সাদাত হোসাইন-এর গল্প
সাদাত হোসাইন
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৩ ১২:১২ পিএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩ ১২:১৩ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
(দাদি) বলতেন, 'চইত্তির মাস। শইলভর্তি বিচি (ঘামাচি) ওঠব। সারা গাও কুটকুট করব। রউদে বেশি দৌউড়াইবা না ভাই'।
আমি বলতাম, 'খাজুর পাতা দিয়া বিচি ফুটাইতে আরাম বু। কুটুস কুটুস শব্দ অয়। খাজুর পাতা লইয়াহি?'
বু পান খাওয়া লাল টুকটুকে ঠোঁটে হাসতেন, তারপর চেপে ধরে খটাস করে চুমু খেয়ে বলতেন, 'না না, এহন রউদে গ্যালে তোমার মায় মারব। যাও, এহন দক্ষিণ দিকের উঠানে গিয়া হুইয়া থাহো। ফুরফুরা বাতাস। আমি বরকের (কলাপাতা) বিছান পাইত্যা থুইছি। পানির লাহান ঠান্ডা।'
আমার কলাপাতার শীতল বিছানা ভালো লাগে। কিন্তু আমার যা ভালো লাগে, আম্মা তার কিছুই করতে দিবেন না। চলতে হবে তার কথা মতো। না চললেই পিঠের ওপর ধুপধাপ।
চৈত্র-বৈশাখে আমাদের গা ভর্তি ঘামাচি হয়। তখন বাজারে অনেক ধরনের ঘামাচি পাউডার পাওয়া যায়। গোসলের পরে ভেজা গা মুছে সেই পাউডার গায়ে মাখিয়ে নিলে আরাম! ঘামাচির কুটকুটানিও যেন খানিক কম। কিন্তু আমার পাউডার ভালো লাগে না।
আমার ভালো লাগে কাইল্যা মন্নার উপায়।
কাইল্লা মন্না গাঁয়ের বৃদ্ধ ঘরামী। বাঁশ, ছনের ঘরের কারিগর। তার সাথে আমার খাতির। এই গরমে তারও ঘামাচি হয়েছে। তিনি সারাক্ষণ সেসব খুটুস খুটুস ফোটান। আর এক কৌটা পাউডারের জন্য হাপিত্যেস করেন।
কিন্তু পাউডারের যে ভারি দাম! কাইল্লা মন্নার অবশ্য পাউডারের বিকল্প উপায় আছে। সেই উপায় আমার ভীষণ ভালো লাগে। চৈত্র বৈশাখে মাটির রাস্তাজুড়ে ধুলো। কাইল্লা মন্না সেই ধুলো গায়ে মাখেন। তার শরীরজুড়ে ধুলো। তিনি আরামে চোখ বন্ধ করে থাকেন। খানিকবাদে চোখ মেলে দেখেন আমি গভীর আগ্রহে তাকিয়ে আছি। তিনি সরু চোখে বলেন, 'কী ঘটনা?'
আমি বলি, 'জিনিস আনছি'।
তিনি পুরো চোখ মেলে চাপা আনন্দে বলেন, 'তুমার মায়ে দেখে নাইতো?'
আমি ফিসফিসিয়ে বলি, 'নাহ, দেখে নাই।’
আমার গায়ে সাদা স্যান্ডোগেঞ্জি। কাইল্যা মন্না গেঞ্জি খুলে দুই হাতে আমার শরীরজুড়ে রাস্তার ধুলো মাখাতে থাকেন। আরামে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। ধুলো মাখানো শেষে কাইল্যা মন্না হাত পাতেন। আমি আমার ছোট্ট মুঠির ভেতর থেকে কাগজে মোড়ানো পাউডার তার হাতে তুলে দেই। কাইল্লা মন্না সেই পাউডার নাকের কাছে নিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেন।
আহ!
আবেশে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
তার সাথে এ আমার অলিখিত চুক্তি। আমি তাকে পাউডার চুরি করে এনে দিতে পারলে, বিনিময়ে তিনি আমায় ধুলো মাখিয়ে দেবেন। ধুলো মাখা হতেই আমি দৌড়ে পালাই। আম্মা ওই এলো বলে! ফুরফুরে হাওয়ায় আমার গায়ের ধুলো উড়তে থাকে। চারপাশে একটা ধুলোয় ধূসরিত জগত।
সেই জগতে ডুবে যেতে আমার আনন্দ!
পরদিন আম্মা আমাকে ধরলেন, পাউডারের কৌটা খালি! এতো পাউডার গেল কই?
আমি কী বলব! চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। পিঠের ওপর ধুমধাম পড়তেই কান্না। কাঁদতে কাঁদতেই ঘটনা বলে দেই। আম্মা এবার অগ্নিশর্মা, 'ওই বুড়া ব্যাটা কোন আক্কেলে এইটুক পোলারে ধোঁকা দিয়া পাউডার নেয়! আক্কেলবুদ্ধি কী কিছু হয় নাই? কিচ্ছুনা? দুইদিন পর কবরে যাইব, এহনও পাউডার মাখনের সাধ মেটে নাই?'
আম্মা আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যান কাইল্যা মন্নার বাড়ি। উঠানের এককোণে কাইল্যা মন্নার মেয়ে শুয়ে আছে। তার কোলের ভেতর ছোট্ট শীর্ণ অসুস্থ এক শিশু! সেই শিশুর গাভর্তি ঘামাচি। কিছু পেকেও গেছে। শিশুটি করুণ কণ্ঠে চিঁচিঁ করে শব্দ করছে। তার পাশে কাগজে মোড়ানো সেই পাউডারটুকু।
মেয়েটা দুই আঙুলের চিমটির মাথায় খানিক পাউডার নিয়ে শিশুটির গায়ে ছিটিয়ে দিল। খুব সামান্য। যদি শেষ হয়ে যায়! যদি পরের বেলা আর না জোটে! তাহলে কী হবে?
আম্মার হঠাৎ কী হল! আমাকে নিয়ে ফের বাড়ি ফিরলেন। তারপর ট্রাংক খুলে আব্বার পাঠানো শেষ পাউডারের কৌটাখানা বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'যা, তারে গিয়া এইটা দিয়ায়'।
আমি পাউডারের কৌটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মাথাজুড়ে তখন রাজ্যের দুশ্চিন্তা, ‘আচ্ছা, আস্ত এক কৌটা পাউডারের বিনিময়ে কাইল্যা মন্না আমায় কয়দিন ধুলো মাখিয়ে দেবে! কয়দিন? কয়দিন?
আনন্দে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে!