মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৫১ পিএম
ছবি : জাকির হোসেন চৌধুরী
শিশু তো শিশুই। সে যে লিঙ্গেরই হোক না কেন। সব শিশুর সমান অধিকার। এখানে কন্যাশিশু বলে আলাদা কিছু কীভাবে এলো? কন্যাশিশুর জন্য আলাদাভাবে তার প্রাপ্য চাইতেই বা হবে কেন? এ বিভেদ কারা সৃষ্টি করল? তারা কি এটাই চায় যে নারী পিছিয়ে থাকুক। এ বিভেদ, বিভাজন নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
আমরা উন্নয়নে নারীর সমান অধিকারের কথা মুখে বলি বটে, তবে সেটা বাস্তবে দেখা যায় কমই। কারণ নারীকে আমরা শিশুকালেই আলাদা করে ফেলেছি; কন্যাশিশু নামে। যেখানটায় তার পাওনাগুলোই আবার তাকে চাইতে হয়, সংগ্রাম করতে হয়।
বউমা মাছের মাথাটা মাহিনকে দাও, ও ছেলেমানুষ। ওর পুষ্টির দরকার আছে। শাশুড়ির এ কথা পুত্রবধূ মেনে নিলেও মাহিনের বোন সামিয়ার কাছে খটকা লাগে। দুজনই পিঠাপিঠি। সামিয়ারও মাথা খেতে মন চায়। কখনও কখনও আবদার করলেও সেটা কেউ শোনেনি। আজ সামিয়া বড় হয়েছে। এখন সে বুঝতে পেরেছে বিভাজনটা ছোটবেলাই করা হয়েছে। অথচ দুজনেরই সমান অধিকার পাওয়ার কথা ছিল। কর্মজীবনে মাহিন সামিয়া দুজনেই চাকরি করে। মাহিন আলাদা সংসার পেতেছে। মা-বাবার সেভাবে খোঁজখবর না নিলেও সামিয়া ঠিকই নেয়। তবে সামিয়া তার ছেলেমেয়ে দুজনকে এক চোখেই দেখে। শিশুকালে বিভাজনের যে চিত্র সে দেখেছে সেটা ছেলেমেয়েরা দেখুক, তা একদমই চায় না।
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি মা-বাবা ভাইকে প্রাধান্য দেন। তার কিছু লাগবে কি না, সে কী পছন্দ করে তা জিজ্ঞাসা করেন। অথচ আমার কাছে কিছুই জানতে চাইতেন না। নিজেদের পছন্দমতো কিছু এনে চাপিয়ে দিতেন। আমার খুব খারাপ লাগতÑ কথাগুলো বলছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা মুনা রহমান।
এখনকার কন্যাশিশুরা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। এর কারণ সম্পর্কে মনোবিজ্ঞানী ডা. ইশরাত শারমিন রহমান বলেন, ‘বাবা-মা শিশুদের সঙ্গে ছোটবেলায় যে আচরণ করবেন তার ওপর নির্ভর করে শিশু আত্মবিশ্বাসী হবে কি হবে না। ছোটবেলা থেকেই কন্যাশিশুর মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। তাকে কথা বলতে দিতে হবে। বাবা ও মায়ের মধ্যে যে সম্পর্ক শিশু দেখে তার ওপর ভিত্তি করে নিজের অবস্থান ঠিক করে নেয় শিশু। সে যদি দেখে পরিবারে বাবাই সব সিদ্ধান্ত নেয়, মায়ের কোনো বক্তব্য থাকে না; এমন পারিবারিক পরিবেশ মেয়েশিশুদের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে।’

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশগুলোর একটি। ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার কনভেনশনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘১৮ বছরের কম বয়সি সব মানুষই শিশু।’এখানে কন্যাশিশু বলে আলাদা কিছু আদৌ উল্লেখ করা হয়নি। ১৯৭৪ সালে শিশু অধিকার আইন প্রণয়ন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা-৪-এ বলা হয়েছে, ‘বিদ্যমান অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হইবে।’
বাংলাদেশে কন্যাশিশুর সংখ্যা কয়েক কোটি হলেও তারা নানাভাবে এখনও অবহেলিত। নিরাপত্তাহীনতা আর অপুষ্টির শিকার ঘরে-বাইরে সবখানে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র তারা নির্যাতনের শিকার। এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে জাতীয় অ্যাডভোকেসি ফোরামের গবেষণায়। সংস্থাটির সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলছে, গত আট মাসে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭০ শিশু। এই সময়ে মোট ধর্ষণের পরিমাণ ৪৯৩। একই সময়ে ৩৬ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন ও ১৮১ শিশু বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে। পাশাপাশি ১৩৬ শিশু হত্যার শিকার। সংস্থাটির হিসাবে বাল্যবিবাহের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ২০২২-এর তুলনায় ২০২৩ সালে প্রায় ২৬ শতাংশ বাল্যবিবাহ কমেছে।
২০১২ সাল থেকে প্রতি বছরের ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। প্রতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিশু সপ্তাহ পালন করা হয়। দেশে ৩০ সেপ্টেম্বর পালন করা হয় জাতীয় কন্যাশিশু দিবস হিসেবে। মূলত কন্যাশিশুদের শিক্ষার অধিকার, খাদ্য ও পুষ্টির সুরক্ষা, আইনি সহায়তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে এ দিবসের সূচনা।