ইসতিয়াক আহমেদ
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৩:২৩ পিএম
চিংড়িঘেরের ওপর ইকো ফ্রেন্ডলি কটেজ
ছোট ক্যানেল ঢুকে গেছে গভীর বনে
মনের মাঝে সুন্দরবন ঘোরার বাসনা থাকে না এমন বাংলাদেশি খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু সুন্দরবন মানেই অনেক টাকা খরচ। জাহাজে রাতে থাকা। এ যাত্রায় সেই পথে না গিয়ে একটু ভিন্ন পথেই সুন্দরবন ঘুরতে তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম দলবল পাকিয়ে। নিজে হেঁটেই বাঘের নিয়মিত বিচরণ কেন্দ্রে ঘুরে বেড়ানোর মাঝে আছে এক ধরনের গা ছমছমে কিন্তু রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বাগেরহাট ঘুরে এসে পড়লাম আমরা মোংলায়।
আমরা মূলত যাব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের দক্ষিণ চিলা গ্রামে। আর তাই মোংলা পৌঁছেই আমাদের প্রথম কাজ পশুর নদী পাড়ি দেওয়া। এক্ষেত্রে জনপ্রতি ৫ টাকা নৌকা ভাড়া আর ১ টাকা ঘাটের টোল প্রদান করে নদী পার হলাম। যেতে হবে আরও পথ। তাই দামাদামি করে ২২০ টাকায় একটি অটো রিজার্ভ নিলাম। প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এবার আমাদের বৈদ্যমারী যাওয়ার পালা, সেখানেই আছে বনের ধারে আমাদের রাত কাটানোর ঠাঁই। সুন্দরবনকে এখানকার স্থানীয়রা মূলত বাদাবন বলেই ডাকে। চিংড়িঘের ঘেরা গ্রামীণ ব্যাপক ন্যাচারাল বিউটি গিলতে গিলতে আমাদের ছুটে চলা দক্ষিণ চিলা পথে।
প্রায় ৩০ মিনিট পথচলার পর অতঃপর আমরা এসে পৌঁছালাম দক্ষিণ চিলায়। বেশ গহিনে এই গ্রাম হলেও আধুনিক জীবনযাত্রায় অনেক কিছুর ছোঁয়া পাবেন এখানে। এখানে আছে বিদ্যুৎ, আছে মোবাইলের ফোরজি নেটওয়ার্ক। ঘরে বসে সুন্দরবনের পাখপাখালির ডাক। হেঁটে সুন্দরবনের অপার সৌন্দর্য উপভোগ। নিরাপত্তার সঙ্গে নিশিযাপন। মানসম্মত খাবার গ্রহণ। সেই সঙ্গে স্বল্প খরচে লোকালয় থেকে খুব কাছে ভ্রমণ করেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন উপভোগের সুযোগ। এসব কিছুই একসঙ্গে পেতে মূলত আমরা ছুটে এসেছি এই বাদাবনে।
স্থানীয় গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও পর্যটন বিকাশের স্বার্থে স্থানীয় কিছু এনজিওর সহায়তায় কমিউনিটি ইকো ট্যুরিজমের অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে চাঁদপাই ফরেস্ট রেঞ্জের আওতায় গড়ে তোলা হয় বেশ কিছু থাকার মতো জায়গা। এই এলাকার স্থানীয় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোই মূলত কেউ দেবে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে, কেউ করবে দুপুরের খাবারের বাজার সরবরাহ, কেউবা করবে রান্না, কেউ আবার ক্যানেল ক্রুজিং করিয়ে নিয়ে আসবে আপনাদেরকে। এমনিভাবে স্থানীয় সব মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতেই স্থানীয় এনজিওর উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে কয়েকটি কটেজ।
বনে যাওয়ার আগেই ব্যাগ বস্তা রাখা দরকার, তাই প্রথমেই কটেজে যাওয়া। কটেজে প্রবেশ পথের শুরুতেই পড়বে পুকুর আর তার পাড়ে রিসিপশন ও ডাইনিং এরিয়া। পুকুরের ওপরেও রয়েছে বসে আড্ডা দেওয়ার মতন সুন্দর ব্যবস্থা। এখানে রিসিপশন ও ডাইনিং রুমটিরও কিছু বিশেষত্ব আছে। এখানে প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো সুন্দরীগাছের কঙ্কাল দিয়েই তৈরি তাদের বসার সোফা। সেই সঙ্গে প্রায় শতবর্ষী কিছু টালি ব্যবহার করা হয়েছে ছাদ তৈরিতে।
চিংড়িঘেরের ওপর সম্পূর্ণ ইকো ফ্রেন্ডলি ইকুইপমেন্ট দিয়েই বানানো দুটি কটেজ, যে দুটি আপাতত আজ রাতের জন্য আমাদের। যার একটির নাম শুশুক, আরেকটি ইরাবতী। মূলত দুটি কটেজের নামই ডলফিনের দুটি প্রজাতির নামে। এই দুই প্রজাতির ডলফিনের দেখা পাবেন এখানে। ওপরে গোলপাতার ছাদ। তার ভেতরে বাঁশ, বেত আর কাঠ দিয়ে তৈরি এই স্থাপনা। এসেই ফ্রেস হতে চলে এলো আমাদের জন্য দেশি স্থানীয় ফল। স্থানীয় গাছের আমড়া মাখানো। খেয়ে দেয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম। সেই সঙ্গে রুমে লাগোয়া সিটিং এরিয়ায় বসে আড্ডা দিতে দিতে আর চিংড়িঘেরে আনলিমিটেড নৌকা চালাতে চালাতেই ডাক পড়ল লাঞ্চের।

এ যাত্রায় দুপুরের খাবারের আয়োজন হিসেবে আছে ঘেরের চিংড়ি, আছে স্থানীয় দেশি মুরগির মাংস, আলুভর্তা, ভারী ডাল, স্থানীয় বিষমুক্ত অর্গানিক সবজি, সঙ্গে স্থানীয় অসাধারণ স্বাদের মিষ্টি দই। নানান সময় নানান রিসোর্ট বা কটেজে দলবেঁধে ঘুরলেও খানিকটা ব্যতিক্রম এ যাত্রায়। এই প্রথম প্রত্যেকটি সদস্যই মুগ্ধ খাবারের স্বাদে। খাবার খেয়ে এবার খানিক বিশ্রাম নেওয়ার পালা। এখানে ঘেরের সঙ্গে লাগোয়া আছে হ্যামক, আছে বিচ চেয়ার। সেগুলোতে বসে বা শুইয়ে কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব পুরো একটা বেলা। কিন্তু আমাদের হাতে সময় কম। কারণ বিকাল হলেই বেরিয়ে পড়ব ক্যানেল ক্রুজিংয়ে।
বিকাল ৫টা ছুঁইছুঁই, ছোট দিনের বেলা এখন তাই বেরিয়ে পড়লাম লিটন ভাইয়ের সঙ্গে আমরা। মো. লিটন জমাদ্দার ভাইয়ের মূলত স্বপ্নের প্রজেক্ট এই বাদাবন ইকো কটেজ। তিনি একজন প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডও। মাত্র ৫ মিনিটের পথ হেঁটেই আমরা ঢুকে পড়লাম সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী বন বিট অফিসে। এখান থেকেই মূলত সংরক্ষিত বনের শুরু। আমাদের ভাগ্য কিছুটা খারাপ, কারণ এখন চলছে ভাটা। জোয়ার আসবে গভীর রাতে। আর তাই নৌকা নিয়ে ক্যানেল ক্রুজিং আর কপালে নেই এই যাত্রায়। তাই হেঁটেই ঢুকে পড়লাম আমরা সুন্দরবনের ভেতরে, সেই সঙ্গে লিটন ভাইয়ের কাছ থেকে শুনতে থাকলাম বাঘ নিয়ে তাদের নানান বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা। বনের খানিক ভেতরে ঢুকতেই প্রথমেই দেখা পেলাম এক বনবিড়ালের পায়ের ছাপ, যা পেরিয়ে একটু সামনেই একটি বটগাছ, এই গাছের একটা বিশেষত্ব আছে, এই গাছের গোড়াতে মুসলিম মৌয়াল বা বাউয়ালরা কালু গাজীর নামে শিরনি মানত করে।

আধ্যাত্মিক কালু গাজীর প্রসঙ্গ যখন উঠে তখন সুন্দরবনের মানুষ জানায় তারা কালু গাজীকে সাধক ও দরবেশ মনে করে এবং দাবি করে যে তিনি বনে হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পথ দেখিয়ে লোকালয়ে নিয়ে আসতেন, বাঘের মুখ থেকে বাঁচাতেন, বন্য শূকরের কবল থেকে উদ্ধার করতেন।
চাঁদপাই রেঞ্জের এই এরিয়াতে বাঘের আনাগোনা একটু বেশিই। কাদা মারিয়ে আমরা পথ চলছি এমন সময় জানা গেল বৈদ্যমারীর টহল ফাঁড়ির দক্ষিণে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে। পথ ঘুরে সাঁকো পেরিয়ে বনের কোলঘেঁষা পথ ধরে ছুটলাম আমরা। খাল পেরিয়ে খানিক গহিনে ঢোকার মুখেই বাঘের পায়ের ছাপ। অভিজ্ঞজনরা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলল, এই বাঘের পায়ের ছাপ কয়েক ঘণ্টা আগের। কারণ এখনও জোয়ার আসেনি। জোয়ার এলে ছাপ মুছে যেত কিংবা একটা পলি অন্তত পড়ত ছাপের ওপরে। কিন্তু এই ছাপে কোনো পলি নেই। পায়ের ছাপ ধরে আরেকটু আগাতেই দেখি ছাপ চলে গেছে বনের আরও গহিনে। এই পথে প্রবেশ একদমই নিষেধ। তাই ফিরতি পথ ধরলাম।
লিটন ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে শুনছিলাম তার অভিজ্ঞতার কথা, নিজ চোখে বাঘ দেখা কিংবা বাঘে ধরা মানুষের বীভৎস লাশ উদ্ধারের কথা। বৈদ্যমারীর এই স্থানের পূর্বে সেই শরণখোলা রেঞ্জ আর দক্ষিণে চাঁদপাই রেঞ্জ সুন্দরবনের। ঘুরেফিরে সন্ধ্যা হতে চলল, যখন-তখন ফিরলাম আমরা কটেজে। ফ্রেস ট্রেস হয়েই দেখি সন্ধ্যার স্ন্যাকস হিসেবে হাজির গরম গরম পিঁয়াজু আর ধোঁয়া ওঠা গরম চা। সুন্দর করে পরিবেশন করা খাবারের স্বাদের সঙ্গে সঙ্গে রূপেও আপনাকে মুগ্ধ করবে। সন্ধ্যার অসাধারণ নীলচেলাল আকাশের নিচে ঘেরের ধারে সিটিং এরিয়াতে বসে চা খেতে খেতে হারিয়ে যাবেন অসাধারণ অনুভূতি মাঝে- সেই গ্যারান্টি এ যাত্রায় আমি দিতে পারি।

সন্ধ্যার পর আমরা আড্ডা গল্প গানে পার করলাম। সেই সঙ্গে করলাম মাছ ধরার বৃথা চেষ্টা। কেউ কেউ আবার রাতের আঁধারেই নৌকা নিয়ে নেমে পড়লাম ঘেরে। অসাধারণ রাত অসাধারণ অনুভূতি। এদিকে শুরু হয়ে গেছে আমাদের বারবিকিউয়ের আয়োজন। চিকেন সঙ্গে স্থানীয় কাঁকড়া, পরাটা আর কোল্ড ড্রিংকসের আয়োজন ছিল ডিনারে। ডিনার করে পুকুরের ওপর বসে চলল আমাদের আড্ডা। কখনও পুকুরের ওপর কখনও হ্যামকে ঝুলে গান, কখনোবা কটেজের বারান্দায় বসে আমাদের আগের ট্রিপগুলোর মজার মজার স্মৃতিচারণ ও দুষ্টামি। আর তাই করতে করতে হয়ে এলো গভীর রাত।
এবার যে ঘুমাতে যাওয়ার পালা। কারণ উঠতে হবে অনেক সকালে, বেরিয়ে পড়তে হবে সুন্দরবনের আরও গহিনে হারিয়ে যাওয়ার জন্য। দেশব্যাপী, ট্যুরে যান, ট্রেকিংয়ে যান। যেখানে মন চায় যান, যেভাবে মন চায় যান। কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়, এমন কিছুই করবেন না প্লিজ।