ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ জাদুঘর
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম
জাদুঘরে রয়েছে বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক নিদর্শন
প্রাণ-প্রকৃতির লীলাভূমি সিলেট ভ্রমণপিয়াসীদের যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। সিলেটকে পুণ্যভূমি হিসেবে অভিধায়ন করা যায়। এই শহরের মাটিতে শুয়ে আছেন হযরত শাহজালাল (র.)। তাই প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মাজার দেখতে ছুটে আসেন ভ্রমণকারীরা। মাজারসংলগ্ন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ভবনে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ভাষাসৈনিক মতিন উদ্দীন আহমদ জাদুঘর।
চার হাজারেরও বেশি দুর্লভ সামগ্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি অনেকটা অন্তরালেই রয়ে গেছে। ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি মূলত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা। দুপুরের তপ্ত রোদে রওনা দিয়ে পৌঁছলাম শহরের দরগা গেট এলাকায়। মূল রাস্তা থেকেই জাদুঘরের নামফলকটি দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম সাহিত্য সংসদের পঞ্চমতলায়। জাদুঘরের প্রবেশ পথের দুইপাশে ইট-পাথরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে লাঙল, জোয়াল আর মই।
হাজার বছরের কৃষিকেন্দ্রিক গ্রামবাংলার অপরিহার্য এসব উপাদান আধুনিক প্রযুক্তির কাছে যেন বশ্যতা মেনে নিয়েছে। টিকিট নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই দেখলাম একদল লোক বিস্ময় নিয়ে কিছু একটা দেখছে। রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা জুলিয়াস সিজারের রাজত্বকালের মুদ্রা চোখের সামনে দেখতে পেলে তো বিস্মিত হওয়ারই কথা! নিজের কাছেও মনে হলো সিজারের মতোই যেনÑ ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’। প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুটের জায়গাজুড়ে স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে নানা প্রত্নসামগ্রী।
দেয়ালে টানানো ১২৪২ বঙ্গাব্দের মানুষ বিক্রির দলিলটি দেখলে যে কেউ আঁতকে উঠতে পারেন! এখানে সংগৃহীত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কামানের গোলার খোসা ও বন্দুকের কার্তুজ যেমন মানব ইতিহাসের ভয়াবহতা স্মরণ করে দেয়, তেমনি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো সোনার জরিখচিত মসলিন আমাদের বস্ত্রশিল্পের উজ্জ্বল অতীতকে স্মরণ করে দেয়। নজর আটকালো চমৎকার কারুকাজ করা একটি কাঠের পালকিতে। জাদুঘরের প্রায় অর্ধশত পুরোনো দেয়ালঘড়ি জানাচ্ছে সময় কতটা পেছনে চলে গেছে।

জাদুঘটির প্রতিষ্ঠাতা অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার। অবসর সময় তিনি এখানে বসেই কাটান। বিস্তারিত জানতে চাইলে বললেন, ‘জাদুঘরটি আমার নানা মতিন উদ্দীনের নামে প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছিলেন ভাষাসৈনিক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মতিন উদ্দীন দুষ্প্রাপ্য দ্রব্যাদিও সংগ্রহ করতেন। মৃত্যুর আগে তাঁর সারা জীবনের সংগ্রহগুলো আমাকে দিয়ে যান। ১৯৯৫ সালে এসব সামগ্রী নিয়ে শহরের শুকরিয়া মার্কেটে নিজেদের জায়গায় একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করি। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০১৫ সালে মুসলিম সাহিত্য সংসদে স্থানান্তর করি। জাদুঘরের ব্যয়ের একটা অংশও মুসলিম সাহিত্য সংসদ বহন করে।’
ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার নানার দেখানো পথ ধরেই হেঁটে চলেছেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে সংগ্রহ করেছেন বহু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। শতাব্দী প্রাচীন দুটি পিতলের কলস দেখিয়ে বললেন, এ দুটি পিতলের কলস বছর দুই আগে সিলেট শহর থেকে উদ্ধার করি। কলস দুটিতে এই অঞ্চলের নিজস্ব নাগরি লিপিতে কড়িনামা পুঁথির কাহিনী খোদাই করে উল্লেখ করা হয়েছে। এ রূপ নিদর্শন অন্য কোথাও দ্বিতীয়টি সম্ভবত নেই। এরপর দেখালেন কারুশিল্পের অতুলনীয় নিদর্শন হাতির দাঁতের হাতপাখা।
এসব নিদর্শন ছাড়াও জাদুঘরটিতে রয়েছে ১৭৯৭ খিস্টাব্দের জৈন্তাপুর শিলালিপি, মহারাজা শ্রী চন্দ্র দেবের পশ্চিমভাগ তাম্রলিপি, স্বর্ণমুদ্রা, চীনের চৌ রাজবংশের ছুরি আকৃতির মুদ্রা, দুই মণ ওজনের হাতির দাঁত, নেপালের রাজা বিক্রম শাহদেব কর্তৃক মতিন উদ্দীনকে দেওয়া হাতির দাঁতের তৈরি দাবা খেলার দান, মহারানি কাঞ্চনপ্রভা মহাদেবীর দলিল, নাগরিলিপিতে লেখা আদি ধর্মশিক্ষা ও বাল্যশিক্ষা, ১৮৮৩ সালে প্রস্তুতকৃত হন্তচালিত ছাপার মেশিন, এক কাঠের টেবিল, অস্টিন গাড়ির আদলে তৈরি ১৯৩০ সালের পানবাটা, লোহার সিন্দুক, কলের গান, মাটির তৈরি ১৯৩৩ সালের গ্রামোফোন রেকর্ড, গরুর গাড়ি, আদি গণনাযন্ত্র, মতিন উদ্দীন আহমদের ব্যবহৃত পোশাক, মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতল শিল্প, নানা ধরনের বাঁশ ও বেত শিল্প, দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র, অসংখ্য দুর্লভ বইপুস্তক, আলোকচিত্র, ডাকটিকিট, মুদ্রাসহ বহু বিচিত্র সামগ্রী।
জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক তুহিন জানান, প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ জন দর্শনার্থী আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আসেন গবেষণাকাজের জন্য। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিনই জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে আপনিও ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাঠ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন এখানে এসে।