শূন্য সাগর
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৩ ১২:২৯ পিএম
আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৩ ১২:৩১ পিএম
আন্ধারমানিক যাওয়ার পথে আলো আঁধারের লুকোচুরি ছবি : আসিফ করিম
আন্ধারমানিক শব্দটিই রহস্যময়। এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যময় স্থানটি নিজের চোখে দেখলে অনুভব করতে পারবেন এর বিশালতা। সেখানে ঘুরতে যাওয়াও অতটা সহজ নয়। দুর্গম এ স্থানটি নিয়ে লিখেছেন শূন্য সাগর
বান্দরবান জুড়েই দর্শনীয় অনেক স্থান আছে। এগুলোর একটির চেয়ে অন্যটি আরও সুন্দর। বান্দরবান গেলেই প্রকৃতির অপার বিস্ময়ে নয়ন জুড়াবে আপনার। তবে জানেন কি, বান্দরবানের অন্যতম সেরা এক দর্শনীয় স্থান হলো আন্ধারমানিক। প্রত্যন্ত এ স্থানটি বান্দরবানের অনেক গভীরে। সেখানে ঘুরতে যাওয়াও অতটা সহজ নয়। তবে প্রকৃতির সবটুকু সৌন্দর্য হয়তো আপনি সেখানে গেলেই উপভোগ করতে পারবেন! কল্পনার রাজ্যের মতো আন্ধারমানিক পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এক স্থান।
আন্ধারমানিক শব্দটিই রহস্যময়। এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যময় স্থানটি নিজের চোখে দেখলে অনুভব করতে পারবেন এর বিশালতা। আন্ধারমানিকের মূল আকর্ষণ হলো নারিশ্যা ঝিরি। ঝিরির দুই পাশ ৬০-৭০ ফুট পাথরের দেয়াল সমান্তরালভাবে অনেকদূর চলে গেছে। মনে হলো ঢালাই দিয়ে কেউ বানিয়ে রেখেছেন। এক অদ্ভুত সৃষ্টি এই আন্ধারমানিক। সূর্যের আলো কম পৌঁছার কারণে জায়গাটি সব সময় অন্ধকার দেখা যায়। তাই আন্ধারমানিক বলতে মূলত আমরা এই জায়গাটিকেই বুঝি।

অবস্থান
আন্ধারমানিকের সৌন্দর্য যেমন হৃদয় হরণ করে; ঠিক সেখানকার রহস্য কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দেয়। বান্দরবান জেলার থানছি উপজেলার বড় মদক এলাকায় অবস্থিত আন্ধারমানিক। বড় মদকের পর আর কোনো সেনাবাহিনী বা বিজিবি ক্যাম্প নেই। এ কারণে নিরাপত্তার খাতিরে আন্ধারমানিকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয় না। তবু থেমে নেই পর্যটকরা। সবারই আন্ধারমানিকের অন্ধকারের তীব্র আকর্ষণ। তবে সেখানে যেতে হলে দিনের বেলায় গাইড সঙ্গে নিয়ে ঘুরে আসতে হবে। আন্ধারমানিক যাওয়ার সময় প্রথমে দলিয়ানপাড়া থেকে রেমাক্রি ও ছোট মদক হয়ে বড় মদক যেতে হবে।
রেমাক্রির পরে ওই পথে পর্যটকরা খুবই কম যান। যারা রোমাঞ্চপ্রেমিক কেবল তারাই আন্ধারমানিকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। বড় মদকের দিকেও কেউ যান না বললেই চলে। তবে দুয়েকজন যারা যান তারা থানছি বা রেমাক্রি থেকে ট্রলারে করে যান।

ওই পথটিকে অব ট্রেইল বলা যায়। রেমাক্রি থেকে ৮ ঘণ্টার হাঁটা পথ। যার ৬ ঘণ্টা সামান্য উঁচু-নিচু ও নদীর পাড় ধরে হলেও শেষ ২ ঘণ্টা ঝোপঝাড়পূর্ণ পাহাড়ি পথ। যেভাবেই হোক সন্ধ্যার আগে বড় মদক পৌঁছাতেই হয়। কারণ শেষ ২ ঘণ্টার পথ হেড ল্যাম্পের আলোতে যাওয়া কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়। আর অজানা কিছু ভয় তো থাকেই। এ পথে বাঙালি কোনো আদিবাসীকেও তেমন একটা দেখা যায় না। খৈসাপ্রু ও চাখাইপাড়ার পর সিঙ্গাফা ও ঠান্ডা ঝিরি সাঙ্গু নদীতে মিলিত হয়েছে। এর কিছুদূর পর তুর্গ ঝিরি। সেখান থেকে আবার পাহাড়ি পথ শুরু।
বড় মদক থেকে আন্ধারমানিক পর্যন্ত যাওয়া-আসার জন্য সেখানে আছে নৌকা। নদীর বিভিন্ন স্থানে কম পানি থাকায় মাঝেমধ্যে নৌকা থেকে নেমে হাঁটতে হয়। এভাবে প্রায় ঘণ্টা দুই লেগে যেতে পারে আন্ধারমানিক পৌঁছাতে।

নিশীথে দীর্ঘ পাথুরে পথ
পাহাড়ের নিজস্ব একটি গন্ধ রয়েছে। জামপাতা হাতে কচলে নাকে শুঁকলে যেমন মনে হয় তেমনই। সতেজ বাতাস প্রাণে এসে লাগে। বুকভরে শ্বাস নিই। আহ! নিমেষেই সব ক্লান্তি-গ্লানি-গরিমা উধাও। প্রায় ২ ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে নৌকা এসে থামে তীরসংলগ্ন রেইছা ঝিরির গোড়ায়। খাল ধরে আরও এগোলে দুসরি বাজার, এই পথে যাওয়া যায় ক্রিসতং-রুংরাং। সাঁঝের চাদর টেনে সেদিনের মতো শুয়ে পড়লেন সূয্যি মামা। তীর থেকেই উঠে গেছে ঝিরি। প্রায় ঘণ্টা তিনেক হাঁটলে ঝিরি পেরিয়ে এরপর পাহাড়ি পথ।

পাহাড়ে সন্ধ্যা মানেই রাত। নিশীথে দীর্ঘ এই পাথুরে পথ কীভাবে পাড়ি দেব ভাবতে ভাবতেই হাঁটা শুরু। ট্রেকিংয়ে প্রথম দিনটি বেশ কষ্টে যায়। পরদিন থেকে শরীর ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শুরু করে। অবিরাম ঝিঁঝিঁ ডাকের তালে তালে আমরা হাঁটি। বিচিত্র পশুপাখির ডাকও শোনা যায়। ভয় ধরে, কেটেও যায়। পাহাড়ে ঢালু নামলে এক রকম বিপদ আবার খাড়া উঠলে আরেক রকম আপদ। বুনো লতার ঝোপের ভেতর দিয়ে দু-হাতে মুখ আগলে এগিয়ে যেতে হয়। প্রকৃতি যেন এদের ইচ্ছেমতো বাড়তে সুযোগ দিয়েছে। বড় গাছের নিচেও দুর্ভেদ্য ঝোপের জঙ্গল। বুনো লতায় লতায় জড়াজড়ি, কাঁটায় হাত-পা ছিলে-কেটে যাচ্ছে। কোথাওবা বুক ঢিবঢিব করা খাড়া পাহাড়ের গা। অফট্রেকের রোমাঞ্চ এইসবেই। দৃষ্টিসীমা ঘন বন আর চারপাশে উঁচু দেয়ালের মতো ঘিরে থাকা পর্বতরাজিতে আটকে যায়।

হাড় কাঁপানো আন্ধারমানিক
মেনতাংপাড়ার জঙ্গল থেকে নিচে নামার সময় সূর্যের তাপ বেশ বেড়ে যাচ্ছিল। সবার মুখে এক কথা এভাবে নিচে নেমে যাচ্ছি এইটা ধরে আবার ফিরতে হবে? বললাম ফেরারটা পরে দেখেন, আগে চলেন আমরা নামি নিচে।
নিচে নেমে দেখলাম ঝিরি একেবারে শুকনো। অন্তঃকাল ঝিরি দিয়ে হাঁটার পরে মনে হলো পাড়ার সন্ধান পাচ্ছি। দ্রুত পাড়াকে পাশ কাটিয়ে আমরা নারিশ্যা ঝিরিতে ঢুকে পড়লাম। পুরো পরিবেশ ১৮০ ডিগ্রি চেঞ্জ হয়ে গেল। প্রচণ্ড গরমে সিদ্ধ আমরা একবারে হিম শীতল ঠান্ডা পরিবেশে পড়ে গেলাম। বেশ কিছু জায়গায় কোমরপানি পার হয়ে মনে হলো সবকিছু জমে গেছে, হাত দিয়ে ধরে চিমটি দিয়ে ফিল হচ্ছে, এত ঠান্ডা পানি ছিল। আমাদের ৬ ঘণ্টা হাঁটার পর হাড় কাঁপানো এই ঠান্ডা ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।
আন্ধারমানিক ট্রিপ হবে শুনলেই সবার চোখের সামনে ফুটে ওঠে দুই পাশে খাড়া পাহাড় ও মাঝে দিয়ে যাওয়া নারিশ্যা ঝিরি। কিন্তু ওই ভিউ আপনি বড়জোর ২-৩ ঘণ্টার জন্য দেখবেন। বাকি বেশিরভাগ সময় যা দেখবেন তা হলো পাহাড় আর তা বেয়ে উঠে যাওয়া রাস্তা।
অফট্রেকের রোমাঞ্চের স্বাদ পেতে বাজেট ট্রিপে যেতে পারেন বেঙ্গল ট্রেকার্সের সঙ্গে। বিস্তারিত : fb.me/e/1IGXDzJMi