‘ঘণ্টা মুচি’ কথাটা পরপর দুবার বলে কয়েক মুহূর্তের জন্য কণ্ঠস্বরটা থামে। তারপর খুব জোরে ‘ঘণ্টা মুচি-ই--ই’ বলে থেমে যায়। কে, কে চিৎকার করতে করতে বাড়ির পেছনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায় পিয়াস। রাত আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ ব্যাপারটা ঘটছে। বাবা ওই সময় বাড়িতে থাকেন। পড়ার সময় বাইরে যাওয়া পছন্দ করেন না। তাই ইচ্ছে করলেও কণ্ঠটা কার, খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে পারে না সে। তবে তার ধারণা, কাজটা তপুর না হলে নিয়নের। কোচিং শেষ করে ওই সময় দুজনে বাড়ি ফেরে। তাকে উত্ত্যক্ত করতেই ওদের কাজ।
পিয়াস মধ্যম মানের ছাত্র। রোল ২৮, ষষ্ঠ শ্রেণি, ক শাখা। খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ কম। সে ভালো ছবি আঁকতে পারে। এদিক থেকে নিয়ন আর তপু খানিকটা এগিয়ে। তারা লেখাপড়ায় ভালো, ভালো খেলতেও পারে। টিফিন পিরিয়ডে কয়েকজন মিলে ফুটবল নিয়ে ‘মুচি মুচি’ খেলে।
অন্যান্য দিনের মতো দুর্গাপুজো উপলক্ষে স্কুল বন্ধ ঘোষণার দিনও পিয়াস দূরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু কী একটা মনে হতেই দৌড়ে গিয়ে নিয়নকে বলল, ‘আমি খেলব। নিবি?’ তখনও লটারি করে প্রথম মুচি নির্ধারণ হয়নি। পিয়াসকে তারা ‘মোটা, মোটা’ বলে খেপায়। কোনো খেলায়ই নিতে চায় না। তাই জবাবে নিয়ন যখন বলল, ‘উরি-ই বাস, মোটা, তুই খেলবি! নিতে পারি, প্রথমে মুচি খাটতে হবে।’ কোনো বাক্য ব্যয় না করেই পিয়াস রাজি হয়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও মুচি থেকে উঠতে পারে না। আর টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়তেই নিয়নরা ‘ঘণ্টা মুচি, ঘণ্টা মুচি’ বলে খেপাতে শুরু করে।
পুজোর ছুটির পর প্রথম স্কুল আজ। পিয়াস মনে মনে ঠিক করে এসেছিল। তারা যতই খেপাক, যাই বলুক কোনো উত্তর করবে না। আগে যখন ‘মোটা মোটা’ বলে নাজেহাল করত, বুদ্ধিটা দিদি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যা বলে বলুক, তুই পাত্তা দিবি না। দেখবি, কয়েক দিন পর ওরাও বলা বন্ধ করে দেবে।’ বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে। আগের মতো ‘মোটা, মোটা’ করে আর নাজেহাল করে না। কিন্তু ‘ঘণ্টা মুচি’ বলে করা অত্যাচার আজ শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে পারে না পিয়াস। অতিষ্ঠ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে টিফিন পিরিয়ডে স্কুল থেকে চলে আসে।
‘টিফিনে চলে এলি, কিছু কী হয়েছে?’ মা জিজ্ঞেস করলে সবটা মাকে খুলে বলে। ‘মোটা, মোটা’ বলে নাজেহাল করার ব্যাপারটা মা জানতেন। তাই সাতপাঁচ না ভেবেই হেডস্যারকে কল করে সবটা জানালেন। ‘আমি বিষয়টা দেখছি’ বলে মাকে আশ্বস্ত করে নিয়নদের অফিসে ডেকে পাঠান স্যার।
‘তোমরা না ভালো ছাত্র, ভালোমানুষ হয়ে আমাদের মুখ উজ্বল করবে। সেই তোমরা বন্ধুকে কষ্ট দাও কী করে? আশ্চর্য, পিয়াসকে কতটা কষ্ট দিয়েছ যে, ও আর এই স্কুলেই পড়তে চাচ্ছে না। টিসি নেওয়ার জন্য ওর মা ফোন করেছিলেন। লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আর কখনও এ কাজ করলে স্কুল থেকে বের করে দেব। কথাটা মনে থাকে যেন।’
নিয়নরা ব্যাপারটা আগেই আন্দাজ করেছিল। পিয়াসের সঙ্গে আজ বাড়াবাড়ি করা হয়ে গেছে। সবাই একসঙ্গে ‘স্যরি স্যার, আর কখনও এমন হবে না’ বলে স্যারের রুম থেকে বাইরে এলো। স্কুলের পশ্চিম দিকের বকুল গাছটার কাছে আসতেই তপু সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ‘স্কুল ছুটির পর পিয়াসদের বাড়িতে যাব। সবাই মিলে স্যরি বলব। আন্টির কাছেও মাফ চেয়ে নেব।’
চারটে পনেরো বাজে। পিয়াস মুখ শুকনা করে বারান্দায় বসে ছিল। মা ভেতরের ঘরে কাজ করছিলেন। কথা বলার শব্দ শুনে বাইরে এলেন। তপু পিয়াসের পাশে গিয়ে বসল। ‘বন্ধু, আমাদের মাফ করে দে, প্লিজ। আর কখনও এমন করব না।’ পিয়াসের চোখে জল। তপু, নিয়নরা একসঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরল। পিয়াস উঠে দাঁড়িয়ে মাকে বলল, ‘মা, স্কুল পরিবর্তন করব না।’ মা মাথা নেড়ে ‘ঠিক আছে’ বুঝিয়ে শব্দ করে বললেন, ‘তোমরা বসে গল্প করো। আমি তোমাদের জন্য নাড়ু নিয়ে আসছি...’