আইন-আদালত
দিলরুবা শরমিন
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৩ ১২:৩৬ পিএম
আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৩ ১৬:৪৩ পিএম
পাঠকদের আইনগত সমস্যার সমাধানে এই বিভাগ। নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী দিলরুবা শরমিন
প্রশ্ন: হিন্দু ও মুসলিম দুজন মানুষ যে-যার ধর্মেই থাকবে। ধর্ম পরিবর্তন না করে এ অবস্থায় তাদের বিয়ে হবে কোন নিয়মে? দুই ধর্মের নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে কি সম্ভব? তালাকের প্রশ্ন এলে, সেটাও বা হবে কীভাবে?
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ঢাকা থেকে
উত্তর: বাংলাদেশে কেউ ধর্মান্তরিত না হয়ে বিয়ে করতে চাইলে বিশেষ বিয়ে আইনে করতে পারেন। নিচে কীভাবে বিয়েটা সম্পন্ন করতে হবে সংক্ষেপে বলা হলো-
১. এ আইনে বিয়ের সময় বিয়ের পক্ষগণের মধ্যে কারও কোনো জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকতে পারবে না।
২. বিয়ে করতে ইচ্ছুক পুরুষের বয়স ২১ ও নারীর ১৮ বছর পূর্ণ হতে হবে।
৩. পক্ষগণ রক্ত বা বৈবাহিক সম্পর্কে সম্পর্কযুক্ত হতে পারবেন না; যাতে তাদের একজনের ওপর প্রযোজ্য আইন দ্বারা ওই বিয়ে অবৈধ হতে পারে।
৪. বিয়ের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে যেকোনো এক পক্ষ রেজিস্ট্রারের কাছে ১৪ দিন আগে বিয়ের নোটিস পাঠাবেন। যদি এ সময়ের মধ্যে কেউ আপত্তি না করেন, তবে বিয়ে সম্পন্ন করা যাবে।
৫. এ ধরনের বিশেষ বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে রেজিস্ট্রার এবং ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর দানকারী তিনজন সাক্ষীর সামনে। সেই সঙ্গে স্বাক্ষরদানের পর ওই হলফনামা নোটারি পাবলিক কর্তৃক ‘নোটারাইজড’করতে হবে।
৬. আইনের ২২ নম্বর ধারা অনুসারে সহ-উত্তরাধিকারীর ওপর হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন ধর্মাবলম্বী কোনো যৌথ পরিবারের কোনো সদস্যের এ আইন মোতাবেক বিয়ে হলে অনুরূপ পরিবার থেকে তার বন্ধন ছিন্ন হয়েছে বলে গণ্য হবে।
৭. বাংলাদেশের কোনো মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, পারসি, বৌদ্ধ, শিখ বা জৈন নন বা তাদের একজন যেকোনো একটি বা অন্য ধর্মে বিশ্বাসী তাদের মধ্যে বিয়ের ব্যবস্থা করতে হলে বিশেষ বিয়ে আইনের অধীন উপর্যুক্ত বিয়ের ক্ষেত্রে ধর্ম ত্যাগ করা অত্যাবশ্যক। দুই পক্ষই ধর্ম ত্যাগ না করলে বিয়েটি বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে মুসলিম কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলে অন্য ধর্মের কোনো ব্যক্তিকে মুসলিম আইন অনুযায়ীই বিয়ে করতে পারেন।
৮. এ আইনের বিধানে যেকোনো ধরনের মিথ্যা বর্ণনা দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আবেদনকারী যদি বাস্তবে ধর্ম ত্যাগ না করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে ধরা হবে যে, তিনি মিথ্যা বর্ণনা দিয়েছেন।
৯. এ ধরনের বিয়ের ফলে বেড়ে উঠছে নতুন একটি প্রজন্ম। যারা উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয় বহন করছে না। এই উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আবার কেউ কেউ একটি ধর্ম বেছে নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য কোনো আইন নেই।
১০. এ আইনের অধীন বিয়ের ফলে জন্মগ্রহণকারী সন্তান যদি এ আইনের অধীনই বিয়ের ইচ্ছা পোষণ করেন, তবে তার পিতা বিয়ের ক্ষেত্রে যে আইনে রক্তসম্পর্কীয় ও বৈবাহিক সম্পর্কীয় বাধার সম্মুখীন ছিলেন, সে আইন এবং এ আইনের ২ ধারা তার ওপর প্রযোজ্য হবে।
১১. হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ ও জৈন ধর্মে বিশ্বাসী কোনো ব্যক্তি, যিনি এ আইনের অধীন বিয়ে করেছেন, তার সম্পত্তির এবং এ বিয়ের ফলে জাত সন্তানের সম্পত্তির উত্তরাধিকার ‘উত্তরাধিকার আইন, ১৯২৫’ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে।
সরকারিভাবে এমন বিয়ে হওয়ার একমাত্র স্থান পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে। তবে যারা জানেন না, তারা প্রথমে কোর্টে যান। এখানে বিয়ে হলেও ডিভোর্স করানো হয় না। ওটা কোর্টেই করতে হয়।
এ ধরনের বিশেষ বিয়েতে অবশ্যই আপনার লাগবে দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের একটি ফটোকপি। যারা এ রকম বিশেষ বিয়ে করার পরিকল্পনা করছেন, তারা অবশ্যই এ দুটি জিনিস আর বিয়ের সাক্ষী নিতে ভুলবেন না যেন।
আপনারা যারা স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ে করতে চান তারা দাম্পত্য জীবনে সন্তানসন্ততির ধর্ম নির্ধারণে ব্যতিব্যস্ত হবেন না। সন্তান তার নিজ ইচ্ছানুসারে ধর্ম বেছে নেবে।
১৮৭২ সালের আইনটি ১৯৫৪ সালে সংশোধিত হয়ে যা দাঁড়ায়Ñ
১. নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিয়ের একটি বিশেষ রূপ প্রদান করা
২. নির্দিষ্ট কিছু বিয়ে নিবন্ধন করা এবং
৩. বিবাহবিচ্ছেদ করা।
এগুলো ঠিক করে আইনটি যুগোপযোগী করার চেষ্টা করা হয়।