শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৪:০০ পিএম
আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২৩:২৩ পিএম
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট ওপরে সবুজ উপত্যকা আর শান্ত হ্রদেঘেরা কাশ্মিরে এসে আপনার কাছে মনে হবে, সময়টা বুঝি হঠাৎ থেমে গেছে। সবকিছু ছবির মতো। কোটি কোটি বুনো ফুলে ঢাকা উপত্যকায় ছুটে বেড়ানো ঘোড়ার দল, পাইন, গভীর গিরিখাদের নিচে উন্মত্ত পাহাড়ি নদী। সব মিলিয়ে যেন স্বপ্ন দেখার মতো অভিজ্ঞতা। লিখেছেন শহীদুল ইসলাম

গুলমার্গ
কাশ্মিরের মধ্যে ‘গুলমার্গ’ সবচেয়ে বেশি সুন্দর মনে হয়েছে আমার কাছে। কাশ্মিরে যেখানেই ঘুরতে যান, চেষ্টা করবেন সকাল ছয়-সাতটার মধ্যে হোটেল থেকে বেরিয়ে যেতে। কারণ শ্রীনগর থেকে সবগুলো জায়গা বেশ দূরে। এ কারণে স্পটগুলোতে যেতে দু-তিন ঘণ্টা লাগে।
এবার চলে আসি গুলমার্গ ভ্রমণের বিস্তারিত গল্পে। হোটেল থেকে চেকআউট করে বেরিয়ে যাই কারণ আমাদের পরিকল্পনা ছিল রাতে ডাল লেকের হাউসবোটে থাকব। প্রথমে হোটেল থেকে বেরিয়ে অটোরিকশায় চড়ে আমরা বটমল বাসস্ট্যান্ডে চলে যাই। এরপর বটমল থেকে মিনিবাসে উঠে শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ডে চলে যাই। শ্রীনগর বাসস্ট্যান্ড থেকে অনেক জায়গায় যাওয়ার লোকাল গাড়ি পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে আমরা সকালের নাশতা সেরে নিই। নাশতা করার পর আমরা লোকাল গাড়িতে করে টানমার্গ চলে যাই।

গুলমার্গ পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল। আশপাশের সবকিছু অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। অনেক বড় বড় পাইনগাছ ছিল। আমরা সেগুলোর ওপর দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওপরে (Kungdoor) পৌঁছানোর পর মনে বুঝতে পারলাম কাশ্মিরকে কেন ভূস্বর্গ বলা হয়। দুনিয়া এত সুন্দর হতে পারে সেটা কখনও কল্পনাও আমরা শুধু প্রথম ধাপে গিয়েছিলাম কারণ প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপ কোনোটাতেই বরফ ছিল না। কিন্তু আপনাদের প্রতি পরামর্শ থাকবে যদি সাধ, সাধ্য এবং সময় থাকে তাহলে দ্বিতীয় ধাপেও যাবেন। দ্বিতীয় ধাপের উচ্চতা ১৩ হাজার ফুট, সেখানে উচ্চতায় মানুষের শ্বাস-প্রশাসজনিত সমস্যা হতে পারে। তাই শারীরিক অবস্থা ভালো না হলে সেখানে যাওয়া উচিত না। আমরা গুলমার্গের পাহাড়ে বেশ কিছু সময় থাকার পর আবারও গন্ডোলা রাইডে নিচে নেমে আসি। সেখান থেকে আমরা একইভাবে আবার শ্রীনগর ফিরে যাই। শ্রীনগর ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত আটটা বেজে গিয়েছিল। আপনারা চাইলে জম্মু থেকে আসার সময় যে গাড়িতে করে আসবেন, ওনার সঙ্গে যেখানে যেখানে যাবেন, সেগুলো উল্লেখ করে বাকি দিনগুলোর জন্য গাড়ি ভাড়া নিয়ে নিতে পারেন।
গন্ডোলা রাইড সমাচার : গুলমার্গে দুই ধাপের কেবল কার বা রোপওয়ে আছে, যা গন্ডোলা রাইড (Gondola Ride) নামে পরিচিত। নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে গেলে এক ধাপ উঠলেই বরফ দেখা যায়। আর বাকি সময়ে গেলে দ্বিতীয় ধাপে উঠলে বরফ মেলে।
প্রথম অংশের উচ্চতা ৮ হাজার ৫০০ ফুট প্রায় এবং সময় লাগে ৯ মিনিট। সেখানে থেকে আবার ১২ মিনিট লাগে দ্বিতীয় ধাপে যেতে। দ্বিতীয় ধাপের উচ্চতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। সকাল ১০ থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চালু থাকে। টিকিট কাটার শেষ সময় বিকাল চারটা পর্যন্ত।
সোনমার্গ
প্রথমে খাঙ্গান যেতে হবে, সেখান থেকে সোনমার্গ। শ্রীনগর শহর থেকে আমরা প্রথমে বাসস্ট্যান্ডে যাই। সেখান থেকে খাঙ্গানের লোকাল গাড়ি পাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া ১৫০ রুপি। এরপর খাঙ্গান পৌঁছে সেখান থেকে সোনমার্গের জন্য অন্য গাড়িতে উঠি, যার জন্য জনপ্রতি ভাড়া গুনতে হয়েছিল ১২০ রুপি। কাশ্মিরের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা মনে হয়েছে এটা। এটা মূলত শ্রীনগর থেকে লাদাখ যাওয়ার রাস্তা।
সোনমার্গ পৌঁছে আমরা প্রথমে দুপুরের খাবার খেয়ে নিই। শীতকালে কেউ গেলে যোজিলা পাস যাওয়ার জন্য রাস্তা খোলা পাবেন বলে মনে হয় না। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, শীতকালে অতিরিক্ত তুষারপাতে সোনমার্গ যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ হয়ে যায়। সোনমার্গে গেলে সেখানে ঘোড়া দিয়ে ঘুরতে পারেন। আমরা যেভাবে গিয়েছিলাম একইভাবে শহরে ফিরে আসি।

পেহেলগাম
আজকের দিনে আমরা চেষ্টা করেছিলাম ঘুরে সেখান থেকে একই গাড়িতে করে জম্মু শহরে ফেরত যেতে। কিন্তু কোনো গাড়ি যেতে রাজি হয়নি। তাই আমরা পেহেলগামের জন্য একটি গাড়ি ভাড়া করি ২৮০০ টাকায় এবং শর্ত ছিল আমরা চাইলে সেই গাড়িতে করে আবার শ্রীনগর শহরে ফেরত যেতে পারি। শ্রীনগর থেকে যাওয়ার সময় আমরা সঙ্গে সবকিছু নিয়ে রওনা দিয়ে নিই, যেন চাইলে জম্মু চলে যেতে পারি।
পেহেলগামে বেশ কয়েকটি ট্যুরিস্ট স্পট আছে। সবগুলো এক দিনে ঘোরা প্রায় অসম্ভব। আর সেখানে ঘোরার জন্য আলাদা গাড়ি ভাড়া করতে হয়। আপনি সঙ্গে রিজার্ভ করা গাড়ি নিয়ে গেলেও লোকাল ট্যুরিস্ট স্পটগুলোতে ঘুরতে পারবেন না। সেখানে সিন্ডিকেট করে রাখা।
পেহেলগামে পৌঁছাতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে আমরা হালকা খাওয়া-দাওয়া করে বাইসারানের উদ্দেশে রওনা দিই। এই বাইসারান নাকি পেহেলগামের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। যাওয়ার জন্য আমরা পনির রাইড (ঘোড়া) নিয়েছিলাম। কাশ্মির ভ্যালি, দাবায়ান এবং বাইসারান ঘোরানোর জন্য ভাড়া করেছিলাম। কিন্তু যাওয়ার পর দেখলাম সবগুলো এক রাস্তাতেই পড়ে। এর মধ্যে বাইসারান ছাড়া বাকি দুটো কিছুই না। বাইসারান পৌঁছানোর পর মনে হচ্ছিল যেন অন্য এক পৃথিবীতে চলে এসেছি। বিস্তীর্ণ ভ্যালি তার পেছনে অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। আমরা শীতকালে যায়নি, তাই এর আসল সৌন্দর্য দেখতে পাইনি। শীতকালে বাইসারানের সৌন্দর্য বলে প্রকাশ করার মতো না।