ফরিদ উদ্দিন রনি
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৪২ পিএম
নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ বিষয়ে গবেষণারত দেশের তরুণ গবেষক সাব্বির আহমেদ
‘গ্রীষ্মের বন্ধে বিদেশি শিক্ষার্থীরা যখন বিভিন্ন কাজকর্ম করে বাড়তি টাকাপয়সা রোজগার করত বছরের বাকি সময়টা স্বচ্ছন্দে কাটানোর জন্য, আমি তখন এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে বাইরে কাজকর্ম না করে ল্যাবে কাজ শেখার সুযোগ খুঁজতে থাকি। স্টকহোমের বিভিন্ন ল্যাবে ইমেল করতে করতে একদিন হঠাৎ আমাদের ইনস্টিটিউটেরই এক প্রফেসরের কাছ থেকে তার ল্যাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পর্কিত এক গবেষণার প্রজেক্টে যুক্ত হওয়ার অফার পেয়ে গেলাম।
মজার বিষয় হলো, আমি গ্রীষ্মের ছুটিতে বাইরে কাজ করে যা টাকা উপার্জন করতে পারতাম, তার থেকেও অধিক টাকা আসে এ গবেষণা প্রজেক্টে কাজ করে।’ এভাবেই নিজের গবেষক হয়ে ওঠার গল্প জানাচ্ছিলেন নেদারল্যান্ডসের উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিজেনারেটিভ মেডিসিন’ বিষয়ে গবেষণারত দেশের তরুণ গবেষক সাব্বির আহমেদ।
উট্রেখট ইনস্টিটিউট অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সে ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফার্মাকোলজি’ টিমের সঙ্গে কিডনি রোগের ওপর গবেষণা করছেন সাব্বির। এ টিমের নেতৃত্বে আছেন প্রফেসর ড. রোজ মাজেরেউ। তাদের কাজের লক্ষ্য কিডনি রোগের ওপর বিস্তর গবেষণা করে জিন রিপেয়ার কিংবা রিপারপাজ ওষুধের মাধ্যমে কিডনি রোগ ভালো করার কার্যকর উপায় বের করা এবং আর্টিফিশিয়াল কিডনি তৈরি নিয়ে গবেষণা। সাব্বির বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে কিডনি গবেষণায় প্রাণীর ব্যবহার কমিয়ে তার পরিবর্তে আর্টিফিশিয়াল কিডনি ব্যবহার করা যায়।
বর্তমানে কিডনি রোগ যাচাই করার জন্য রক্তের যেসব পরীক্ষা করা হয় সেগুলো সব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। অনেক সময় দেখা যায় কিডনি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রচলিত রক্ত পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় না, ফলে চিকিৎসা শুরু করতে অনেকটা দেরি হয়ে যায়। তাই প্রাথমিক ধাপেই কিডনির রোগ ধরার উপায় বের করার চেষ্টা করছি আমরা।’
তবে মানুষের ভেতর খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা তৈরি করতে এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে খাদ্যপণ্যসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে এক্সপেরিমেন্ট ভিডিও বানিয়ে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের নামে ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজ ‘Sabbir Ahmed’-এ তুলে ধরার জন্য ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন সাব্বির। তার ভিডিও চিত্রগুলোয় লক্ষ করা যায়, ক্যামেরার সামনে মাইক্রোস্কোপসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের পরীক্ষা চালিয়ে তার মধ্যে থাকা অণুজীবসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ মানুষের শরীরে কী কী রোগবালাই তৈরি করতে পারে তা বিশ্লেষণ করেন।
আমরা কী করে সেসব খাবার ঠিকভাবে গ্রহণ করে অসুস্থতা থেকে রেহাই পেতে পারি তার পথও বাতলে দেন সাব্বির। তবে এ ক্ষেত্রে সাব্বিরের লক্ষ্য থাকে খাবার থেকে শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টির বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গিয়ে যেন কোনো কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, জানান সাব্বির। তিনি বলেন, যে সিস্টেমের ওপর আমাদের ফুডচেন স্থাপিত হয়েছে সেই সিস্টেমের ভুলটাকে ফোকাস করেই মানুষকে সচেতন করা তাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করতে বিজ্ঞানের মজার বিষয়গুলো বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতেও দেখা যায় তার ভিডিওতে।
ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল স্বভাবের ছিলেন সাব্বির। বেড়ে উঠেছেন নারায়ণগঞ্জে। বাবা সোনালী ব্যাংকে কর্মরত থাকার সুবাদে তার কৈশোর কাটে নারায়ণগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের স্টাফ কোয়ার্টারে। পরে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিষয়ের ওপর স্নাতক সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান সুইডেন।
স্কলারশিপ পেয়ে সুইডেনের ক্যারোলিন্সকা ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে মারি-কুরি ফেলোশিপ পেয়ে পিএইচডি করতে চলে যান নেদারল্যান্ডস। পিএইচডির গবেষণা প্রতিষ্ঠান উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়েই বর্তমানে কর্মজীবন পার করছেন তিনি। গবেষণার ফাঁকে ভিডিও বানিয়ে তা আপলোড করে থাকেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।