শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১১:৪১ এএম
আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ২৩:৪৮ পিএম
মরচে ধরছে চিঠির বাক্সে. তবু আছে চিঠি লেখার দিন ছবি: উচ্ছাস রায়
ইলেকট্রনিক বার্তার যুগে চিঠি তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে অনেকটা। একটা সময় ছিল যখন মানুষের আবেগ আর সুখদুঃখ জুড়ে থাকত চিঠির পাতায়, এ সবই এখন অতীত। মানুষ ভুলতে বসেছে চিঠির কথা। মরচে ধরছে চিঠির বাক্সে। তবু আছে চিঠি লেখার দিন। গতকাল ১ সেপ্টেম্বর দিনটি আন্তর্জাতিক চিঠি লেখা দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
চিঠির আদিকথা
মানবসভ্যতার বিস্তৃতি ও প্রসার লাভ করেছে বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে। চিঠি সেই ব্যবস্থার অন্য এক নাম। মানুষ নিজের প্রয়োজনে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। ডাকব্যবস্থা বার্তাবাহক বা দূতব্যবস্থা, পরে পায়রা বা রানার ডাক দিয়ে যা ক্রম অগ্রসরমান। কাগজ প্রচলনের আগে মাটির থালার ওপর লেখা দূরগামী চিঠিকে মোম দিয়ে মুড়ে দেওয়া হতো। লেখার মাধ্যম হিসেবে একসময় গাছের পাতা, পাথরখণ্ড, পশুর চামড়া ব্যবহার করা হতো। প্রাচীন মিসর, ইনকা ও মায়া সভ্যতায় ডাক চলাচল সম্পর্কিত চিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ডাকব্যবস্থার ক্রমোন্নতির পথে উপমহাদেশে ঘোড়ার ডাকের প্রচলন, ডাকচৌকি স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পত্রমিতালি
পত্রের মাধ্যমেও গভীর মিতালি হয়, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এমন বিষয় প্রায় অচেনা। ১৯৮০-৯০-এর দশকে বেড়ে উঠেছেন যারা, তাদের অনেকেরই পত্রমিতা থাকত। সেই পত্রমিতা কখনও হতো বিদেশি বন্ধু। ভালো প্রেমপত্র যে লিখতে পারত, তার কদর ছিল বন্ধুমহলে। অনেকে আবার বন্ধু চেয়ে বিজ্ঞাপন দিত পত্রিকায়। চিঠি লেখার জন্য সুন্দর সুন্দর প্যাড বাজারে পাওয়া যেত। নীলাভ, সবুজ অথবা গোলাপি রঙের মধ্যে পাখি, ফুল এগুলোর আবছা ছবিসংবলিত কাগজে হালকা প্রিন্টে ‘ভুলো না আমায়’, ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’, ‘সুখে থাকো’ ইত্যাদি মনভোলানো কথা লেখা থাকত।
কেউ আবার রঙিন ছবিযুক্ত পোস্টকার্ডে লিখত। অনেকে বহু বছর চিঠি আদানপ্রদানের পরও অদেখা-অচেনাই রয়ে যেত। অনেকে আবার পত্রমিতালি থেকে পরিচিত হয়ে সংসারী হয়েছে।
শতবর্ষ পেরিয়েছে যে চিঠি
চিঠিপত্র, খাম, ডাকটিকিট সংগ্রহ করা নাকি একটি নান্দনিক শখ। সেই বাতিক থেকেই সংগ্রহ করেছি একটি শতবর্ষী চিঠি। ১৯১০ সালে লেখা চিঠিটির বর্তমান বয়স ১১৩ বছর! মাগুরার তৎকালীন আদালত কর্মচারী জাকের ও ঝিনাইদহের মিহির দাসের পারস্পরিক বদলি নিয়ে চিঠির কথোপকথন-

‘আপনার ১৫ই ফেব্রুয়ারী তারিখের পত্রে জানিতে পারিলাম আপনি আমার সহিত বদলী হইতে ইচ্ছা করেন। সেমতে লিখিতেছি যে এখানকার জলবায়ু আমার পক্ষে সহ্য হয় না বলিয়া আমি অনেক দিন যাবৎ বদলীর চেষ্টায় আছি। ঢাকায় আমার বাসস্থান আমার পক্ষে মাগুরা ও ঝিনাইদহ উভয়ই সমান বটে তবে আমার জন্য হাওয়া সহ্য না হওয়ায় বদলী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত: এখান হইতে বাড়ী যাওয়া আমার পক্ষে নিতান্ত অসুবিধা বলিয়া লিখিতেছি যে আপনি এই সম্মতিপত্রসহ বদলীর দরখাস্ত দাখিল করিবেন। আমার ঝিনাইদহ বদলী হইতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই বা অস্বীকৃতি নাই। যদি আপনার ইচ্ছা হয় তবে দরখাস্ত করিয়া আমাকে জানাইবেন।’
চিঠি যখন ইতিহাসের দলিল
বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা চিঠিপত্র ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন তা ইতিহাসের উপাদান বলে বিবেচিত হয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় লেখা চিঠিগুলোও যুদ্ধদলিল হিসেবে বিবেচিত।
উড়োখামে উড়োচিঠি
চিঠির প্রয়োজনীয়তা যেখানে ফুরিয়ে এসেছে সেখানে আবার উড়োচিঠির কথা! বিষয়টাকে উড়োকথা ভাবার অবকাশ নেই। একসময় ডাকাতরা পরিচয় গোপন রেখে বেনামি চিঠি দিত। চিঠি দিয়ে জানিয়ে দলবেঁধে ডাকাতি করার নজিরও রয়েছে।
ব্যক্তির আত্মপ্রকাশের দর্পণ বলা যায় চিঠিকে। একটি চিঠি যেভাবে মানুষের আবেগ-অনুভূতি প্রাপককে ছুঁয়ে দেয়, বর্তমান সময়ের ইমেল কিংবা এসএমএস তা পারে না। তাই অনুনয়- চিঠি দিও বাসন্তী খামে নামে কিংবা বেনামে।