হাওয়াই মিঠাইওয়ালা
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৩ ১২:১৫ পিএম
আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৩ ১৯:২১ পিএম
হাওয়াই মিঠাই বিক্রেতা সাইদুর রহমান
‘মিঠাই নেবে মিঠাই, হাওয়াই মিঠাই’- এমন হাঁকডাক আর ঘণ্টার টুংটাং শব্দে জেগে উঠেছে শহরের পাড়াগুলো। ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে পিছু হাঁটছে এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালার। সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার অলিগলিতে এভাবেই হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছিলেন সাইদুর রহমান।
লোভ সামলাতে না পেরে এগিয়ে গিয়ে শিশু-কিশোরদের দলে যোগ দিলাম। দাম জানতে চাইলে বললেন, ‘চিনির দাম বাড়লেও আমার মিঠাই মাত্র দুই টাকা।’ মিঠাই কিনতে কিনতে কথা হলো তার সঙ্গে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, মাথায় সংসারের বোঝার ভার। জানালেন, নিজেই তৈরি করেন মিঠাই। তারপর সেগুলো ফেরি করে বিক্রি করেন। প্রতিদিন ৩০০-৫০০ টাকার মিঠাই বিক্রি হয়। একটা সময় খুব বিক্রি হতো। এখনকার শিশুরা চিপস, চকলেট খেতে চায়। অনেকে তো চিনেই না হাওয়াই মিঠাই। গ্রামে গ্রামে ঘুরলে ভাঙারি জিনিসপত্র পাওয়া যায়, তা বিক্রি করে বাড়তি কিছু টাকা আয় হয়। কিন্তু তার পক্ষে এত পরিশ্রম করা সম্ভব হয় না। বাতের ব্যথার কারণে বেশি হাঁটতে পারেন না।
মুখে দিলে নিমেষেই মিলিয়ে যায় বলে এর নাম হাওয়াই মিঠাই। কেউ বলেন ‘বুড়ির চুল’, কেউ বলেন ‘মাকড়সার জাল’। ইংরেজিতে রয়েছে এর কিছু মজাদার নাম; যেমন- কটন ক্যান্ডি, ফেয়ারি ফ্লস কিংবা ক্যান্ডি ফ্লস।
বাংলাদেশে ধান কাটার মৌসুমে গ্রামে দেখা পাওয়া যায় এমন ফেরিওয়ালাদের। এ ছাড়া পহেলা বৈশাখ, চৈত্রসংক্রান্তি, ঈদ, পুজোসহ বিভিন্ন মেলায় দেখা যায় হাওয়াই মিঠাই বানানোর ব্যস্ততা। হাওয়াই মিঠাই বানাতে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। একটি মেশিন, স্পিরিট, চিনি, তেল আর খাবারের রঙ। মেশিনের উপরিভাগের থালার মতো জায়গার মধ্যে ছিদ্রতে ঠিকঠাক উপকরণ দিয়ে চাকা ঘুরালেই রূপ নেয় বর্ণিল হাওয়াই মিঠাই।

ইতিহাস বলছে, চৌদ্দ শতকে ইতালিতে চিনি দিয়ে তৈরি মজার খাবারটির প্রচলন শুরু হয়। ১৮৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়াম মরিসন ও জন সি ওয়ারটন হাওয়াই মিঠাই তৈরির প্রথম মেশিন আবিষ্কার করেন। তবে এর প্রসার বাড়ে ১৯০৪ সালে। সে বছর মরিসন এবং ওয়ারটন তাদের মেশিন নিয়ে হাজির হন সেন্ট লুইসের বিশ্ব মেলায়। মেলায় বিশাল অঙ্কের হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হয়েছিল। এরপর ক্রমেই বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় হাওয়াই মিঠাই।
ফিরে আসা যাক সাইদুর রহমানের কথায়। টিনের সবুজ বাক্সের ভেতর গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই। আবদার করলাম ছবি তোলার। মুখে একফালি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ক্যামেরার সামনে। আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘কত লোক তো আমার ছবি তুলে লন্ডন, এমরিকা নিয়া গেছে, কিন্তু আমার তো কোনো উন্নতি হইল না।’ ৪০ বছর যাবৎ হাওয়াই মিঠাই নিয়ে ঘুরলেও সাইদুর রহমানের ভাগ্যের চাকা যেন ঘুরতে চাইছে না। স্ত্রী আর তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার। মিঠাই বিক্রি করে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া করিয়েছেন। একমাত্র ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে। অর্থাভাবে লেখাপড়া চালাতে পারেননি। এখনও কত রঙিন স্বপ্ন দেখেন সাইদুর রহমান। কিন্তু লাল কিংবা গোলাপি হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো তার জীবনের স্বপ্নগুলোও যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।