শত দেশের শত গল্প
রেজাউল বাহার
প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:১৪ পিএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩ ১১:৪২ এএম
সাত মহাদেশের শততম দেশ ভ্রমণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন রেজাউল ও শারমীন দম্পতি
বাংলাদেশি দম্পতি রেজাউল বাহার ও শাহারিয়াত শারমীন। ২০০৮ সাল থেকে বেড়ানো শুরু করেছেন। একসঙ্গে পৃথিবীর ৯৯টি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন তারা। সাত মহাদেশের শততম দেশ ভ্রমণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন রেজাউল ও শারমীন দম্পতি। চলতি মাসে ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণের মাধ্যমে দেশ ঘুরে-বেড়ানোয় সেঞ্চুরি হাঁকাবেন এই বাংলাদেশি দম্পতি। শত দেশের শত গল্প প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন রেজাউল বাহার। আজ থাকছে প্রথম ৬টি দেশ ভ্রমণ নিয়ে প্রথম পর্ব...
২০০৫-এ বিয়ের পরই শারমীন চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রে। ইউনিভার্সিটির পড়াশোনা শেষ করে মোটামুটি একটা চাকরিতে ঢুকি। দেশে বুয়েটে পড়াশোনা করে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষাটা সহজ ছিল না মোটেই। শুরুতেই জমে থাকা ঋণের বোঝা নিয়ে শুরু, একটা গাড়ি আছে পুরোনো। অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় শারমীনকে বলতাম বাইরে ঘুরতে যাবে কি না, ঘর ছেড়ে এদিক-ওদিক ঘোরা মাত্র। প্রায়ই শারমীন আগ্রহ দেখাত না। দেশ থেকে সব ছেড়ে এখানে এসেছে, সারা দিন এক রুমের এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, বাইরে গেলে ভালো লাগার কথা। কিন্তু কোথায় যেন আগ্রহ নেই। আমার বুঝতে বেশ সময় নিয়েছে। মূলত সে বাইরে যেতে চাইত না গাড়ির তেল আর এদিক-ওদিক টাকা খরচ হবে বলে, তখন আমাদের হিসাবের টানাটানি।
এরপর কেটে গেছে বছর তিনেক, শারমীন নিজেও উচ্চশিক্ষাটা শেষ করল এখানকার এক ইউনিভার্সিটিতে, নিজে চাকরিতে ঢুকল। ধীরে ধীরে আমাদের আর্থিক অবস্থার কুয়াশা কাটতে শুরু করল। সে সময়টায় আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ছিল খুবই বেসিক। হাতে গোনা কটা চ্যানেল। ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ট্রাভেল চ্যানেল এগুলোই চলতে থাকত। টিভিতে দেখতাম সামান্থা ব্রাউন (Samantha Brown) বা অ্যান্থনি বোর্ডিন (Anthony Bourdain) ঘুরে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। দুই যুগ পরে আজ মনে হয় হয়তো কোথাও ওই টিভি শোগুলো আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে ঘর ছেড়ে বের হওয়ায়।

আর্থিক কারণেই প্রথম দিকে আমাদের দেশের বাইরে যাওয়া হতো না, ঘুরেছি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অনেক স্টেট। প্রথম দুজন দেশের বাইরে যাওয়া হয় ক্যারিবিয়ানের বাহামাস দ্বীপপুঞ্জে। শুরুটা সেই। আমাদের পাসপোর্ট তখন বাংলাদেশের। দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করতে হয়, অনেক সময় অ্যাম্বাসিতে গিয়ে হাজির হতে হয়।
সময়, অর্থ, ভিসা এসব মিলিয়ে দেশের বাইরে খুব বেশি যাওয়া হতো না। পাশের দেশ মেক্সিকো, সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশ পানামা, আরও কয়েকটি ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, এসবের বাইরে একবার ইউরোপ থেকে ঘুরে এলাম। একসঙ্গে পাঁচ দেশ। পাঁচ দেশ হলেও এরা সব গা-ঘেঁষা।

বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ নিয়ে গঠিত উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের উপকূলীয় অঞ্চল, বেনেলাক্স দেশ নামেও পরিচিত নিম্ন দেশ। তাদের নামের প্রাথমিক অক্ষর থেকে এগুলো একসঙ্গে বেনেলাক্স দেশ হিসেবে পরিচিত। দেশগুলোর পুবে জার্মানি এবং দক্ষিণে ফ্রান্সের সীমানা রয়েছে।

এ পাঁচটি দেশই আমাদের প্রথম ইউরোপ ভ্রমণ। ভ্রমণ তখন প্রথম পর্যায়ে। কনফর্ট জোনের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই পুরো পরিকল্পনা মূল শহরগুলো ঘিরে যেখানে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন ব্যবহার করা যাবে। ইউরোপের দেশ ও বড় শহরগুলোর মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ ভালো, বড় শহরগুলোয় আছে পাতালরেল, মেট্রোরেল। ভ্রমণে যাওয়ার আগেই গুগল (Google) আর ট্রিপ অ্যাডভাইজরের (Tripadvisor) বদৌলতে মোটামুটি হিসাব করা হয়ে গেছে কবে কখন কোথায় যাব, কী কী দেখব। বিষয়গুলো সহজ, একটু রিসার্চ করে ঘর ছেড়ে বের হলেই হয়।

আমস্টারডাম (নেদারল্যান্ডস) থেকে ব্রাসেলস (বেলজিয়াম), সেখান থেকে প্যারিস (ফ্রান্স), লুক্সেমবার্গ, কোলন (জার্মানি) মাত্র ১০ দিনের ট্রিপ, পাঁচ দেশ ভ্রমণ। ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায় এ শহরগুলো খুব কাছাকাছি, হাই স্পিড বা রেগুলার ইউরো রেল সব শহরকেই যুক্ত করে রেখেছে। প্যারিস মানেই আইফেল টাওয়ার, লুভর মিউজিয়াম, ব্রাসেলস শহর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের রাজধানী, আমস্টারডাম শহরে খাল কেটে ঘরবাড়ি চারদিকে, প্রাণবন্ত এক শহর। পুরোনো দুর্গের ছোট শহর লুক্সেমবার্গ, আর জার্মানির কোলন শহর মানেই ক্যাথেড্রাল (ডোম), ১১ শতাব্দীর পুরোনো চার্চ, পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী চার্চের ঘণ্টা; যার ওজন ২৬ টন ঝোলানো আছে এই শতাব্দীপুরোনো বিল্ডিংয়ের মিনারে।

আয়তনের দিক থেকে ইউরোপের ছোট দেশ গুলোর মধ্যে সপ্তম এবং বিশ্বের ২০তম ছোট রাষ্ট্র লুক্সেমবার্গ। পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে শাসন কাজ পরিচালনা করছে রাজা। অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীতে রাজতন্ত্রের উদাহরন বহনকারী পৃথিবীর একমাত্র দেশ । সেই জন্য লুক্সেমবার্গকে বলা হয় গ্র্যান্ড ডাচি রাষ্ট্র।

কলোন গির্জা জার্মান ক্যাথলিক ও গোথিক স্থাপত্যের একটি বিখ্যাত স্মৃতিস্তম্ভ যা ১৯৯৬ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এটি জার্মানির একটি দর্শনীয় স্থান এখানে প্রতিদিন গড়ে ২০,০০০ মানুষকে এখানে ঘুরতে আসে। ১২৪৮ সালে কলোনের ক্যাথিড্রাল নির্মাণ কাজ শুরু হলেও ১৪৭৩ সালে এটি স্থগিত হয়। এবং ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজটি পুনরায় শুরু হয়, ১৮৮০ সালে এ ভবনটি মূলত মূল মধ্যযুগীয় পরিকল্পনায় সম্পন্ন হয়। আমরা এই গির্জা অবাক বিস্ময়ে দেখি। মানুষ যখন অবাক হয়ে পৃথিবী দেখে, অবাক পৃথিবীও দ্বার খুলে দৃষ্টিসীমানায়।