জুম একাডেমি
শাহিনা নদী
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৩ ১২:৫৫ পিএম
আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জুম একাডেমি
কোনো দেশ বা জাতির জন্য শিক্ষা আশীর্বাদস্বরূপ। শিক্ষা মানুষকে আলোর পথে পরিচালিত করে। কথায় আছে, যে জাতি যত শিক্ষিত, সে জাতি তত উন্নত। মূলত সেজন্যই শিক্ষাকে বলা হয় জাতির মেরুদণ্ড। বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে টিকে থাকার জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বিকল্প নেই। দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হয়।
প্রতিযোগিতাময় এ যুদ্ধে জয়ী হতে হলে সঠিক গাইডলাইন ও মেন্টরিংয়ের প্রয়োজন অপরিহার্য। কিন্তু প্রান্তিক অঞ্চলগুলোয় আর্থিকভাবে অসচ্ছল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পক্ষে উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা করে কোচিং করার সুযোগ খুবই সীমিত। মূলত সে কারণেই উচ্চশিক্ষায় এখনও প্রান্তিক এলাকাগুলো অনেক পিছিয়ে। অন্যদিকে আদিবাসী জনগণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রেও ভীষণ উদাসীন। তাই উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আদিবাসী ছাত্রদের সহযোগিতা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জুম একাডেমি। মূলত আদিবাসীদের মধ্যে মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে সংগঠনটি ফ্রি কোচিং পরিচালনা করে।
আর্থিক অসচ্ছল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ঢাকায় কিংবা অন্য কোথাও গিয়ে ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া সম্ভব হয় না। ফলে সঠিক গাইডলাইনের অভাবে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা ভর্তিযুদ্ধে পিছিয়ে পড়ছে। এমনকি অনেক শিক্ষার্থী শুধু অর্থনৈতিক কারণে কোচিং করতে না পারায় এইচএসসি পরীক্ষার পরে তাদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। মূলত অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল কিন্তু উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য প্রস্তুতি নিতে চায় এমন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার লক্ষ্যেই জুম একাডেমির পথচলা। জুম একাডেমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ও প্রগতিশীল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত একটি স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান ও ভর্তি কোচিং সেন্টার। এটি মূলত পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাকে কেন্দ্র করে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করে।

জুম একাডেমি সৃষ্টির পেছনে করোনার সময়টাও অনেকটা অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। করোনার কারণে ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করে সবাইকে অটোপাস দেওয়া হয়। একদিকে দীর্ঘকালীন স্থবিরতায় পড়াশোনায় দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজগুলোয় ভর্তি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আগের তুলনায় ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। করোনার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ঢাকায় কিংবা চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে কোচিং করা সম্ভব ছিল না। এসব আদিবাসী শিক্ষার্থীকে সহযোগিতার লক্ষ্যে ১২ নভেম্বর ২০২০ সালে জুম একাডেমি কার্যক্রম শুরু করে। সংগঠনটির স্লোগানÑ ‘বুনোফুল ফুটতে থাকুক জুম পাহাড়ের বুকে’।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই জুম একাডেমি পার্বত্য চট্টগ্রামে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে কোচিং, উচ্চশিক্ষা বিষয়ক সেমিনারসহ নানামুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা মেন্টর হিসেবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে কোচিংয়ে ক্লাস নিয়ে থাকেন। করোনাকালে দেশে গড়ে ওঠা অনলাইনভিত্তিক কোচিং সেন্টার MARCH FORWARD FREE COACHING FOR BCS AND OTHERS-এর কার্যক্রমে অনুপ্রাণিত হয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ আদিবাসী শিক্ষার্থী জুম একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। জুম একাডেমির মূল উদ্যোক্তারা হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শ্রাবণ চাকমা, ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সমাজতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রুমেন চাকমা এবং ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী নবোদয় চাকমা।
এখন পর্যন্ত এ সংগঠন থেকে তিনটি ব্যাচ বের হয়েছে। প্রথম ব্যাচ (২০২০-২১), দ্বিতীয় ব্যাচ (২০২১-২২) ও তৃতীয় ব্যাচে (২০২২-২৩) যথাক্রমে ৯০, ১০০ ও ১১৮ জন শিক্ষার্থী কোচিং করেছেন। ধারাবাহিকভাবে প্রথম ব্যাচ থেকে ২৭, দ্বিতীয় ব্যাচ থেকে ২৬ ও তৃতীয় ব্যাচ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছেন। এ ছাড়া নার্সিংয়ে চান্সপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে ৬, ১৮ ও ১৪। সংগঠনটির এমন মহৎ উদ্যোগ অনুপ্রাণিত করছে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের। ফলে দিন দিন শিক্ষার্থীসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমন অনেক মেধাবী ছাত্র স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন সংগঠনটিতে।

জুম একাডেমির বর্তমান পরিচালক নবোদয় চাকমা বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে ব্যক্তি, সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে জুম একাডেমি পাহাড়ের সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের প্রধানতম ধাপটি অতিক্রমে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। আমরা আশা করি জুম একাডেমির মাধ্যমে যেসব শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাচ্ছেন, পরে তারাও তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে পাহাড়ের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসবেন।
এভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম সমাজ বিনির্মাণে নিজ দায়িত্ব পালন করে গেলে আমাদের সমাজটি এগিয়ে যাবে। আমরা জুম একাডেমিকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম বানাতে বদ্ধপরিকর, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য ও সহযোগিতা সহজে লাভ করবেন। আমরা সেই লক্ষ্যেও কাজ করছি।’