× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গোবিন্দগঞ্জ সাঁওতাল পল্লীতে হামলা

বিচারহীন এক হত্যাযজ্ঞ

রিপন আকন্দ, গাইবান্ধা

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১১:৪২ এএম

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৫:০৯ পিএম

ঘর হারানো সাঁওতালদের দিন কাটে খোলা আকাশের নিচে ছবি: ফোকাস বাংলা

ঘর হারানো সাঁওতালদের দিন কাটে খোলা আকাশের নিচে ছবি: ফোকাস বাংলা

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে বসবাসরত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীকে পূর্বপুরুষদের জায়গা থেকে উচ্ছেদে ২০১৬ সালে চালানো হয় নির্মম হামলা। স্থানীয় প্রশাসনের সেই হামলায় নিহত হন তিন সাঁওতাল। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয়নি সেই হত্যা মামলার বিচার। এখনও ঘরহীন অনেক সাঁওতাল পরিবার। কী ঘটেছিল সেদিন, কেন এগোয়নি বিচার কার্যক্রম, কেমন আছে সেই মানুষগুলো। এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন...

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে হামলা-মামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও তিন সাঁওতালকে হত্যার সাত বছরেও শুরু হয়নি বিচারকাজ। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি পিবিআইয়ের তদন্তের নারাজির পর সিআইডির তদন্ত শেষে চার্জশিট জমা হয়েছে আদালতে। এ অবস্থায় সাত বছরেও মামলাটির দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা আর প্রধান অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ সাঁওতাল নেতাসহ নিহত-আহতের পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তরা। তবে মামলার এ দীর্ঘসূত্রতার পেছনে বাদীর বারবার নারাজিকেই দূষছে রাষ্ট্রপক্ষ।

অন্যদিকে, বিরোধপূর্ণ ওইসব জমিতেই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে সাঁওতালরা ঘুরে দাঁড়াতে গত তিন বছর থেকে ইক্ষু খামারের সিংহভাগ জায়গা দখল করে বসতি স্থাপনসহ জমিতে ধান ও পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছে। খামারের সিংহভাগ জায়গা দখলের বিষয়ে প্রশাসন ও মিল কর্তৃপক্ষ নীরব থাকলেও আতঙ্ক নিয়েই আশঙ্কার জমিতে বসবাস করছে বলে জানিয়েছে সাঁওতালরা।

ইপিজেডের কারণে এখনও তারা আছেন উচ্ছেদ আতঙ্কে

নির্যাতনের শিকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাঁওতালরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। গৃহহীন হয়ে তারা অসহায় দিনাতিপাত করছে। আহতরা চিকিৎসার অভাবে কেউ পঙ্গু, কেউ শরীরে গুলির স্প্লিন্টার নিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন। নভেম্বরের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাসের বাণী শোনালেও তার কোনোটিই আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

সেই থেকে হামলার দিনটি (৬ নভেম্বর) প্রতিবছর ‘সাঁওতাল হত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে সাঁওতালরা। দিবসটি উপলক্ষে আজ (সোমবার) সকালে ৭ বছর পূর্তিতে গোবিন্দগঞ্জের অস্থায়ী বেদিতে ফুল দেবে সাঁওতালরা। একই দিন বেলা ১১টার দিকে বিক্ষোভ শেষে উপজেলার কাটাবাড়ী মোড়ে সমাবেশ করবেন তারা। যেখানে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ সাঁওতাল নেতারা বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জের রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড আখ চাষের জন্য সাপমারা ও কাটাবাড়ী ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি অধিগ্রহণ করে রংপুর চিনিকল। ৭৩ শতাংশ মুসলমান আর ২৭ শতাংশ সাঁওতালের জমি অধিগ্রহণের পর ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম’ নামে নামকরণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত জমি মিল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে ধান, পাট ও তামাকসহ বিভিন্ন আবাদ করে আসছিল সাঁওতালরা। ২০০২ সালে অধিগ্রহণ চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ এনে বাপ-দাদার জমি ফেরত চেয়ে আন্দোলন শুরু করে সাঁওতালরা। ২০১৪ সালে তারা গঠন করে ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। এরপর চলতে থাকে সাঁওতাল-বাঙালিদের ভূমি উদ্ধারের মানববন্ধন, মিছিল-মিটিংসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের প্রায় ১০০ একর জমিতে ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে বসবাস আর জমিতে চাষাবাদ শুরু করে সাঁওতাল-বাঙালিরা। বাকি জমিতে চিনিকল কর্তৃপক্ষ আখ রোপণ করে।

২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর সকালে কোনো নোটিস ছাড়াই আখ কাটা নিয়ে পুলিশসহ চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ বাধে। এতে চারজন গুলিবিদ্ধ হলেও শ্যামল হেমরম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামে তিনজন নিহত ও উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন। বাড়িঘরে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের আগুন দেওয়ার ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশও হয় সেসময়।

হামলার ঘটনায় সাঁওতালদের পক্ষে থমাস হেমব্রম ২৬ নভেম্বর তৎকালীন গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল আওয়াল, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল হান্নান, খামারের ব্যবস্থাপক আব্দুল মজিদ, সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাকিল আকন্দ বুলবুল ও কাটাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রফিকসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে পুলিশসহ আরও প্রায় ৬০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ মামলায় ২৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা হয় লুট করা পাওয়ার টিলার, দুটি শ্যালোমেশিন, একটি ভ্যান ও ৫৬টি ঢেউটিন। আসামিদের মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের সারাই গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে মিঠু মিয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন আদালতে।

দীর্ঘ তদন্ত শেষে পিবিআই ৯০ জনকে আসামি করে ২০১৯ সালের ২৮ জুন গোবিন্দগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। কিন্তু প্রধান আসামি সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদসহ প্রকৃত দোষীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ এনে প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি পিটিশন করেন থমাস হেমব্রম। নারাজি পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর মামলাটি সিআইডিকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২ নভেম্বর গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৪৯৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেয় সিআইডি। সেখানেও মামলার মূল আসামিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রত‌্যাখ্যান করে আবারও নারাজি দেন বাদী। নারাজি পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি একই বছরের ৭ ডিসেম্বর শুনানি ও আলোচনা হয় আদালতে। এরপর তিন দফায় শুনানি পিছিয়ে ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেন আদালত। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১২ মার্চ পরবর্তী নারাজি শুনানির দিন ধার্য করেছেন আদালত।


অন্যদিকে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং হত্যার পর পুলিশ তাদের ওপর হামলার অভিযোগে সাঁওতাল-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মামলা করে। সেই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে পিবিআই। প্রতিবেদনে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান আলীসহ ৪২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার তিন অভিযুক্ত মারা গেছেন।

অপরদিকে, বিরোধপূর্ণ এসব জমিতে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাঁওতালরা বিরোধিতা করলেও ইপিজেড স্থাপনের পক্ষে রয়েছে প্রশাসন। এ লক্ষ্যে সরকারের পক্ষে ২০২১ সালেন ২৪ আগস্ট ইপিজেড বাস্তবায়নে রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল নজরুল ইসলাম। প্রশাসন বলছে, এই জমিতে ইপিজেড নির্মাণ সরকারের একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। ইপিজেড হলে এ অঞ্চলের শিক্ষিত ও বেকার যুবকরা চাকরির সুযোগ পাবেন। বৃহত্তর রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের মাঝামাঝি এই গোবিন্দগঞ্জের ইপিজেড এ অঞ্চলের আমূল পরিবর্তন ঘটাবে। 

সাঁওতাল হত্যা মামলার বাদী থমাস হেমরম বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত আগুন লাগানোর ফুটেজ, ছবি প্রকাশ পেলেও এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি। মূল আসামিদের বাদ দিয়ে প্রথমবার পিবিআই চার্জশিট দেয়। নারাজি দিলে সিআইডিকে তদন্তভার দেন আদালত। কিন্তু সিআইডিও ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল আসামিদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট জমা দেয়। সাত বছরেও মামলাটির কোনো অগ্রগতি নেই। আমাদের পূর্বপুরুষদের জমিতে ইপিজেড করতে দেব না। প্রয়োজন হলে তিন ভাইয়ের মতো আমরাও জীবন দেব।’

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, সাত বছরেও গোবিন্দগঞ্জের তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়নি। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের ঘটনার পর থেকে নির্যাতনের শিকার সাঁওতালরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঘটনার মূল হোতাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। উল্টো সাঁওতাল ও নিরীহ কৃষকদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও এ পর্যন্ত তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। 

সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, ‘এই বিচারহীনতা প্রমাণ করে জাতিগত সংখ্যালঘু সাঁওতালদের কতটা অবহেলার চোখে দেখা হয়। ভূমি উদ্ধার করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে সাঁওতাল শ্যামল, মঙ্গল ও সাঁওতাল রমেশ। এখন তাদের সেই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ কোন বাংলাদেশে তারা বসবাস করছে? এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন?’

এ ব্যাপারে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের চৌকি আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (এপিপি) এডভোকেট মিজান রহমান জানান, বাদীপক্ষ বারবার পুলিশি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করায় মামলার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হচ্ছে। ২০২৪ সালের ১২ মার্চ নারাজী শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছে আদালত। ঐদিন বাদী পক্ষ পুলিশি প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা