ১৯৬০ সালে এইচ জে দিনশাহ মার্কিন ভেগান সোসাইটি চালু করেন। ভেগানিজমের সঙ্গে অহিংস জেন ধারণার যোগসূত্রের মাধ্যমে তিনি এ সোসাইটি গড়ে তোলেন। জেন ধারণার ভিত্তিও হলো, জীবিত প্রাণীর প্রতি সহিংসতা পরিহার করা।
যারা ভেগান বা ভেগানিজম চর্চা করে থাকে, তাদের মধ্যে কয়েকটি ভাগ ও প্রকার রয়েছে। প্রথম হচ্ছে ‘এথিকাল ভেগান’, এরা কোনো প্রয়োজনে প্রাণিজ পণ্য গ্রহণ এবং প্রাণীদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বর্জন করে। কোনো প্রকারের মাংস, ডিম, দুগ্ধজাত অথবা এসব দিয়ে তৈরি কোনো খাবার অথবা প্রাণিজ উপকরণ বর্জন করে। দ্বিতীয় হচ্ছে ‘ডায়েটারি ভেগান’, এরা খাদ্যতালিকা থেকে প্রাণীদের বাদ দেয়। তৃতীয় হচ্ছে, ‘এনভায়রনমেন্টাল ভেগানিজম’, তারা প্রাণিজ পণ্য বর্জনের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে পশুপালন ও খামার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে। ভেগানদের আরেকটি পর্যায় হচ্ছে র ভেগান (Raw Vegan)। তাদের খাবার তালিকায় যা থাকে তা ১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা ৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার ওপরে রান্না করা হয় না। র ভেগানরা বিশ্বাস করে, এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় রান্না করা খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে না; যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
ভেগানরা শুধু যে মাংস খাওয়া থেকে দূরে থাকে তা নয়, তারা প্রাণী থেকে উৎপাদিত কোনো কিছুই খায় না। যেমন ডিম, দুধ, পনির, মাখন যা অনেক ভেজিটারিয়ান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, ভেগানরা তা ছুঁয়েও দেখে না।

ভেগানিজম বর্তমানে বেশ বর্ধনশীল একটি আন্দোলন। মার্কিন ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশন ও ডায়েটিশিয়ান অব কানাডা সুপরিকল্পিত ভেগান ডায়েটকে জীবনচক্রের সব ধাপের জন্য যথোপযুক্ত স্বাস্থ্যকর হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে নতুন নতুন ভেগান রেস্টুরেন্ট। উদাহরণস্বরূপ জার্মানির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশটিতে রীতিমতো ভেগানবিপ্লব সংঘটিত হয়েছে। ভেগান সোসাইটি অব জার্মানির তথ্যমতে, তাদের দেশে ভেগানের সংখ্যা বর্তমানে ৬ লাখের বেশি এবং এ সংখ্যাটি নাকি ক্রমে বাড়ছে। ইউরোপের প্রথম ভেগান সুপার মার্কেট চেইনশপ হিসেবে ‘ভেগানজ’-এর ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটি জার্মানির রাজধানী বার্লিনে তাদের প্রথম শাখা উদ্বোধন করে।
অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে আরও ১০টি শাখা খুলেছে ভেগানজ। এখানে খাবার ছাড়াও ভেগানদের ব্যবহার-উপযোগী সাড়ে ৪ হাজারের বেশি পণ্য পাওয়া যায়। জার্মানির ভেগান রেস্টুরেন্টগুলোয় কফিতে গরুর দুধের বদলে ব্যবহৃত হয় সয়াদুধ অথবা কাঠবাদামের দুধ। ভেগানচর্চায় সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে সেখানে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ‘ভেগান স্প্রিং’ নামের খাদ্যমেলা। এখানে নানান পদের ভেগান খাবারের পাশাপাশি পাওয়া যায় ভেগান আইসক্রিম! দুধের বদলে এ আইসক্রিমে ব্যবহার করা হয় জলপাইয়ের তেল। এ বিশেষ তেলযুক্ত আইসক্রিম খাওয়ার পর নাকি অনেকক্ষণ তার মিষ্টি স্বাদ মুখে লেগে থাকে, ঠিক দুধের তৈরি আইসক্রিমের মতোই।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে তাকালেও দেখা যায় একই চিত্র। আন্তর্জাতিকভাবে ভেগান বা উদ্ভিদভোজীদের জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের বিখ্যাত ও প্রধান খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৮ সালকে তো ‘ভেগান ফুড ট্রেন্ড’ হিসেবেই ঘোষণা করেছে। বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাকুমেন রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটিংয়ের তথ্যমতে, ২০২২ সালে বৈশ্বিক ভেগান ফুড মার্কেটের আকার ছিল ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। ২০৩২ সাল নাগাদ যা ৪৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হবে বলে ধারণা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
লন্ডনভিত্তিক এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভেগান অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিংবা বলা যায়, প্রতিদিনই বাড়ছে এ সংখ্যা। ২০১৬ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছিল, যদি বিশ্বের সব মানুষ ভেগানধারায় জীবনযাপন শুরু করে তবে ২০৫০ সাল নাগাদ ৮ মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা পাবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমবে ২ থেকে ৩ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতির পরিমাণ কমবে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ভেগানিজম নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে বাস করা উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যেই উদ্ভিদভোজী বা ভেগান হওয়ার প্রবণতা বেশি। মূলত প্রাণী অধিকার ও পরিবেশ রক্ষা ভেগান আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি থাকে স্বাস্থ্যসচেতনতা। মূলত এ তিনটি যুক্তি ও বিশ্বাসের ওপরই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ও এগিয়ে চলেছে ভেগানিজম। ভেগানদের জীবনচর্চা ও সতর্কতায় প্রাকৃতিক সুরক্ষার দিকটি বিশেষভাবে নজরে থাকে। জাতিসংঘ সম্প্রতি পরিবেশ রক্ষায় মাংস উৎপাদন কমানোর ওপর জোর দিয়েছে। সংস্থাটির খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, বিশ্বে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের পেছনে ২০ শতাংশ দায়ী পশু ও প্রাণিজ উপকরণ ব্যবহার করে পরিচালিত শিল্পগুলো। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক পশুপালনের এক একটি খামার থেকে প্রায় ৩৭ শতাংশ মিথেন গ্যাস নিগর্মন হয়, যা কার্বন ডাইঅক্সাইডের চেয়ে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ২০ গুণ বেশি প্রভাব রাখছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর গোচারণের সুবিধার্থে মাইলের পর মাইল বনভূমি কাটা পড়ে; যার ফলে প্রতি বছর বাতাসে কার্বন নির্গমন বাড়ে ২৪০ কোটি টন।
খাবার ও পরিবেশের পাশাপাশি ভেগানদের প্রভাব লেগেছে বিশ্ব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতেও। বর্তমানে পরিবেশের কথা ভাবছে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোও। বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো তাদের তৈরি পোশাক এবং বিভিন্ন পণ্যে পশুর চামড়া, লোম, হাড়, দাঁত ইত্যাদি ব্যবহার বর্জন করেছে শুধু পরিবেশের কথা মাথায় রেখে। ২০১৭ সালের শেষে ভোগ ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী দিনগুলোয় ফ্যাশন ট্রেন্ডে প্রভাব রাখবে ভেগান প্রডাক্ট। ভেগান ফ্যাশনে চামড়ার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আনারসের আবর্জনা, আপেলের খোসা, মাশরুম ইত্যাদি। ব্রিটিশ ডিজাইনার স্টেলা ম্যাককার্টনি সান ফ্রান্সিসকোর বায়োটেক ফার্ম বোল্ট থ্রেডের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইস্ট ব্যবহার করে ভেগান ফ্রেন্ডলি সিল্ক তৈরিতে সফল হয়েছেন। এ ছাড়া নিউজার্সিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মডার্ন মিডো শুরু করেছে প্রথম বায়োফেব্রিকেটেড লেদার ব্র্যান্ড ‘জোয়া’। ফার্মেন্টেড ইস্ট ব্যবহার করে কোলাজেন উৎপাদনের মাধ্যমে কৃত্রিম লেদার দিয়ে এ ব্র্যান্ডের পোশাকগুলো তৈরি।
ভেগানরা প্রাণিজ আমিষ পরিহার করে চলেন বলে তাদের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে ইতোমধ্যে উঠেছে নানান প্রশ্ন। এ প্রশ্নকারীদের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এভারেস্টই জয় করে ফেলেছেন এক ভেগান। তার নাম কুন্তল জৈশের। প্রথম ভেগান হিসেবে ২০১৬ সালে এভারেস্ট জয় করেন ভারতের গুজরাটে জন্ম নেওয়া কুন্তল। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রথম ভেগানিজমের সঙ্গে পরিচয় তার। তখন থেকেই ভেগানচর্চা করছেন। এভারেস্ট অভিযানের সময় বেসক্যাম্পে পাওভাজি, ভেগান কেক, পোহা ইত্যাদি খেয়ে দিব্যি সুস্থই ছিলেন কুন্তল।
ভেগানিজম বর্তমান সময়ে আলোচিত এক জীবনচর্চার নাম। এ জীবনচর্চা শুধু আমাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য নয়, বরং প্রাণী, প্রকৃতি ও পরিবেশের সুস্থতায়ও অবদান রাখছে বলে মনে করেন পৃথিবীর তাবৎ ভেগান।