× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে দুঃখের দিনরাত্রি

মেহেদী হাসান রনি

প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১২:৫০ পিএম

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে দুঃখের দিনরাত্রি

দেশের তথা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম যৌনপল্লীর অবস্থান রাজবাড়ী জেলার দৌলতদিয়ায়। জীবিকার প্রয়োজনে সামাজিকভাবে ঘৃণ্য এই পেশায় এখানে যুক্ত আছেন হাজারেরও বেশি নারী। কভিড মহামারি ও পদ্মা সেতু- এ দুই কারণে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর নারীরা বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যৌনপল্লী ঘুরে এসে বিশেষ লেখা...

আজ থেকে ৩৫ বছর আগে ১৯৮৮ সালে গড়ে ওঠে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া যৌনপল্লী। তবে এর বহুকাল আগ থেকে এ স্থানে পতিতাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত অনেকে বসবাস করতেন, বেআইনিভাবে চালাতেন পতিতালয়।

যমুনা ও পদ্মার মিলনস্থল হিসেবে দৌলতদিয়া বিখ্যাত ছিল ফেরিঘাটের জন্য। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে রাজধানী ও অন্যান্য জেলায় পণ্য পরিবহনের ট্রাকগুলো পার হতো দৌলতদিয়া ফেরিঘাট দিয়ে। জ্যাম, গাড়ির চাপ ও অন্যান্য কারণে এ ট্রাকগুলোকে ফেরি পার হতে কখনও কখনও অপেক্ষা করতে হতো দুই থেকে তিন দিন। ফলে সময় কাটানোর জন্য ট্রাক ড্রাইভারসহ অন্যরা দৌলতদিয়ার নারীদের সান্নিধ্যে সময় পার করতেন। রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টাই জমজমাট ছিল দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর ভেতর-বাইর।

তবে বর্তমান সময়ে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে ভালো নেই এ পেশায় জড়িত নারীরা। বলা যায়, খদ্দেরের অভাবে জীবিকা সংকটে মানবেতর জীবনযাপনই করছেন এখানকার যৌনকর্মীরা। এ সংকটের শুরু কোভিড মহামারির প্রকোপের সময়। পরে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন এ পেশার মানুষকে আরও সমস্যাগ্রস্ত করে তোলো। পদ্মা সেতুর কারণে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ব্যবহার প্রয়োজনহীন হয়ে পড়ে। কোভিড মহামারির সময় থেকে এ স্থানে মানুষের আনাগোনা কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যৌনপল্লীর অলিতে গলিতে এখন কান পাতলে শোনা যায় শুধুই হাহাকার।

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে বসবাস প্রায় ৫ হাজার মানুষের। এর মধ্যে যৌনকর্মীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০; যাদের মধ্যে ১ হাজার ৫০ জন নিয়মিত। বাকিরা অনিয়মিত। এখানে বাড়ি রয়েছে ৩০০টির মতো। এ ছাড়া পল্লীর শিশুর সংখ্যা ৬০০। তবে এ পল্লীতে সবচেয়ে কষ্টের সময় পার করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীরা। এখানে বর্তমানে ৩৫০ জন বয়স্ক নারী রয়েছেন।

সরেজমিনে পল্লী ঘুরে দেখা যায়, এখানে এখন আর সেই আগের মতো নেই মানুষের আনাগোনা। পল্লীর অলিগলিতে শুনসান নীরবতা। একটা সময় পল্লীর প্রধান গলিতে সারা দিনই ভিড় লেগে থাকত, সেই গলিও এখন অনেকটাই ফাঁকা। খদ্দেরের আশায় নারীরা সাজাগোজ করে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে এখন আর খদ্দের সেভাবে আসে না বলে জানান বেশ কয়েকজন যৌনকর্মী।

কথা হয় পঞ্চাশোর্ধ্ব ফাতেমার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দিন-তারিখ মনে নেই কবে আসছিলাম। শুধু মনে আছে, যেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয় সেদিন এখানে আমার আসা। আমার বাড়ি ঝিনাইদহ। তিন সন্তান রয়েছে। তারা এই জগৎ থেকে অনেক দূরে। আমি একাই পল্লীতে আছি। আমার বয়স ৫০ বছরের বেশি। পল্লীর ভেতরে মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাই। এখন কাজ পাই না। এখান থেকে চলে যেতে চাই।’

কথা হয় ৫৭ বছর বয়সি ছন্দার (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পল্লীর অবস্থা একসময় বেশ ভালো ছিল। বর্তমানে খুব খারাপ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাটে লোকজন আসে না। সবাই পদ্মা সেতু হয়েই চলাচল করে। আমাদের তাই হাহাকার শুরু হয়েছে। আমরা এখন চলে যেতে চাই। কিন্তু আমাদের তো যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। সরকার যদি আমাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে বেঁচে থাকতে পারব।’ নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া আরেকজন বলেন, ‘দৌতলদিয়া ফেরিঘাটে যখন সারা দিনই গাড়ি চলত, যানজট লেগে থাকত তখন ভালোই ছিলাম। খদ্দের আসত পল্লীতে। কিন্তু এখন কেউ খবর নেয় না। আমরা এখান থেকে এখন চলে যেতে পারলেই আমরা বাঁচি।’


কথা হয় দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর প্রবীণতম পতিতা আমেনা বেগমের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। ষাটোর্ধ্ব এই নারী তার জীবন এবং পল্লীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, ‘আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। গরিব পরিবার, ভাইবোনও বেশি, ফলে বাবা আমাদের ঠিকমতো খাওয়াতে-পরাতে পারেননি। কোনো দিন খেয়ে, কোনো দিন না খেয়েও চলতে হয়েছে। আমার বয়স তখন অল্প, সে সময় আমাদের এলাকায় যশোরের এক পতিতার সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আমাদের অভাব দেখে বাবাকে বললেন, আমেনাকে আমার সঙ্গে দিয়ে দেন। আমি ঢাকায় চাকরি করি। ওইখানে আমেনার চাকরি দিয়ে দেব। বাবাও তার কথায় রাজি হয়ে যান। ঢাকার কথা বলে আমাকে নিয়ে আসা হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ বাজার এলাকার যৌনপল্লীতে। প্রথমে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। তখন তিনি বললেন, এখানে যারা প্রথমে আসে তারা সবাই ভয় পায়। কিছুদিন গেলে যখন হাতে টাকা আসা শুরু হবে, তখন আর ভয় থাকবে না। কয়েক মাসের মধ্যে আমার হাতে বেশ টাকা জমে যায়। কারণ যৌনপল্লীতে নতুনদের চাহিদা বেশি থাকে। বাড়ি গিয়ে বাবার হাতে টাকা তুলে দিয়ে বলেছিলাম, আব্বা আমি তো চাকরি করি তুমি আর চিন্তা কোরো না। মাঝেমধ্যে এসে তোমাকে টাকা দিয়ে যাব তুমি ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়া করাবে। এভাবে ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন কে বা কারা যৌনপল্লীতে আগুন দিলে পুরো পল্লী পুড়ে যায়। তখন কয়েক মাসের জন্য বাড়ি চলে যাই। তিন মাস পর জানতে পারলাম দৌলতদিয়া ঘাটে নতুন করে যৌনপল্লী হয়েছে। বাড়ি থেকে এখানে চলে আসি, সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত আমি এখানেই আছি। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পতিতালয়ের মধ্যে দুটি বাড়ি কিনেছিলাম। বাড়ি ভাড়া যা পেতাম, তা দিয়ে কোনোমতো জীবন পার করতাম। কিন্তু পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর অধিকাশ বাস-ট্রাক সেতু দিয়ে চলে যাওয়ায় মোটরশ্রমিকরা এখন আর আসে না। খদ্দের না পেলে আমার মতো এখানকার মানুষদেরও তো জীবন চালানো দায়।’

২৫ বছর বয়সি আয়েশা বেগম (ছদ্মনাম)। বাড়ি মেহেরপুর জেলায়। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাবা-মার অভারের সংসার। চাকরির কথা বলে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে আসি। বাড়ির সবাই জানে আমি সোয়েটার কারখানায় কাজ করি। বিয়ে করেছি, আমার একটি ছেলেও আছে। ছেলেটির বয়স আট বছর। পতিতালয়ের বাইরে একটি ঘর ভাড়া করে ছেলেকে পড়াশোনা করাতাম। কিন্তু এখন এই পল্লীর যে অবস্থা, তাতে খাওয়া ও ঘর ভাড়ার টাকাই রোজগার করতে পারি না। ছেলেটার পড়াশোনা চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না এখন। অনেক টাকা দেনা হয়ে আছি। এভাবে চললে আরও দেনা হয়ে যাব।’ আয়েশা যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার দুই চোখ বেয়ে ঝরছিল দুঃখের অশ্রু।

দিনাজপুরের সুমি খাতুন (ছদ্মনাম)। বয়স ২৭ বছর। তিনি বলেন, ‘অভাবের কারণে ঢাকায় চাকরির কথা বলে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে আসি ৯ বছর আগে, তখন খেয়ে-পরে ভালোই কাটছিল। কিন্তু এখন আর আগের মতো লোকজন আসে না। তাই নিজের খাওয়ার ও ঘর ভাড়া জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছি। বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠানো অসম্ভব হয়ে গেছে। আমার একটি মেয়ে আছে। ওর বয়স পাঁচ বছর। মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় আছি। ভাবছি মেয়েকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে বিদেশ চলে যাব।’

দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় শুধু যে যৌনকর্মীরাই সংকটে দিনাতিপাত করছেন তাই নয়, এ স্থানের অন্যান্য শ্রেণি-পেশা-ব্যবসার মানুষও সমস্যায় পড়েছেন। কথা হয় এখানে টেইলার্স পরিচালনা করা আলম শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একটা সময় এখানকার নারীদের কাজ করে শেষ করতে পারতাম না। নিয়মিতই ব্যস্ততা থাকত। ঘাটে মানুষ ও যানবাহন কমে যাওয়ায় সেই দিন আর নেই। এখন দিনে একটি বা দুটি কাজের অর্ডার পাই, কখনও পাইও না। এভাবে চললে অন্য কোথাও গিয়ে কাজের সন্ধান করতে হবে।’

পল্লীর নারীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকে ‘অসহায় নারী ঐক্য সংগঠন’ নামে একটি সংস্থা। সংগঠনের সভানেত্রী ঝুমুর বেগম বলেন, ‘এ পল্লীর আগের অবস্থা আর নেই। সবচেয়ে কষ্টে আছেন বয়স্ক নারীরা। এ সংখ্যাও কম নয়, ৩৫০। তারা চরম খাদ্যসংকটে ভুগছেন। তারা এখন অন্য কোথাও চলে যেতে চান।’

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন সম্প্রতি সরেজমিনে দেখতে এসেছিলেন দৌলতদিয়া যৌনপল্লী। তিনি বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় যৌনপল্লী দৌলতদিয়া। পদ্মা সেতু চালুর পর এখানে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। আমি সরেজমিনে সেখানে গিয়েছিলাম। পল্লীর সবাই আমাদের সমাজের অংশ। সেখানে কয়েকটি সংস্থা কাজ করে। আমি নির্দেশনা দিয়েছি এখানকার ৫০ বছরের ওপরের নারীদের তালিকা প্রস্তুত করতে। তাদের কীভাবে পুনর্বাসনে করা যায়, এ বিষয়ে ওপরমহলের সঙ্গে কথা বলে একটা ব্যবস্থা করবও আগামীতে।’

 *গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা