আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবস
রাতুল মুন্সী
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১৩:১৯ পিএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১৭:৪৪ পিএম
ছবি: সৌরভ ভূঁইয়া
আমাদের ঘরের বাইরে রাস্তায় নিয়মিত চোখে পড়ে কুকুর ও বিড়াল। এই প্রাণীগুলোর কোনো আশ্রয় নেই। প্রায়ই মানুষের দ্বারা নির্যাতনের শিকারও হয়ে থাকে তারা। এই প্রাণীদের নিয়ে কাজ করে বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠনগুলোর কাজ প্রশংসার দাবি রাখে। আজ ১৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গৃহহীন প্রাণী দিবস। এ উপলক্ষে বিশেষ লেখা...
মানুষের ক্ষেত্রে গৃহহীন, উদ্বাস্তু, যাযাবর শব্দগুলো হৃদয়বিদারক। মানুষ হিসেবে মানুষের এই কষ্ট বুঝতে পারলেও আমাদের চারপাশে এমন অনেক গৃহহীন প্রাণী আছে, যারা আমাদের প্রকৃতিরই অংশ। গৃহহীন এই প্রাণীগুলো কখনও আমাদের লাভ কিংবা ক্ষতির কারণ হয় না।
তাদের প্রতি আমাদের একটু সহমর্মিতাই তাদের সুন্দর জীবন দিতে পারে। তাদের থাকার জন্য ঘরের প্রয়োজন হয় না, বাড়তি খাবারের প্রয়োজন হয় না। যে খাবার প্রতিদিন ডাস্টবিনে ফেলে দিই সেই খাবারটা ঘরের সামনে রেখে দিলেই ওরা খেয়ে নেয়। একটু আদর পেয়েই হয়তো আমাদের পিছে ছোটে, পাশে দাঁড়ায়, বোবাচোখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। লেজ নাড়িয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে, একটু আদর চায়।

গৃহহীন প্রাণীদের মধ্যে সব থেকে বেশি নিগৃহীত বেওয়ারিশ প্রাণী কুকুর। যে কুকুরগুলো গৃহহীন ভাবেই বেঁচে থাকে। পরিবেশবান্ধব উন্নয়নতত্ত্ব বলছে, সেখানে পৃথিবীর সব প্রাণী, মানুষ, উদ্ভিদ, জল, প্রকৃতি সবার সমান অধিকার। এই সমতার সীমা লঙ্ঘন করলে আমাদের এই বাসভূমি স্বাভাবিকভাবেই তার মানবিক রূপটি হারিয়ে ফেলবে। প্রকৃতির প্রতি অবজ্ঞা ও দখল দূষণের ফলে মরুময়তা, খরা, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্য অনুসারে কুকুর নিধন করলে ইঁদুর ও প্লেগের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে।
এসব গৃহহীন প্রাণীর জন্য ব্যক্তি উদ্যোগে নানা সংস্থা গড়ে উঠেছে। সংস্থাগুলো স্বেচ্ছাশ্রমে গৃহহীন প্রাণী যেমন কুকুর, বিড়ালদের খাবারসহ নানা রোগ বালাইয়ের সেবা দিয়ে থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পূর্ণাভা সিদ্দিকী থাকেন উত্তরায়। বাসার পাশে থাকা অসংখ্য কুকুর, বিড়ালদের নিয়মিত খাবার দেন বলে নানা রকম কটাক্ষ তাকে সহ্য করতে হয়। পৃথিবী যখন কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত তখনও তিনি থেমে যাননি। পুরো শহর তখন লকডাউনে। এই প্রাণীগুলোর খাবারের জোগান নেই।
পূর্ণাভা সিদ্দিকী তার পরিবারের সহযোগিতায় এসব অবলা প্রাণীর খাবার জুগিয়ে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন। পূর্ণাভা বলেন, ‘প্রথমত ওরা খেতে পায় না, রাস্তায় মানুষের দ্বারা অত্যাচারিত হয়। এ বিষয়গুলো দেখে খারাপ লাগত। তাই বাসার আশপাশের গৃহহীন কুকুর, বিড়ালদের খাওয়ানো শুরু করি।’ তবে এখন তাদের স্বাস্থ্যসেবা এবং আইন নিয়ে সোচ্চার। পূর্ণাভা নিজ উদ্যোগে সেবা দিয়েছেন প্রায় ২০০ গৃহহীন পথ কুকুরকে। বর্তমানে প্রতিদিন পঞ্চাশের অধিক পথ কুকুর বিশটির মতো বিড়ালকে নিয়মিত খাবার খাওয়ান।

পূর্ণাভার বাবা অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া নাট্যকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। মা ফাহমিদা হক কলি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। রাস্তার প্রাণীদের প্রতি মেয়ের প্রেম বিষয়ে ফাহমিদা হক বলেন, ‘পূর্ণাভা গৃহহীন কুকুর, বিড়ালদের খাওয়ায়, চিকিৎসা করায়। ভালোবাসা থেকেই কাজটি করে। করোনাকালীন সময় থেকে এখনও পর্যন্ত একনিষ্ঠভাবে করে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অতি বাড়াবাড়িতে রাগ হয়। কিন্তু মা হিসেবে মেয়ের জন্য গর্ববোধ করি।’
এই কাজ করার কারণে পূর্ণাভার বাসায় হামলা পর্যন্ত হয়েছিল। পূর্ণাভা বলেন, ‘গত বছরের জুলাই মাসে আমাদের বাসায় হামলা করেছিল স্থানীয় কিছু মানুষ। হামলাকারীরা বলছিল, এই বাড়ির মেয়েরা কুকুর পালে, ওরা সব নাস্তিক। হামলাকারীরা আমাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের গল্প বলে সাধারণ মানুষদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে। প্রাণীদের সেবায় কাজ করতে চাই আগামীতেও।’
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রামীণ ফোনের একটি বিজ্ঞাপন পশুপ্রেমী ছাড়াও সাধারণ মানুষের মনে দাগ কেটেছে। এই বিজ্ঞাপনে গৃহহীন প্রাণীপ্রেমী হিসেবে যাকে দেখা যায়, তিনি রাকিবুল হক এমিল।
গৃহহীন প্রাণীদের সেবায় কাজ করে যাচ্ছেন ২০১৩ সাল থেকে। ২০১৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গড়ে তোলেন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন সংক্ষেপে ‘প’ ফাউন্ডেশন।
প্রাথমিক অবস্থায় নিজের এবং স্ত্রীর আয়ের টাকা দিয়েই চালিয়ে নিতে হতো। পরবর্তী সময়ে প্রাণীপ্রেমী অনেকেই এগিয়ে আসেন। বর্তমানে সংগঠনের প্রাণীদের চিকিৎসাসেবাসহ ৯০ শতাংশ অর্থের জোগান আসে প্রাণীদের জন্য ভেটেরিনারি ক্লিনিক থেকে। আর বাকি ১০ শতাংশ আসে বন্ধুদের ডোনেশনে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে কোনো স্বেচ্ছাসেবী নেই। স্বেচ্ছাসেবী নেই কেন সেই বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমাদের দেশে দায়িত্বশীল এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া অসম্ভব। সমাজ ব্যবস্থা তরুণদের স্বেচ্ছায় সেবা দেওয়ার সুযোগ রাখেনি। তাই বেতনভুক্ত কর্মী দিয়ে কাজ করানোয় বিশ্বাসী। তবে অবশ্যই তাকে মানবিক হতে হবে। বর্তমানে তার ভেটেরিনারি ক্লিনিকসহ অন্য কাজের জন্য ৩৬ জন বেতনভুক্ত সেবাদানকারী আছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পর থেকে গত নয় বছরে উদ্ধারসহ সেবা দিয়েছেন প্রায় ১১০০ ওপরে প্রাণীর। ক্লিনিকের মাধ্যমে সেবা দিয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি প্রাণীকে। এখানে গৃহহীন প্রাণী ছাড়াও পোষা প্রাণী রয়েছে। এদের সিংহ ভাগই দেশি কুকুর এবং বিড়াল।
রাকিবুল হক এমিল গৃহহীন প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে বলেন, ‘একমাত্র মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর ঘর বলতে যা বুঝায়, তা লাগে না। প্রকৃতিই আশ্রয়টা বানিয়ে দেয়। কিন্তু শহরের রাস্তায় থাকা প্রাণীদের সমস্ত প্রাকৃতিক সুযোগ আমরা নষ্ট করে দিচ্ছি দিন দিন। কাজেই আমাদের বাড়ির নকশা, নগরের পরিকল্পনা, মানসিকতা সব জায়গায় ওদের জন্য সামান্যতম হলেও একটু সহানুভূতির প্রকাশ থাকা উচিত।’
রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার তিলপাপাড়া জামে মসজিদের পাশে চারতলা বাড়ি। সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির ছাদে উঠতেই চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা! এটা তো কুকুর-বিড়ালের রাজ্য! অসংখ্য কুকুর-বিড়াল নিজেদের ভাষায় অভ্যর্থনা জানাবে আপনাকে। এখানে এসব প্রাণীদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছেন তরুণ আফজাল খান। তার সংগঠনের নাম ‘রবিনহুড, দ্য অ্যানিমেল রেসকিউয়ার’।
আফজালের শুরুটা ২০১০ সালে। রাতে গাড়িতে করে বাসায় ফিরছিলেন। বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তায় একটা বিড়ালের কান্না শুনতে পান তিনি। তিনি বলেন, বৃষ্টির মধ্যে বিড়ালের কান্না শব্দ পেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দেখতে পাই, কেউ একজন পলিথিনে করে একটি বিড়ালের বাচ্চাকে রাস্তায় ফেলে গিয়েছে। খুব খারাপ লাগে বিষয়টা। তখন থেকেই তাদের প্রতি একটা অনুভূতি জন্মায়।’

সেই থেকে গৃহহীন এবং পোষা প্রাণীদের বিপদে ছুটে যান আফজাল। কোনো ঝুঁকিতে পড়া প্রাণী উদ্ধারের সর্বশেষ ভরসার নামও তার। এখন পর্যন্ত ঝুঁকিতে থাকা অসংখ্য গৃহহীন প্রাণীসহ পোষা প্রাণী উদ্ধার করেছেন তিনি।
বর্তমানে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ যুক্ত সংগঠনটি। ঢাকা শহরে যেকোনো প্রাণী যত ঝুঁকিতেই থাকুক ৯৯৯ ফোন দিলেই ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীটাকে উদ্ধার করে সেবা দেওয়াসহ পোষা প্রাণী হলে মালিকের কাছে পৌঁছে দেন। কেউ কোনো প্রাণী উদ্ধারের জন্য সহযোগিতা চাইলে আফজাল একটি ভিডিও পাঠানোর অনুরোধ করেন। ভিডিও দেখে প্রস্তুতি নিয়ে বের হন আফজাল এবং তার টিম।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সংগঠন ‘রবিনহুড দ্য অ্যানিমাল রেসকিউয়ার’-এর পক্ষ থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করতে চাই। তারা বেওয়ারিশ কুকুর, বিড়ালের খাবার সংগ্রহ, উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালগুলোর তরুণদের সম্পৃক্ত করার ইচ্ছা রয়েছে। সরকারের সহযোগিতা পেলে এই প্রাণীদের জন্য একটি আশ্রম ও চিকিৎসাকেন্দ্র করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’